গণমাধ্যমের মূলধন হচ্ছে সততা ও সত্যনিষ্ঠা। সততাকে রক্ষা করতে হলে সততার যোদ্ধা হতে হবে। এটি একটি কঠিন এবং দুরূহ দায়িত্ব। আজকের পৃথিবী টাকার দাসত্ব করছে। সেখানে সততা কী করে থাকবে? কী করে সেই সততাকে রক্ষা করা যাবে? কী করে দেশের সাধারণ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে? সুস্থ ধারার সাংবাদিকতা মানে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা। নিরপেক্ষ জিনিসটা কিন্তু একটু কঠিন। নিরপেক্ষ মানেই সবার বিপক্ষ। কারণ এই পৃথিবীর সব দেশ সব জাতি দুটি বড় ভাগে বিভক্ত হয়ে থাকে। এখন আপনি যদি এই দুটি দলের যেকোনো একটিতে পড়ে যান, তবে আপনি নিরাপদ। আপনি নিরপেক্ষ থাকলে দুই দলই বলবে যে, আমার এ দলেও না, ওই দলেও না, মাঝখানে হাঁটাহাঁটি করে এই লোকটা দুই দলেরই সন্দেহ বাড়াচ্ছে। একে তো সহ্য করা যাবে না। সেজন্য নিরপেক্ষ থাকা বিরাট একটি কঠিন কাজ।
আমার কথা, একটি পত্রিকা আমি পড়ব কেন? কারণ একটা পত্রিকা আমি পড়ব, পড়ার আগে আমি যে মানুষটি ছিলাম, পত্রিকাটি পড়ার পরে আমি তার থেকে অপেক্ষাকৃত ভালো মানুষ হয়ে উঠব। আমি আরও উচ্চতর মানুষ হতে চাই। এটিই তো আমার পত্রিকা পড়ার উদ্দেশ্য। কিন্তু আমাদের পত্রিকাগুলো বৈশ্বিক মানে তো আমাদের নিচ্ছেই না, জাতীয় মানেও রাখতে পারছে না। আমি মনে করি, এখান থেকে আমাদের মুক্ত হওয়া দরকার। পত্রিকাগুলোর ভাষামান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পত্রিকাগুলোর বিষয়বস্তুর মান নিচে নেমে যাচ্ছে। সাংবাদিকতা এ দেশে অনেক বড় বড় অবদান রাখলেও গত ৩০ বছরের মধ্যে সাংবাদিকতাকে আমরা ক্রমে নিষ্প্রাণ হয়ে যেতে দেখেছি। শক্তিহীন হয়ে যেতে দেখেছি! সাংবাদিকতা যদি মানবিক মূলবোধ না জাগায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ না জানায়, জনগণের তো দাঁড়ানোর জায়গা থাকবে না। দেশ ও জনগণের ভরসা ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ থাকতে হবে।
আমাদের দেশ সবুজ সুন্দর উর্বরা একটি দেশ। ঐশ্বরিকভাবেই আশীর্বাদপুষ্ট একটা দেশ আমরা পেয়েছিলাম। এ দেশের ভূমি সমতল এবং পলিযুক্ত হওয়ায় যা কিছুই বপন করা হোক না কেন, কিংবা একটা আঁটি ফেললেও চারাগাছে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে এবং একসময় ফুলেফলে ভরে ওঠে। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা আমাদের দেশটাকে ভালোবাসতে পারিনি। সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারিনি। যে কারণে নাগরিক হিসেবে আমাদের আজ এই বেহাল অবস্থা। আমরা সবাই এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছি।
সত্যি বলতে, অনেকদিন আমাদের কোনো রাষ্ট্র ছিল না। বহু বছর আমরা পরাশক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। সব ধরনের কৃষিজাত পণ্যসহ সবকিছুই এ দেশে ফলন ভালো হওয়ায় বাংলাদেশ ছিল নানারকম ব্যবসা-বাণিজ্যের ঘাঁটি। ব্রিটিশ আমলেও সারা ভারতবর্ষের ২৮ শতাংশ অর্থাৎ এক তৃতীয়াংশ রাজস্ব আমাদের দেশ থেকেই সংগ্রহ করত। কিন্তু আমাদের কোনো অভিভাবক বা সরকার ছিল না। আমরা তখনো শোষিত ছিলাম। আজও আমরা সেই ঔপনিবেশিকতার দৌরাত্ম্য বা উৎপাত থেকে মুক্ত হতে পারিনি। অভ্যন্তরীণভাবেও আমরা নানারকম বিভেদ-বিভাজনের মধ্যে পড়ে রয়েছি। ফলে নিজেরা কতটা পিছিয়ে পড়ছি, অন্যদের কতটা পিছিয়ে দিচ্ছি এবং দেশের মানুষ আমরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, সেটাও ভেবে দেখার দরকার আছে। বহু বছর ধরে পরাশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে করে শৃঙ্খলমুক্ত হলেও আমরা নিজেরা আজও শৃঙ্খলমুক্ত হতে পারিনি। শিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের বিপরীতে গিয়ে সর্বত্র আমরা অসুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠছি।
বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভগ্নপ্রায়! জনগোষ্ঠীর অধিকাংশকেই আমরা সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারিনি। একই সঙ্গে মেধার বিস্তার ঘটাতে আমরা বলা যায় ব্যর্থ হয়েছি। যে কারণে মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি না হয়ে সামাজিক অস্থিরতা বহু গুণে বেড়েছে। ভাইয়ে ভাইয়ে আগের সেই ভাতৃত্ববোধ নেই। নির্বোধের মতো আমরা দেশজুড়ে রোমহর্ষক ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। এমন দেশ আমরা চেয়েছিলাম কি? আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার পাশাপাশি আত্ম-অনুশোচনার সময় এসেছে।
বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভগ্নপ্রায়! জনগোষ্ঠীর অধিকাংশকেই আমরা সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারিনি। একই সঙ্গে মেধার বিস্তার ঘটাতে আমরা বলা যায় ব্যর্থ হয়েছি। যে কারণে মানুষের মধ্যে নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি না হয়ে সামাজিক অস্থিরতা বহু গুণে বেড়েছে। ভাইয়ে ভাইয়ে আগের সেই ভাতৃত্ববোধ নেই। নির্বোধের মতো আমরা দেশজুড়ে রোমহর্ষক ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত। এমন দেশ আমরা চেয়েছিলাম কি? আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার পাশাপাশি আত্ম-অনুশোচনার সময় এসেছে।...
আমরা যদিও আশাবাদী মানুষ এবং আমি বিশ্বাস করি, সবকিছুই ফিরে ফিরে আসে। একসময় আমাদেরও আসবে। হয়তো তখন আমরা থাকব না। আমরা গত ৫০০ বছর ধরে রেনেসাঁ, শিল্পবিপ্লব অনেক কিছুর মধ্যদিয়ে অনেক উঁচুতে উঠেছি। এখন আবার সেখান থেকে আমাদের পতন ঘটে যাচ্ছে এবং সেটা সারা পৃথিবীতেই। ৫০০ বছর ধরে আমাদের এই পৃথিবী ওপরের দিকে উঠেছে, এখন কিছুকালের জন্য নেমে যাবে হয়তো এবং এটা আমাদের মেনে নিতে হবে। এর সঙ্গে কী করে যুদ্ধ চালিয়ে আবার আমরা সেই উন্নত জায়গায় চলে যেতে পারব, নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের যুদ্ধ-সংগ্রাম করতে হবে।
নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কথা যদি বলি- সেথায় আনন্দের সঙ্গে কাজ করি। একটা স্বপ্ন ছিল, দেশের অজ্ঞতার যে দুঃখ, সেটা আমাকে কষ্ট দিত এবং মনে হয়েছে যে, আমার যেটুকু সাধ্য, সেটা আনন্দের সঙ্গে করে যাই। সেটা না করলে হয়তো আরও খারাপ কাজ করতে হতো। সেক্রিফাইস যা করেছি, তার চাইতে পেয়েছি বেশি। যে আনন্দটা পেয়েছি, এটা ঠিক ওই ধরনের সেক্রিফাইস দিয়ে হয় না। এটা আমার মনে হয় এবং এতেই আমি খুশি। এরপরে কী হবে না হবে, সেটা পরের প্রজন্ম দেখবে। আমরা ছোট পিঁপড়ের মতো মানুষ। আমি তারুণ্যের সঙ্গে থাকতে চেষ্টা করে জীবন কাটিয়েছি। উৎসব করেছি। তাদের সঙ্গে লেখাপড়াসহ জীবনের বহু কিছুতে অংশ নিয়েছি। ব্যক্তি আমার জন্য এর চাইতে ভালো জীবন আর কী হতে পারে? অনেকে তরুণদের পছন্দ করে না। কিছু লোক আছে, যারা তরুণদের দেখলে আস্তে করে অন্য দিকে সরে যায়। তাহলে তরুণরা তাকে আস্থায় নেবে কেন? তাকে ভালোবাসবে কেন? তাকে বন্ধু মনে করবে কেন? আমাদের তরুণদের দিকে এগিয়ে যেতে হবে এবং আমাদের তাদের শেখাতে হবে। তাদের পথ দেখাতে হবে।
আগামীতে কী হবে, সেটা তো আমরা কেউ বলতে পারি না। যে যা মনে করে, সে তা বলে দেয়। একটাই সত্যি, সেটা হচ্ছে যা ঘটে গেছে তা অতীত। অতীতকে মূল্যায়ন করে সামনে এগিয়ে যাওয়া হতেও পারে, নাও হতে পারে। অতীতকে কে কীভাবে নেবে। অতীতে কেউ যদি প্রচণ্ডভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, তাহলে সে একভাবে নেবে, আবার যার অতীত খুব সুখের ছিল, আনন্দের ছিল, আশাবাদিতায় ভরা ছিল, বড় কিছুর স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ ছিল, সে আবার আরেকভাবে নেবে। প্রত্যেকটা মানুষ আলাদা, প্রতিটি গোলাপ আলাদা এবং স্বকীয় আমাদের ভাবতে হবে।
আমি শিক্ষকতায় গিয়েছিলাম অনেক স্বপ্ন নিয়ে। ভেবেছিলাম শিক্ষার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে, আগামী প্রজন্মকে অর্থপূর্ণ কিছু উপহার দেব। কিন্তু সেটা হয়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার জন্যই সেটা সম্ভব হয়নি। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা ছককাটা, গৎবাঁধা, গতানুগতিকতাদুষ্ট। শেষ পর্যন্ত আমি সেই শিক্ষকতা থেকে চলে আসি। বুঝলাম, এটা আমার জায়গা নয়। নিজের পরামর্শ নিজেকেই দিতে হয়। সেই পরামর্শ যে নিজেকে ঠিকমতো দিতে পারে, সে জীবনে অন্যের অনেক উপকারে আসতে পারে। আর যে দিতে পারে না, সে কারও উপকারে আসতে পারে না। আমাদের ছোট একটা দেশে ১৮ কোটি লোক, সাধ্যের মধ্যে যা পারি করি। আমরা কেউই থাকব না। অনেকের মনের মধ্যে হয়তো চাপা আশা অনেক সময় কাজ করে। আমাদের সেই চেষ্টাটুকু স্বার্থক করে তুলতে হবে। রবীন্দ্রনাথও মৃত্যুর আগে বলেছেন, ‘হে উদাসীন পৃথিবী আমাকে সম্পূর্ণ ভুলবার আগে তুমি ভুলে যাবে, তুমি পৃথিবীর কত বিশ্ব চরাচরের, কত বিশাল বিশাল কিছুকে ভুলে গেছো, আমার মতো একটা তুচ্ছ মানুষকে মনে রাখবে, এই আশা করতে পারি না। কিন্তু আমাকে সম্পূর্ণ ভুলবার আগে তোমার নির্মম পদপ্রান্তে রেখে যাই আমার প্রণতি।’
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র