চলতি বছর প্রশাসন নিয়ে ঘটনাবহুল সময় পার করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রাপ্য পদোন্নতির দাবিতে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিক্ষুব্ধ অবস্থান, ডিসি নিয়োগের কঠোর সমালোচনা, গত সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, কিছু কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর, প্রশাসনের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব সৃষ্টিসহ নানা কারণে আগোছালো ও প্রায় স্থবির পরিবেশে শেষ হয়েছে বছর।
এসবেই শেষ হয়নি। বছর শেষে নির্বাচন উপলক্ষে সারা দেশের জেলা প্রশাসনে জেলা প্রশাসক (ডিসি), অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি), ইউএনও পদায়নেও পিছু ছাড়েনি বিতর্ক।
এভাবেই সিদ্ধান্তহীনতা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক চাপে জনপ্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ও গতিশীলতা ফেরানো সম্ভব হয়নি। এতে বড় ভুক্তভোগী হয়েছেন যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা।
বছর শেষে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মাঝে। কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ও একটি রাজনৈতিক দলের কঠোর অনুসারী দুই কর্মকর্তা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ১৫ কর্মকর্তার শাস্তিমূলক বদলির একটি তালিকা তৈরি করেছেন। তারা সবাই ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে এই তালিকার ৬ কর্মকর্তাকে বদলিও করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৯ কর্মকর্তাকেও কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হবে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের মাঝে ক্ষোভ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের দুই দিন পরই সচিবালয়ে প্রথম বিক্ষোভ করেন বঞ্চিত কর্মকর্তারা। তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও জন প্রশাসন মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করেন। এই দুই মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণসহ অনেক কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনাও ঘটে। ফলে হঠাৎ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনে এমন বিশৃঙ্খলায় প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়সহ সারা দেশে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে দেখা দেয় অস্থিরতা। সেই থেকে প্রশাসনে পদোন্নতি, পদায়ন নিয়ে অস্থিরতার শুরু, যা শেষ হয়নি বছর শেষেও।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে নিয়োগ দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে। এ সময় (সেপ্টেম্বর) দুই দিনে প্রথমে ২৫ জেলা এবং পরদিন ৩৪ জেলায় নতুন ডিসি নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগের পরই প্রশাসনের সব ক্ষেত্রেই কটাক্ষ ও বিতর্কের মুখে পড়ে সরকার।
যার প্রভাব ছিল বছরের শেষ ভাগে গত নভেম্বরে নতুন ৫২ ডিসি নিয়োগেও। বদলি ও পদায়নের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া এই ডিসি পদে ২৫তম ও ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তা যেমন রয়েছেন, তেমনই ২৭তম ব্যাচের কয়েকজন নতুন কর্মকর্তার সঙ্গে ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের কিছু কর্মকর্তাকে ডিসি পদে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। নতুন এই ডিসি পদায়ন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সমালোচনা ও বিতর্কের মুখে অবশেষে এই তালিকায় নিয়োগ পাওয়া ছয় ডিসিকে প্রত্যাহার করে সরকার।
২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা খবরের কাগজকে জানান, নির্বাচনকে সামনে রেখে তড়িঘড়ি করে নতুন ব্যাচ হিসেবে ২৮তম ও ২৯তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের ডিসি ফিটলিস্টে ভাইবা দেওয়ার জন্য ডাকা হয়। দুই ব্যাচের নির্বাচিত কিছু কর্মকর্তাকে ফিটলিস্টের জন্য ডাকে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি)। সরকার আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে যেসব কর্মকর্তা ইউএনও বা এআরও (সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের ডিসি ফিট লিস্টের জন্য ডাকা হবে না। অর্থাৎ এই কর্মকর্তাদের ডিসি পদে নিয়োগ দেবে না সরকার। সরকার মনে করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যারাই ইউএনও পদে দায়িত্ব পালন করেছেন তারা সবাই গত আওয়ামী লীগ সরকারের লোক। এ জন্য তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা যাবে না। কর্মকর্তাদের দাবি এটা সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা। শীর্ষ কর্মকর্তারা সরকারকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, এসব কর্মকর্তাদের সবাই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক নন। তারা জানান, প্রশাসনের স্বাভাবিক নিয়মেই ব্যাচভিত্তিক যোগ্য কর্মকর্তাদের ইউএনও পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে ইউএনও পদে নিয়োগ পাওয়া ২৮, ২৯ ও ৩০তম ব্যাচের ৪৯৬ জন কর্মকর্তাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হয়েছে। অথচ এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগ্য, দক্ষ ও নিরপেক্ষ অনেক কর্মকর্তা রয়েছেন। বিপরীতে গত নভেম্বরে ডিসি পদে যেসব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রয়েছেন নারী নির্যাতন মামলার আসামি। কয়েকজন কর্মকর্তা আছেন, যারা ব্যাচভিত্তিক কর্মকর্তাদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। গত সরকারের সময় অনিয়মের অভিযোগ, মামলার আসামি হওয়ায় ডিসি পদে নিয়োগ পাননি তারা। আবার কিছু কর্মকর্তা ব্যাচভিত্তিক নেতা হওয়ায় চতুরতার সঙ্গে ইউএনও পদে নিয়োগ নিয়ে ঢাকার বাইরে পদায়ন নেয়নি। মূলত এরা গত সরকারের আমলের সুবিধাভোগী। অথচ তাদেরই আস্থায় নিয়েছে সরকার। এমন কর্মকর্তারাই এখন ডিসি এবং তারাই জাতীয় নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে প্রশাসনের অদৃশ্য দূরত্ব সৃষ্টির অভিযোগ করেছেন প্রশাসনের বেশ কিছু কর্মকর্তা। তারা জানান, প্রায় এক বছর পার হলেও এখনো ২০তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি চূড়ান্ত হয়নি। প্রশাসনের ভেতরে এ নিয়ে অসন্তোষ ও হতাশা ক্রমেই বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক জট নয়, বরং উপদেষ্টা পরিষদ ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার সংকটেরই প্রতিফলন। এই ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ২০তম ব্যাচের তিনজন প্রভাবশালী ও দেশের বড় একটি রাজনৈতিক দলের মতাদর্শী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের পদোন্নতির জন্য রাজনৈতিক চাপ রয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। আবার জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদ ২৪তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া রিভিউ করার সুপারিশ করলেও তা আমলে নেয়নি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড বা এসএসবি।
অন্যদিকে সময়ের ব্যবধানে ২১তম এমনকি ৩১তম ব্যাচের অনেক কর্মকর্তারাও ইতোমধ্যে যুগ্মসচিব ও উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। কিন্তু ২০তম ব্যাচের জট না কাটায় পুরো পদোন্নতি কাঠামো কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে হতাশা নিয়ে বছর শেষ করছেন এসব ব্যাচের কর্মকর্তারা।
আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ প্রশাসনে ২০ গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সচিব। প্রশাসনকে গতিশীল করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রশাসন গতিশীল তো হয়ইনি, বরং আরও বেশি এলোমেলো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। নিয়মিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনিয়মিত সচিবদের মানসিক সমন্বয়ের অভাবেই এমনটি হচ্ছে বলে খবরের কাগজকে জানিয়েছেন প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা। বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ২০ কর্মকর্তাসহ প্রশাসনে সিনিয়র সচিব ও সচিব পদে রয়েছেন ৭১ জন কর্মকর্তা।
এছাড়াও প্রশাসনের নানা স্তরে কর্মরত কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ট্যাগ দেওয়া, ক্ষমতাপ্রত্যাশী দেশের অন্যতম বড় দুই দলের সমর্থক কর্মকর্তা নিয়োগের চাপাচাপিতে শূন্য পদে নিরপেক্ষ, যোগ্য, দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে না পারার ব্যর্থতা, যথাসময়ে কর্মকর্তাদের পদোন্নতি না দিতে পারার মতো বিভিন্ন কারণে কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ায় প্রায় পুরোপুরি থেমে ছিল বছরজুড়ে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
আবার আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল নিজেদের লোকজনকে ‘জায়গামতো’ বসাতে অদৃশ্য এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে অভিযোগ অনেক কর্মকর্তার। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলছেন, বছরজুড়েই রাজনৈতিক চাপে ছিল প্রশাসনের ‘চেইন অব কমান্ড’। সে কারণেই প্রশাসনের নৈমিত্তিক কাজে গতি আসেনি। অনেকটা চিড়েচ্যাপ্টা পরিস্থিতিতে শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই সতর্কতার সঙ্গে পথ চলার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। নির্বাচনে সম্ভাব্য বিজয়ী কারা, তা বোঝার চেষ্টা করে নিজেদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করছেন। পাশাপাশি বছরজুড়েই ছিল প্রশাসন ক্যাডার বনাম অন্য ২৫ ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে বিরোধ। এতেও সারা বছরই অনেকটা স্থবির, অস্থির ছিল প্রশাসন।
গত দেড় বছরে প্রশাসনের সংস্কার ও গতি আনতে না পারা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার খবরের কাগজকে জানান, ভবিষ্যতে যদি কখনো বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা বা দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা হয় তবে দুটি বিষয় প্রাধান্য পাবে। এর একটি প্রশাসনের জনবল সঠিক ব্যবস্থাপনা বা পুনর্গঠিত করতে না পারা এবং দ্বিতীয়টি হবে সেবা পর্যায়ে দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারার ব্যর্থতা।
তিনি বলেন, সরকার ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ায় প্রশাসনকে হয়তো পুনর্গঠিত করতে পারেনি। অথবা তারা বুঝতেই পারেনি এর জটিলতা। ফলে সচিবালয়কেন্দ্রিক বা মাঠ প্রশাসনের জনবল ব্যবস্থাপনায় সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। তেমনই সাব-রেজিস্টার অফিস, তহশিল অফিস, থানা (পুলিশ স্টেশন) এমন সেবা পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেসবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ তো করতেই পারেনি, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।