একটানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি প্রায় সব বিরোধী দল ও মতকে কোণঠাসা করতে পেরেছিলেন শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয়, পরপর প্রশ্নবিদ্ধ তিনটি নির্বাচন করেও তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছিলেন। এর ফলে জনমনে এমন একটি ধারণা বা ‘মিথ’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল যে, শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগকে কিছুতেই ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না। ক্ষমতায় থাকার জন্য জনগণই যে নিয়ামক শক্তি, এ কথা দেশের মানুষ প্রায় অবিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। জনগণের পাশাপাশি এক যুগ ধরে আন্দোলন ও মামলা-হামলার মুখে থাকা বিএনপির একাংশের মধ্যেও এমন ধারণা বা বিশ্বাস জন্মাতে শুরু করেছিল। কারণ একবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে এবং দুবার নির্বাচন বর্জনের পরেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পাওয়ায় কিছুটা হতাশা তৈরি হয়েছিল দলটির মধ্যে।
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন মিসিসিপির সাবেক গবেষণা সহযোগী ক্রিস্টোফার জে. ফ্লাড তার ‘পলিটিক্যাল মিথ: আ থিওরিটিক্যাল ইন্ট্রোডাকশন’ বইতে রাজনৈতিক মিথকে এমন একটি ধারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা রাজনৈতিক জীবন ও সামাজিক বাস্তবতার ব্যাখ্যা ও গঠন করতে ব্যবহৃত হয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মিথ হলো এমন গল্প, প্রতীক বা বিশ্বাসের সমষ্টি, যা একটি গোষ্ঠী বা সমাজের মধ্যে একটি বিশেষ আদর্শ বা ন্যারেটিভকে প্রতিষ্ঠিত করে এবং সেই ন্যারেটিভের ভিত্তিতে রাজনৈতিক আচরণ ও নীতিমালা প্রভাবিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হওয়ার পরে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচনই ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে হয়েছে বলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনা আছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশে আর কখনো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে বিশ্বাস করতেন না দেশের জনগণ। ফলে ‘বিএনপি শেষ, দলটির আর ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কম’ কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ বেশ কয়েকজন নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং নিবন্ধন বাতিলের ফলে দলটির অস্তিত্ব প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। বেশ কয়েক দফা ভাঙন, সরকারের কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ, মামলা ও গ্রেপ্তার; সর্বোপরি সরকারের কূটকৌশলের কারণে দুর্বল হয়ে গিয়েছিল হেফাজতে ইসলামীও। কিন্তু ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সব ‘ধারণা’ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। পতন হয় মহাক্ষমতাধর শেখ হাসিনা সরকারের। তিনি পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন।
বস্তুত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও সাড়ে ১৫ বছরে দেশের রাজনীতি ও ক্ষমতার বলয় তৈরি হয়েছিল শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে। দৃশ্যত তার শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এবং ক্রমাগতভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারায় তাকে সরাতে পারবে না এমন বিশ্বাস বা মিথ তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার প্রভাব ছাড়াও দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থক বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর প্রচারণাও এই মিথ তৈরিতে সহায়তা করেছে বলে মনে করা হয়।
রাজনৈতিক মিথ নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে গঠিত হয় বলে ক্রিস্টোফার জে ফ্লাড তার ওই একই বইতে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “রাজনৈতিক মিথ প্রায়ই এমন এক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে, যিনি জনগণের কাছে অসাধারণ ও অতিমানবীয় গুণাবলীর অধিকারী হিসেবে উপস্থাপিত হন। এই ব্যক্তি-চরিত্রটি অনেক সময় ‘কাল্ট অব পারসোনালিটি’ সৃষ্টি করে।”
শেখ হাসিনার পতন-পরবর্তী বাংলাদেশের এখনকার রাজনীতি কারও কল্পনার মধ্যেও ছিল না। অথচ সেই ঘটনাই ঘটেছে ২০২৪ সালে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতা অর্জনের ৫০ বছরের মধ্যেও দেশের রাজনীতি এরকম আর কখনো ওলটপালট হয়নি; বা উল্টে যায়নি। এ বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সাড়ে ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকা শক্তিশালী আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতা থেকে ছিটকেই পড়েনি; দলটির রাজনীতিও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘসময় ক্ষমতার বাইরে থেকে অত্যন্ত কোণঠাসা অবস্থায় থাকলেও ওই এক দিনের ঘটনায় বিএনপির রাজনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, ক্ষমতায় এখন পর্যন্ত না গেলেও দেশের রাজনীততে বিএনপিই এখন সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর।
একইভাবে ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের ঘটনায় সমান্তরালে রাজনীতিতে লাভবান হয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ বিএনপির রাজনৈতিক মিত্ররাও। কারণ দলগুলো এখন স্বস্তির মধ্যে রাজনীতি করছে, নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও দলটির মিত্র দলগুলোর নেতারা হয় কারাগারে নয়তো আত্মগোপনে রয়েছেন। দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ‘আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনার কখনো পতন হবে না’ রাজনৈতিক এই ‘বিশ্বাস বা ধারণা’র কারণেই দলটির অনেক ডাকসাইটে নেতা এবং প্রভাবশালী সমর্থক আগেভাগে দেশ ছেড়ে পালাতে পারেননি। তাদের বেশির ভাগই বিশ্বাস করতেন, শেখ হাসিনাকে কেউ ফেলতে পারবে না। শেষ পর্যন্ত তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন। এমন ধারণা তৈরি হওয়ার কারণ হলো; ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকবার সরকার পতনের আন্দোলন সহিংস ও বেগবান হলেও শেষ পর্যন্ত সরকার তা সামাল দিতে সমর্থ হয়। সরকার টিকে যায়।
সর্বশেষ গত ২২ জুলাই আন্দোলন তুঙ্গে থাকার সময় ‘শেখ হাসিনা পালায়নি, শেখ হাসিনা পালায় না’ এমন বক্তব্যের পর দুশ্চিন্তায় থাকা আওয়ামী লীগের মধ্যে আবারও স্বস্তি ফিরে আসে। জনগণের মধ্যেও তখন আলোচনা ওঠে, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিয়ে উঠছে। কিন্তু বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষ যুক্ত হওয়ায় ৫ আগস্ট সকালে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর মানুষ গণভবন দখল করে নেয়।
ওই দিনের পর আওয়ামী লীগের একাংশ নানাপথে নানাভাবে পালিয়ে যান। আবার অনেকে গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকবে’ এমন বদ্ধমূল ধারণা থেকেই দুর্নীতি দেশের তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। সীমাহীন দলীয়করণ হয়েছে পুলিশ ও প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের প্রায় সর্বস্তরে। জনগণের প্রতি আস্থা এবং ভোটের রাজনীতির বদলে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত কার পক্ষে এমন আলোচনাই বড় হয়ে উঠেছিল। অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করার জন্য জনগণের কাছে যাওয়ার আর কোনো তাগিদ আওয়ামী লীগ নেতারা অনুভব করেননি। তাদের মনোভাব ছিল, পরিস্থিতি যাই হোক, ‘ক্ষমতায় থাকার জন্য শেখ হাসিনা একটা উপায় বের করবেনই।’
এবং সত্যি সত্যি তিনি উপায় বের করেছিলেনও। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনা হলো, শেখ হাসিনা পরপর তিনবার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে দলকে ক্ষমতায় নিয়ে গেছেন। একইভাবে বিরোধী দল ও মতকে তিনি দমিয়ে রাখতেও সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বেপরোয়া হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টিও তাদের আর মাথায় ছিল না। কারণ ‘শেখ হাসিনাই থাকবেন’ এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় পুলিশ ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরাও নিরপেক্ষ থাকার আর কোনো ঝুঁকি নেননি। তারা প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের পক্ষে কাজ করেছেন। নির্বাচন কমিশনও এই ধারার বাইরে যাওয়ার ঝুঁকি নেয়নি। এভাবেই সংসদ নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের সর্বস্তরের নির্বাচন নিয়ে দলটির নেতা-কর্মীদের আর মাথা ঘামাতে হয়নি। সরকার, প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ সব ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল । এভাবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে তারা একতরফা ভাবে জয়লাভ করেছে। কেন্দ্র থেকে দেশের তৃণমূল পর্যন্ত এভাবে আওয়ামী লীগের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘কর্তৃত্ববাদী’ সরকারের দুর্নামও এভাবেই জনমনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।
সুইডেনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা আইডিইএর (দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিসট্যান্স) প্রতিবেদনে এ কারণেই কর্তৃত্ববাদী দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে। ‘দ্য গ্লোবাল স্টেট অব ডেমোক্রেসি’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে ২০২২ সালের বৈশ্বিক গণতন্ত্র পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে।
ক্রিস্টোফার জে ফ্লাডের মতে, রাজনৈতিক মিথ সমাজে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি জনগণের আচরণকে প্রভাবিত করে, রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে এবং কখনো কখনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেরণাও জোগায়।
বাংলাদেশেও সরকারের পরিবর্তন তথা সেই পতন এতটাই আকস্মিক ছিল যে, শেখ হাসিনা কয়েক ঘণ্টা আগেও বুঝতে পারেননি দেশ ছেড়ে তাকে পালাতে হবে। ফলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তাৎক্ষণিকভাবে আত্মগোপনে যেতে হয়েছে এবং দলটির রাজনীতিও আকস্মিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে।