দক্ষতানির্ভর শিক্ষা এবং সার্বিক বিষয়ের আপগ্রেডেশনের (হালনাগাদ) কারণে বৈশ্বিক মানদণ্ডে অগ্রগতি হচ্ছে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার প্রসারই চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদা পূরণ করতে পারে। তাই ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার আলোকে মানবসম্পদ তৈরিসহ অন্য সূচকে ভালো অবস্থান তৈরিতে সচেষ্ট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। উচ্চশিক্ষার চাহিদা পূরণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় তিন দশক আগে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর প্রায় ৩ লাখ শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিউচার ওরিয়েন্টেড নলেজকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্সসহ (এআই) তথ্যপ্রযুক্তি-সংবলিত বিষয়গুলোকে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল কাজ, নতুন জ্ঞান উদ্ভাবন করা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থ জোগান দেয় সরকার। কিন্তু বেসরকারিতে নিজেদের চালিয়ে নিতে হয়। তারপরও রাষ্ট্রের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে করণীয় এবং গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে সবকিছুর সমন্বয় জরুরি। দক্ষতার পাশাপাশি সামাজিক ভ্যালু, কালচার, আর্ট, সমাজবিজ্ঞান- এসবকেও গুরুত্ব দিতে হবে। যদি সবকিছুর সমন্বয় ঘটে, তাহলে আন্তর্জাতিক, দেশীয় শ্রমবাজারসহ সব সেক্টরে আরও ভালো করবে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েটরা।’
শিক্ষাবিদরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে অনেক কাজ সহজে করা যাবে। মানবসম্পদের গতানুগতিক প্রয়োজন হবে না। ফলে চাকরির বাজারে পরিবর্তন আসবে। অনেকে চাকরি হারাতে পারেন। তবে দক্ষরাই টিকে থাকবে। উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন চাকরির বাজারের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করার এখনই সময়। তথ্যপ্রযুক্তি, কারিগরি ও প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও প্রযুক্তির বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে। এ বিষয়টিকে লক্ষ্য করে সিলেবাস আপগ্রেডেশন, বিভাগ চালুসহ নানা কার্যক্রম হাত নিচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ প্রতিবেদন (২০২২ সালের তথ্য) অনুযায়ী, দেশে মোট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১০টি। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে আছে ৬৯টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের কারিকুলাম আপগ্রেড করার জন্য পরামর্শ বা তাগাদা দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। আউটকাম বেইজড এডুকেশন (ওবিই) টেমপ্লেট অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের প্রোগ্রামগুলোর সিলেবাস পরিবর্তন করছে। ইউজিসির স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং অ্যান্ড কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স (এসপিকিউএ) বিভাগ ওবিই বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করে। ২০২২ সালে ৫৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
২০২২ সালের পরিসংখ্যান বলছে- সে বছর ভর্তি শিক্ষার্থীদের ৪৩ দশমিক ৯০ শতাংশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এবং ২২ শতাংশ ব্যবসায় শিক্ষা-সম্পর্কিত বিভাগ বাছাই করেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও জনস্বাস্থ্য, আইন, টেক্সটাইল ও ফ্যাশনের মতো বিষয়গুলোতে আগ্রহ ছিল।
ইউজিসি বলছে, বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চাহিদাভিত্তিক যুগোপযোগী বিষয় ও পাঠ্যক্রম প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে; বিশেষ করে ল্যাবরেটরি সায়েন্স, ইলেক্ট্রনিকস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম, মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, আইসিটি, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, গ্রাফিক্স ডিজাইন, পারফর্মিং আর্টস ইত্যাদি। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়। বিজ্ঞানমনস্ক জ্ঞানভিত্তিক ডিগ্রি, জাতীয় উন্নয়নে অসামান্য ভূমিকা রাখবে।
৫৩টি বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্থায়ী ক্যাম্পাসে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অন্যদিকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী সংখ্যা; অবকাঠামো, তহবিলসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় ইউজিসি থেকে সনদপ্রাপ্ত হয়েছে ২০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। সেগুলো হলো- ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, খাজা ইউনুস আলী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি।
র্যাঙ্কিংয়ে অগ্রগতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
কিউএস, টাইমস হায়ার এডুকেশন ও ওয়েবমেট্রিকসহ বৈশ্বিক মানদণ্ডে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো করছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি আশাজাগানিয়া। গত ২৩ এপ্রিল টাইমস হায়ার এডুকেশন র্যাঙ্কিংয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩০১ থেকে ৩৫০-এ অবস্থান করছে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ)। ৩৫১ থেকে ৪০০-এর মধ্যে ছিল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিও দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে শীর্ষে ছিল।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির সাবজেক্ট-ভিত্তিক র্যাঙ্কিংয়ে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় স্থান করতে সক্ষম হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওয়েবমেট্রিক্সের র্যাঙ্কিংয়ে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অবস্থান ছিল শীর্ষে। এরপরই ছিল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) ‘এশিয়ান ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং-২০২৫’-এ দেশের শীর্ষ ছিল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।
শিক্ষার্থী বাড়ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে
গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়ছে। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে ৩০ হাজার ৯৯১ শিক্ষার্থী বেশি ভর্তি হয়েছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বছর শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪১ হাজার ৯৮ জন। এ ছাড়া পিএইচডি ডিগ্রি সম্পন্ন শিক্ষকের সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২২ সালে পিএইচডি শিক্ষকের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫১০ জন। এর আগের বছর ছিল ২ হাজার ৯৪৪ জন।
গবেষণা খাতেও বেড়েছে বরাদ্দ
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় বার্ষিক ব্যয়ের পরিমাণ বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে ৮৫টি বিশ্ববিদ্যালয় এই খাতে কম-বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। এই খাতে ব্যয় ছিল ১৩৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর আগের বছর ব্যয় ছিল ১১৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
কারিগরি ও প্রযুক্তিতে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের হার বেড়েছে
গত চার বছরের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের মধ্যে কারিগরি ও প্রযুক্তিতে ডিগ্রির হার বেড়েছে। ২০১৮ সালে কারিগরি ও প্রযুক্তিতে স্নাতক ডিগ্রিপ্রাপ্তের হার ছিল ২৬দশমিক ৬৯। ২০২২ সালে এই হার দাঁড়ায় ৪১ দশমিক ৫০-এ। ২০২২ সালে কারিগরি ও প্রযুক্তিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রাপ্তির হার ২ দশমিক ২৩, যা ২০১৮ সালে ছিল ১ দশমিক ০২।