বাংলাদেশ অনেক ছোট দেশ কিন্তু এর লোকসংখ্যা অনেক বেশি। এ কারণে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তাও অনেক বেড়েছে। শিক্ষিত লোকের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। যারা একান্ত দরিদ্র তারা হয়তো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা নিতে পারছে না। যাদের ন্যূনতম অর্থ আছে তারা সেই শিক্ষা নিতে পারছে। যাদের মোটামুটি অর্থ-সম্পদ আছে, তারা তাদের সন্তানকে বিদেশে পড়াশোনার জন্য পাঠাচ্ছে। অনুন্নত দেশের সন্তানরা নিজেদের প্রাণপন চেষ্টায় উন্নত দেশে পড়াশোনার জন্য পাড়ি দিচ্ছে। তাদের অভিভাবকরাও তাদের সমর্থন করছে। প্রশ্ন হলো- কেন এমন ব্যাপার দাঁড়াল? দেশ যখন স্বাধীন হলো তখন শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হয়ে সরকার গঠন করলেন। তখন আইনের শাসন ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়েছিল। থানা লুট করে পুলিশ মারা এবং অস্ত্র লুট করা। গ্রামগঞ্জে ধনীদের বাড়ি লুট করতে থাকে ডাকাতরা। আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর নাম করে ডাকাতরা টাকা-পয়সা লুট করতে থাকে। এর মধ্যদিয়ে জাতির মনোভাবও বদলে যায়। সাধারণ মানুষ চাইত, স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের থাকুক। আমাদের দরিদ্র থাকুক, তার পরও আমরা পরাধীন থাকতে চাই না। দরিদ্রতা নিয়েই আমরা সামনে এগিয়ে যাব। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করব। ওই সময়ে বাংলাদেশে কোনো পরিবর্তন হলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই হতে হবে, এমন ধারণা ছিল।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে খুব ভালো চলছে, তা বলা যাবে না। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন পরিসরে ছোট হলেও অনেক ভালো চলত। তখন ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান মেনে চলত এবং খুব শৃঙ্খলভাবে চলছিল।
ছাত্র আন্দোলন বলতে কিছু ছিল না। তখন ব্রিটিশ ধারাই বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন শুরু হয়। সংবিধান ও দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে এই ভেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দোলন করে। এতে অভিভাবকরাও যোগ দেন। তার পর দেশের অবস্থা যখন আরও খারাপ হতে থাকে তখন সামর্থ্য অনুযায়ী পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশে চলে যায় এবং নাগরিকত্ব নিয়ে নেয়। এভাবে এ দেশ থেকে অনেক লোক বিদেশে চলে গেছে। যার কোনো হিসাব নেই। তখন এই ছাত্রদের বিদেশ যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলো। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় চালু হয়েছে। কিন্তু কার্যকর হয়েছে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন। তার পর শেখ হাসিনা আসার পরও সেই ধারা বজায় ছিল। পুনররায় বেগম খালেদা জিয়া আসার
পরও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। তার পর দেশের কিছু স্কুল ও কলেজে ইংরেজি ভার্সন চালু হয়।
তখন অনেকে ধারণা করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা টিকবে না। বিভিন্ন ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়োজন করা হলো।
প্রথম দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় করা হলো। তখন কেউ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যাঞ্চেলর হতে চাননি। খালেদা জিয়ার সময় এ বিশ্ববিদ্যালয় হয়। আবদুল বারি নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর ছিলেন। পরে তাকে ভিসির দায়িত্ব দিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা আরম্ভ হলো।
যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে, তাদের মধ্যেও অনেক মেধাবী আছে। সেসব মেধাবী ছাত্র এখন সরকারি চাকরিও করছে। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা পাস করে তারা চাকরির পরীক্ষার ক্ষেত্রে বেশি মেধার পরিচয় দেয়। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই ভালো চাকরিগুলো পেয়ে থাকে। পাবলিক পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। সরকারি অফিসগুলো অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়কে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চায় না। বিসিএস পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একটু ভালো উত্তর দিতে পারে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও মোটামুটি কথা বলতে পারে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সে ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে রয়েছে।
এখন পুরো জাতিই রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভেতরেও অনেক দুর্বলতা আছে। জাতীয় ঐক্যের মনোভাব যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিতে হয়, তাহলে তারা কীভাবে পড়াশোনায় মনোনিবেশ করবে। জাতীয় ঐক্যের মনোভাব যদি রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীদের হাতে থাকত, তাহলে ফল ভালো হতো। মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত, বাঙালি অনেক নিকৃষ্ট জাতির মানুষ, তারা ভালো কিছু করতে পারবে না। এ ধরনে কথা ঢাকা থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যন্ত মানুষের মুখে শোনা যায়। এ অবস্থায় বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে গড়ে উঠবে?
যে জাতীয়তাবোধ শেখ মুজিবুর রহমান, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে উঠছিল, সেই জাতীয়তাবোধ পরবর্তীতে কেউ ধরে রাখতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব চাইলে ছাত্রলীগের ঐক্য বজায় রাখতে পারতেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করার সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া কেউ নেননি। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষানীতির আমূল পরিবর্তন করতে হবে। তাহলে দেশে শিক্ষার পরিবর্তন আসবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাও কর্মে পিছিয়ে থাকবে না। সরকারকে শিক্ষার সেই নীতি ও পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে। ১৯৭২ সাল থেকেই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা ধরা হয়েছিল। নানা কারণে কোনো সরকারই তা কার্যকর করতে পারেনি। আমার মনে হয়, স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে হবে। পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পরই দুটি ভাগ করা উচিত। একটি সাধারণ শিক্ষা; যারা উচ্চশিক্ষায় শিখিত হবে। আরেকটি হলো কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষা চালু করা। যাদের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না তাদের কর্মমুখী শিক্ষার দিকে চলে যাওয়াই ভালো। তাহলে শিক্ষিত বেকারের হার কমে যাবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালকেও কর্মমুখী শিক্ষার দিকে যেতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা করলেও তারা যেন কর্মমুখী শিক্ষায় ভালো মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারে।
অনেক ছেলেমেয়ে মেধাবী হয়েও আর্থিক অনটনের জন্য পড়ালেখা করতে পারছে না। তাদের উচিত কর্মমুখী শিক্ষার দিকে চলে যাওয়া। উচ্চশিক্ষায় যারা পড়তে চায় তারা ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিকেল, বিজ্ঞান ও কলা অনুষদে ভিন্ন ধারায় পড়াশোনা করবে। এদের সংখ্যা খুব বড় হওয়া উচিত নয়। এভাবে জাতীয় শিক্ষাকে সংস্কার করে নিয়ে আসতে হবে। একথা অনেকবার পত্রপত্রিকায় বলেছি। শেখ হাসিনা স্বৈরশাসকের মতো আচরণ করেছেন। তিনি তা কখনো শোনেননি।
আমাদের দেখতে হবে শিক্ষাব্যবস্থা কেমন হবে। আরেকটা হলো- মূল শিক্ষানীতি কেমন হবে। মূল শিক্ষানীতি হলো একদম ভেতরের বিষয়। শিক্ষানীতি নিয়ে কখনোই কোনো সরকার কথা বলতে চায় না। তারা শুধু শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন করে। দেশে এখনো অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন যারা ভালো শিক্ষানীতি করে দিতে পারবেন। কিন্তু সরকার কখনোই তাদের কাছে ডাকে না। শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষার আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব। বাংলাদেশ আমাদের দেশ। এ দেশকে উন্নত করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কর্মমুখী করার জন্য সরকারকে আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। এখন নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও পরিচালনা করা কঠিন কাজ। যেহেতু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের ছেলেমেয়েরাই পড়াশোনা করে, তাহলে তাদের কর্মমুখী করতে হলে সরকারসহ দেশের বুদ্ধিজীবীদের এগিয়ে আসতে হবে। সুষ্ঠু শিক্ষানীতি ও কর্মমুখী শিক্ষা দিয়েই জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
লেখক: বাংলা একাডেমির সভাপতি ও রাষ্ট্রচিন্তক।