ঢাকা ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

বিদ্যুতে থাকবে না ভর্তুকি, বাড়বে দাম

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৪, ১০:১৫ এএম
বিদ্যুতে থাকবে না ভর্তুকি, বাড়বে দাম
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ সামলাতে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করাটাই এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। দাম বাড়ানোকে মন্ত্রণালয় বলছে দাম সমন্বয়। এর সঙ্গে রয়েছে আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী আগামী তিন বছরে বিদ্যুতের ওপর থেকে সব রকম ভর্তুকি উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়।

২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সারের ওপর সরকারি ভর্তুকি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি বরাদ্দ ৮৪ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা এবং আগামী বছরের বাজেটেও প্রায় একই পরিমাণ বরাদ্দ হতে পারে বলে জানিয়েছে অর্থবিভাগ। আর চলতি অর্থবছরে বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা।

গত বছরের জানুয়ারিতে আইএমএফের চার দশমিক সাত বিলিয়ন ডলার ঋণ কর্মসূচিতে প্রবেশের পর সরকার তিন বার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। আর এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে আরেক দফা বাড়ে বিদ্যুতের দাম। গত দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার ও খুচরায় ১৪ দফা বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। 

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরেও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে সাত থেকে আট টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে সরকারকে।

প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ প্রায় ১২ টাকা। আর আমরা গড়ে প্রতি ইউনিট বিক্রি করছি সাত টাকায়। ফলে সমন্বয়টা ওপরের দিকে বেশি করছি, নিচের দিকে কম করছি।’ 

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, দাম বাড়ানোর রূপরেখা প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। খুবই সামান্য করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হবে যাতে গ্রাহকরা বড় ধাক্কা না খায়। ধাপে ধাপে বছরে চারবার বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় করবে সরকার। আগামী তিন বছরে এই প্রক্রিয়ায় মোট ১২ দফায় বিদ্যুতের দাম নিয়ে আসা হবে উৎপাদন খরচের সমান বা কাছাকাছি। 

গত ৬-৭ মে ঢাকা সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদলকেও এ কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গত সপ্তাহে এ সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। আইএমএফের বর্তমান দলটি ২৪ এপ্রিল থেকে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সঙ্গে ৮ মে পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক করে।

ভোক্তা পর্যায়ে অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন (ক্যাব) ও সিপিডি এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে। পদ্ধতিগত ত্রুটি ও সঠিক পরিকল্পনার ঘাটতি এবং নির্দিষ্ট গ্রাহকশ্রেণির জন্য ইউনিট প্রতি দাম কেমন হবে সেসব বিষয়ে সমন্বয়ের কথা বলছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা। 

দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে ক্যাব। সংগঠনটির জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘খরচ কমিয়েও সরকার ভর্তুকি সমন্বয় করতে পারে। অনিয়ম, দুর্নীতি, অপচয় রোধ করে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ কমানোর দিকে সরকারের মনোযোগ নেই। চাহিদা না থাকলেও দরপত্র ছাড়া একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে এ খাতের খরচ আরও বাড়ানো হচ্ছে। সরকার অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করলে এ খাতে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনই হতো না।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার জ্বালানিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ম. তামিম ভর্তুকি সমন্বয় প্রসঙ্গে খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভর্তুকি কমাতে দাম বাড়বে সেটা যেমন সত্য আবার দাম বাড়া নির্ভর করে জ্বালানি তেল ও কয়লার আন্তর্জাতিক মূল্যের ওপর। যেমন গত বছর ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেশি ছিল জ্বালানি তেলের বাজারের অস্থিরতার কারণে। এ বছর চিত্র পাল্টেছে। যে কয়লা গত বছর আন্তর্জাতিক বাজারে ১৮০ ডলারে বিক্রি হয়েছে এবার তা ১২০ ডলারে নেমেছে। আবার কমেছে জ্বালানি তেলের দামও। ফলে দাম কেমনভাবে বাড়ানো হবে এটা প্রথম সমন্বয় করতে হবে। বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকি কমানোর ভালো বিকল্প হচ্ছে দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানো।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে পুরোপুরিভাবে ভর্তুকি কমানো সম্ভব হবে না। গ্রাম পর্যায় এবং উৎপাদনমুখী শিল্পে বিদ্যুতে ভর্তুকি দিতেই হবে। না হয় এর প্রভাব পড়বে চিনি, মোবাইল, ইলেকট্রনিক্স ও ওষুধ শিল্পের মতো যেসব শিল্পের উৎপাদন দেশেই হয় তার ওপর।’

সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিদ্যুতের বর্ধিত ক্যাপাসিটি না কমিয়ে এ খাতের ভর্তুকির চাপ সম্পূর্ণ ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া অযৌক্তিক। ইউনিট প্রতি ৩৪ থেকে ৭০ পয়সা পর্যন্ত বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। ৮ দশমিক ৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকরের ঘোষণা দিয়ে ভোক্তার ওপর এক বছরের ব্যবধানে সাড়ে ১৭ শতাংশ বাড়তি খরচের বোঝা চাপিয়েছে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়। ভর্তুকি সমন্বয়ের নামে দাম বৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানার খরচের পাশাপাশি ভোক্তাদের খরচ বাড়বে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। দেশের নিম্ন থেকে মধ্যবিত্ত পরিবারের খরচ বাড়বে ১০৬ থেকে ১১৮ টাকা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) পাশ কাটিয়ে নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এইসব সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক।’

ক্যাপাসিটি বলতে পাওয়ার সেল বলছে- ‘ক্যাপাসিটি চার্জটা পুরো বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি অংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে গেলে দুটি বড় ব্যয় রয়েছে- একটি হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির মূল্য এবং আরেকটি হলো বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয়। ক্যাপাসিটি চার্জটা উৎপাদন ব্যয়ের অন্তর্ভুক্ত।’

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আইন সংশোধন করে বিইআরসির পাশাপাশি দাম বাড়ানোর ক্ষমতা হাতে নেয় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। এরপর থেকে নির্বাহী আদেশে দাম বাড়িয়ে আসছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০১০ সালে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটি আইন করা হয়েছিল যে আইন অনুযায়ী বিদ্যুৎ খাতের ইউনিট প্রতি দাম ও খরচের মডেল জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকবে। এই আইন জবাবদিহির জায়গা নষ্ট করেছে। 

পিডিবি, পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ, ডেসকোসহ বিভিন্ন সংস্থা ২০১৩ সাল থেকে যে ৬৭টি প্রকল্পের কাজ শুরু করেছে তার অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে পরিকল্পনা কমিশন। সেই প্রতিবেদনে কমিশন এসব প্রকল্পকে হতাশাজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে। 

বিদ্যুতের দামের বর্তমান চিত্র
সর্বশেষ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি সর্বনিম্ন ২৮ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ এক টাকা পঁয়ত্রিশ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে গড়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ। এ বছর পহেলা ফেব্রুয়ারি থেকে নতুন এই দাম কার্যকর করা হয়। 

বিভিন্ন সংগঠন ও গণমাধ্যমের হিসাব বলছে, বাসাবাড়িতে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বা লাইফলাইন গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ২৮ পয়সা। আগে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য তাদের খরচ করতে হতো চার টাকা ৩৫ পয়সা। এখন সেটি বেড়ে হয়েছে চার টাকা ৬৩ পয়সা। অর্থাৎ দাম সাড়ে ছয় শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। 

এই শ্রেণির গ্রাহকরা সাধারণত বাসায় একটি ফ্যান ও দুটি বাতি চালান এবং মাসে সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। এর ফলে ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী একজন লাইফলাইন গ্রাহকের আগে যেখানে মাসে নিট বিল আসত ২১৭ টাকা ৫০ পয়সা, এখন সেটি বেড়ে বিল আসবে ২৩১ টাকা ৫০ পয়সা। অন্তত ১৪ টাকা বেশি বিল দিতে হবে এই শ্রেণিকে। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বাংলাদেশে এ ধরনের গ্রাহক রয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ।

যাদের বাসায় একাধিক বাতি, ফ্যান, টিভি, ফ্রিজ এবং একটি এসি রয়েছে, তারা সাধারণত ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করে থাকে। তাদের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে ইউনিট প্রতি ৫৭ পয়সা। ফলে এখন থেকে মাসে তাদের প্রায় একশ টাকা বেশি বিল গুনতে হচ্ছে। আগে এই শ্রেণিতে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম ছিল ছয় টাকা ৬৩ পয়সা। এখন সেটি বাড়িয়ে প্রতি ইউনিটের নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে সাত টাকা ২০ পয়সা।

অন্যদিকে, আবাসিকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের। মূলত, বিত্তবানরাই এই শ্রেণির গ্রাহক। তাদের জন্য ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতে দাম সর্বোচ্চ ১ টাকা ৩৫ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

আগে যেখানে প্রতি ইউনিটের জন্য তাদের মূল্য দিতে হতো ১৩ টাকা ২৬ পয়সা, এখন সেটি বেড়ে হয়েছে ১৪ টাকা ৬১ পয়সা। ফলে আগে ৬৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে যেখানে বিল আসত আট হাজার ৬১৯ টাকা, এখন সেখানে বিল দিতে হবে ৯ হাজার ৪৯৬ টাকার মতো। অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে তাদেরকে আটশ টাকার মতো বাড়তি বিল দিতে হবে।

সেই মমতাজ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০৩:২০ পিএম
সেই মমতাজ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার
মমতাজ বেগম ওয়ারিশিকা

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কর্মকর্তা পরিচয়ে বেকার যুবকদের চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মমতাজ বেগম ওয়ারিশিকা (৩৬) নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। 

গত বুধবার বিকালে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মধ্যম মাহমুদাবাদ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সীতাকুণ্ড থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ সুলাইমান। তিনি বলেন, মমতাজকে র্যাব-৭-এর একটি টিম গ্রেপ্তারের পর গতকাল বৃহস্পতিবার থানায় সোপর্দ করেছে। এ সংক্রান্ত বিষয়ে র্যাবের একজন ডিএডি বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছেন। 

গ্রেপ্তার মমতাজ বেগম সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের শেখেরহাট এলাকার হাঁচুপাড়ার এমদাদ হোসেন প্রকাশ মনি টেইলার্সের মেয়ে। তার স্বামী মুজিবুর রহমান পেশায় একজন হাইস্কুল শিক্ষক। তার বাড়ি বাড়বকুণ্ডের মধ্যম মাহমুদাবাদ গ্রামে। মমতাজ বেগম সীতাকুণ্ড পৌরসভার প্রেমতলা এলাকার বাড়িতে বসবাস করতেন।  

র্যার অভিযান কালে মমতাজ থেকে ১৭৬০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। তার কাছ থেকে একটি মোবাইল, একটি ট্যাব ও ভিজিটিং কার্ড জব্দ করা হয়েছে। 

র্যাবের মামলায় উল্লেখ করা হয়, ২০১১ সালে সীতাকুণ্ডের বড় কুমিরার মঞ্জুর হোসেন নামে এক যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর তিনিসহ তার পরিচিত ৬ জনকে এনএসআইয়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলে মোট ৫৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা নেন। পরে তারা ঢাকায় পরীক্ষা দেওয়ার পরও চাকরি হয়নি। সে সময় আনোয়ার শাহাদাত নামে এক লোক এসে তাদের এনএসআই-এর এডি হিসেবে পরিচয় দেন। মমতাজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা পায় র্যাব। 

মমতাজের প্রতারণায় নিঃস্ব বহু মানুষ, কোটি টাকা লোপাট

মমতাজ বেগম ওয়ারিশিকা ছিলেন একজন এনজিও কর্মী। চাকরি ছেড়ে দিয়ে হঠাৎই বনে গেলেন জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কর্মকর্তা। প্রধানমন্ত্রীর অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার পরিচয় দিয়ে ছাপিয়েছিলেন ভিজিটিং কার্ডও। কখনো এনএসআইয়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (এডি), এনএসআই নিয়োগ বোর্ডের সদস্যসচিব ও ক্রাইম ইনভেস্টিগেট উপপরিচালক হিসেবেও পরিচয় দেন। সবটাই ছিল তার প্রতারণা। 

একজন সাধারণ নারী হয়েও গোয়েন্দা কর্মকর্তা পরিচয়ে অন্তত ৩০ জন বেকারকে চাকরি দেওয়ার নামে তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি টাকা। ছাড়েননি আত্মীয়স্বজনকেও। কেউ কেউ বলছেন, প্রতারণার শিকারের সংখ্যা অর্ধশতাধিক হবে। খবরের কাগজের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

এ বিষয়ে এনএসআইয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন। মমতাজ বেগমের সঙ্গে এনএসআইয়ের কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা নেই।

ভুক্তভোগীরা চাকরি অথবা টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় এতদিন চুপ থাকলেও এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন মমতাজ। বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে তার মোবাইল ফোন। 

মমতাজের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ও সোর্স মীর হোসেন জমিজমাসহ বিপুল পরিমাণ সম্পদ বানিয়ে সৌদি আরবে পালিয়েছেন। জামাল নামের একজন সীতাকুণ্ড পৌর সদরে ফলের ব্যবসা করেন। এই দুজনই মানুষকে সরকারি চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে মমতাজের কাছে নিয়ে যেতেন। এনএসআইয়ের সোর্স, ওয়াচার, কনস্টেবল, ফিল্ড অফিসার ছাড়াও পুলিশ, রেলওয়ে, এলজিইডিসহ সরকারি বিভিন্ন বিভাগে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে টাকা নেওয়া হতো। টাকা নেওয়ার পর বছরের পর বছর ঘোরাতেন মমতাজ। কেউ বেশি বিরক্ত করলে চাকরি হয়েছে বোঝাতে বেতন নেওয়ার জন্য ব্যাংক হিসাব খোলাতেন। কথায় কথায় নিজের পদবি উল্লেখ করে দিতেন হুমকি। নিয়ন্ত্রণ করার জন্য সবাইকে নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে গ্রুপ খোলেন একপর্যায়ে। সেই গ্রুপে এনএসআইয়ের লোগো ব্যবহার করা হতো।

ভুক্তভোগীদের একজন মো. জাফর। সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের মধ্যম মাহমুদাবাদ (অনন্তপুর) এলাকার একজন চা-দোকানি। ২০২২ সালে জামালের মাধ্যমে মমতাজের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মমতাজের শ্বশুরবাড়িও জাফরের এলাকায়। তাই তাকে তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। তার এইচএসসি পাস ছেলেকে এনএসআইয়ের ওয়াচার পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ৬ লাখ টাকা নেন। বিশ্বাসযোগ্য করতে মমতাজ ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে হাওলাতনামা সই করেন। তার দেওয়া এনএসআইয়ের লোগোসংবলিত ভিজিটিং কার্ডে ইংরেজিতে লেখা রয়েছে মমতাজ বেগম ওয়ারিশিকা, প্রাইম মিনিস্টারস অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার। মোবাইল নাম্বারের নিচে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে প্রাইম মিনিস্টার কার্যালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার পুরাতন সংসদ ভবন, তেজগাঁও, ঢাকা। 

জাফর বলেন, এক মাসের মধ্যে তার ছেলের চাকরি হবে- এমন আশ্বাসের ভিত্তিতে তিনি এনজিও থেকে ঋণ ও দোকান বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে তাকে দেন। চাকরি তো হয়ইনি, বরং ছেলের সনদ হারিয়ে ফেলেছেন মমতাজ। টাকা ফেরত চাইলে ধমকান। জামাল ফল ব্যবসার আড়ালে মমতাজের সোর্স হিসেবে কাজ করেন। জামালই সবাইকে উৎসাহ দিয়ে মমতাজের কাছে এনেছেন। তার পেছনে আছেন গাড়িচালক মীর হোসেন। এই দুজন প্রত্যেকের টাকা থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন খেয়েছেন। 

খবরের কাগজ অন্তত ৩০ জনের সন্ধান পেয়েছে এবং ২০ জনের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছে। যাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে মমতাজের ভয়ংকর প্রতারণার সব কাহিনি। এক হিসাবে দেখা গেছে, মমতাজ চাকরি দেওয়ার নাম করে অন্তত ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। আবার নানা চাপে পড়ে কারও কারও টাকা ফেরতও দিয়েছেন। 

মমতাজের গাড়িচালক মীর হোসেন খবরের কাগজকে জানান, তিনি প্রায়ই নোয়াখালীর চৌমুহনী বাজারে যেতেন তাকে নিয়ে। সেখানে শাহাদাত আনোয়ার নামে একজনের সঙ্গে দেখা করতেন। তাকে নিয়ে ঢাকার ধানমন্ডি, পিলখানা, কক্সবাজার, কুমিল্লা এবং চট্টগ্রামের লালখান বাজারেও আসা-যাওয়া করতেন। একসময় চাকরি সরকারীকরণের কথা বলে মীর হোসেনের কাছ থেকেও টাকা নেন মমতাজ। পরে মীর হয়ে ওঠেন সোর্স। ধীরে ধীরে বেকার লোকজন ভজিয়ে আনতে থাকেন। নিজ ভাতিজা নুর হাদিস, প্রতিবেশী মঞ্জু, মোয়াজ্জিন মামুনসহ অনেককেই তিনি লেনদেন করিয়ে দেন সোর্স পদে চাকরির জন্য। এসব বিষয় স্বীকার করলেও বাড়ি, জমি কেনার কথা অস্বীকার করেছেন মীর হোসেন। 

তবে মীর হোসেন জানিয়েছেন, তিনি চালক হিসেবে মাসে ২০ হাজার টাকা এবং সোর্স হিসেবে ১৪ হাজার টাকা- মাসে ৩৪ হাজার টাকা পেতেন। একাধিক ভিডিওতে মীর হোসেনের টাকা লেনদেন করিয়ে দেওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। তিনি নিজেই জানিয়েছেন, মমতাজ ৩৫ লাখ টাকা দিয়ে একটি প্রিমিও প্রাইভেট কার কিনেছিলেন। 

মো. নুরুজ্জামান খোকন নামে আরেকজন বেকার ভুক্তভোগী। এনএসআইয়ে ফিল্ড অফিসার পদে চাকরির জন্য ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে বিভিন্ন সময়ে সাড়ে ৯ লাখ টাকা দেন মমতাজকে। খোকন জানান, তার জানামতে এই পদের জন্য সাতজন টাকা দিয়েছেন। তারা সবাই ২০২৩ সালের এপ্রিলে ঢাকায় গিয়ে লিখিত, মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেন। পরীক্ষার আগে তাদের বলা হয় যা পারা যায় তা লিখতে, বাকিটুকু তিনি দেখবেন। হল ছাড়ার আগে খাতার এক কোণে ৬৬৬১ কোড নম্বর লিখে আসতে বলা হয়। খোকন জানান, এটিই তার ব্যক্তিগত কোড নম্বর। এই নম্বর দিয়েই নাকি তাদের কন্ট্রাক্ট চিহ্নিত করা হবে। চাকরিও হয়নি, টাকাও ফেরত পাওয়া যায়নি। দুই মাস ধরে মমতাজের সব কটি ফোন বন্ধ। 

মমতাজের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন আরও অনেকে। এদের মধ্যে আছেন ব্যবসায়ী, সিএনজিচালিত অটোচালক, রাজনৈতিক দলের কর্মী, সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্যও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মমতাজ যাদের এনএসআইয়ে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছেন, তাদের বেশির ভাগই বিএনপি-জামায়াতের কর্মী-সমর্থক। তারা জানান, উচ্চতায় প্রায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি, শারীরিক গড়ন হালকা পাতলা, গায়ের রং শ্যামলা। বয়স ৩৬ ছুঁইছুঁই। দুই সন্তানের জননী, চলতেন প্রাইভেট কারে। এসব দেখে মানুষ তাকে বিশ্বাস করত।
 
প্রাণিসম্পদ ওষুধের ব্যবসায়ী রায়হান উদ্দিন সোর্স হওয়ার জন্য জামালের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা দেন। বাড়বকুণ্ডের নাজিম, তারেক, মিরসরাইয়ের আবু তোরাবের মুন্না, সৈয়দপুর ইউনিয়নের শামছুল হক (অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য) ও তার ছেলে মো. শামীম নূর রহমান, একই ইউনিয়নের জেবল হোসেন (অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য) সীতাকুণ্ড বাজারের ফল ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন টিটু ও কামরুল, বাড়বকুণ্ডের খোরশেদ আলমসহ আরও বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে মমতাজ নিয়েছেন অর্ধকোটি টাকা। 

বাড়বকুণ্ডের আনোয়ার হোসেন দেন ছয়জনের জন্য মোট ৩৫ লাখ টাকা। মমতাজের স্বামীর সহকর্মী স্কুলশিক্ষক সাইদুল ইসলাম সোহেলের দুই আত্মীয়ের কাছ থেকে ৭ লাখ টাকা। তার আরেক পরিচিতজন বেলালের কাছ থেকে নিয়েছেন ছয়জনের জন্য ১৩ লাখ টাকা। বাড়ির পাশের এক নারীর কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা, বোনজামাই নাহিদের কাছ থেকেও নিয়েছেন মোটা অঙ্কের টাকা। 

ভুক্তভোগীদের একজন সাবেক সেনাসদস্য শামছুল হক বলেন, তিনি এনএসআই কর্মকর্তা পরিচয় দিলেও একদিন এনএসআইপ্রধানের নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলতে পারেননি। 

তিন মাস ধরে এক ডজন যুবকের ভুয়া চাকরি, খোলা হয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট 

২০২১ সাল থেকে চাকরির জন্য টাকা নিতে থাকেন মমতাজ। ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়েও চাকরি না হলে সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। পরে নতুন ফন্দি আঁটেন মমতাজ। এনএসআইয়ের লোগো দিয়ে খোলেন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ। এরপর সেখানে সবাইকে যুক্ত করে বিভিন্ন নির্দেশনা দিতে থাকেন। তার আগে সবাইকে দিয়ে উত্তরা ব্যাংকে হিসাব খোলানো হয়। সর্বপ্রথম সীতাকুণ্ড বাজারে ইসলামী ব্যাংকের শাখা থেকে তার টাকার ব্যাগ ছিনতাই হয়েছে বলে সবাইকে বাজারে রাউন্ড ডিউটি করতে বলা হয়। সেই সঙ্গে সন্দেহভাজন যে কাউকে নজরে রেখে প্রয়োজনে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন। ওই সময়ের এক অডিওতে মমতাজকে বলতে শোনা গেছে, চুরি-ছিনতাই বেড়েছে, তোমরা রাউন্ডে থাকো। এরপর সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শিব চতুর্দশী মেলা এবং দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তাদের দিয়ে ডিউটি করানো হয়।

রায়হান উদ্দিন, নাজিম, তারেক, জামাল ও মমতাজের বোনজামাই নাহিদ চৌধুরী বলেন, তারা কয়েক মাসের বেতন ব্যাংকে পেয়েছেন, আর কয়েক মাসের পেয়েছেন হাতে হাতে। 

পুলিশকেও পরিচয় দিতেন অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার হিসেবে 

গত ঈদের পর একজন পাওনাদার মমতাজের বাড়িতে টাকার জন্য চাপ দিলে তিনি নিজেই পুলিশে কল করেন। এরপর সীতাকুণ্ড থানা থেকে একজন এএসআই সেখানে গেলে মমতাজ নিজেকে প্রাইম মিনিস্টারের অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার হিসেবে পরিচয় দেন। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তাকে তিনি তার পরিচয়পত্র দেখাতে পারেননি।

কয়েকটি সূত্র থেকে জানা গেছে, সেবার মমতাজ ওসির পায়ে ধরে ক্ষমা চান। পুলিশের মধ্যস্থতায় সেখানেই মীমাংসা হয় বিষয়টি। এ বিষয়ে ওসি কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা পরে জানতে পারি তিনি প্রতারক। তখন তিনি চলে গেছেন। যখন থানায় এসেছিলেন, তখন কেউ অভিযোগ বা মামলা করেননি।’ প্রতারক মমতাজকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান ওসি।

কে এই মমতাজ? 

সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুর ইউনিয়নের শেখেরহাটের হাঁচুপাড়ার এমদাদ হোসেনের মেয়ে মমতাজ। তার বাবাকে সবাই মনি টেইলার্স নামে চেনেন। জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) আশায়। কয়েক বছর পর চাকরি ছেড়ে দিয়ে ২০২১ সালে তিনি পরিবারকে জানান, এনএসআইয়ে তার চাকরি হয়েছে। 

তার বোন জান্নাতের স্বামী নাহিদ চৌধুরী বলেন, ‘আমিও ভুক্তভোগী। সে যে ভুয়া, সেটা কখনো বুঝিনি। ভেবেছি পড়াশোনা করেছে, মাস্টার্স পাস, চাকরি পেলেও পেতে পারে। আমার নিজেরও এখন ১২ লাখ টাকার দেনা আছে। ঋণ নিয়ে তাকে দিয়েছিলাম। এ ছাড়া ২১ লাখ টাকার জিম্মি করা হয়েছে আমাকে। আমার একটা দোকান ছিল, এসব কারণে সেটাও বন্ধ করে দিয়েছি। তার কর্মকাণ্ডে জীবনটা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ঘরে-বাইরে কোথাও টিকতে পারছি না। সারাক্ষণ মানুষ আমাকে ধরছে। কারণ সবাই আমাকে চেনে। অথচ আমি কাউকে আসতে বলিনি তার কাছে।’ 

একই ধরনের কথা বললেন জান্নাতও। মমতাজের একটি নম্বরে কল দিলে তার ছেলে রিসিভ করে। মায়ের সঙ্গে কথা হয় জানালেও নম্বর দিতে রাজি হয়নি ছেলে। 

স্বামী স্কুলশিক্ষক মো. মজিবুর রহমান বলেন, ‘অর্থাভাবে তাকে আমি তালাকও দিতে পারছি না। আমার সামাজিক, ব্যক্তিগত সব মানসম্মান সে শেষ করে দিয়েছে। তার অপকর্মে বাধা দেওয়ার কারণে এক বছর ধরে আমার সঙ্গে বসবাস করে না। এখন ছেলে আমার কাছে এবং মেয়ে তার মায়ের কাছে থাকে।’

৪০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট ফাঁকি, পাওনা ১৪০ কোটি টাকা

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০২:৪৩ পিএম
৪০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট ফাঁকি, পাওনা ১৪০ কোটি টাকা

দেশের প্রথম সারির ৪০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা ভ্যাটের পরিমাণ ১৩৯ কোটি ২২ লাখ ১৯ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও ভ্যাট পরিশোধ করেনি, ‘দিচ্ছি আর দেব’তেই সীমাবদ্ধ ছিল। গত মার্চে বকেয়া আদায়ে এনবিআর এই ৪০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব জব্দ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পরও আদায় হয়েছে মাত্র ১৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

এনবিআর ১০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব খুলে দিলেও বাকিদের হিসাব জব্দই রেখেছে। এনবিআরের প্রতিবেদন থেকে এসব জানা যায়। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাওনা ১৮০ কোটি ৫০ লাখ ৯৪ হাজার ৫৬৪ টাকার একটি টাকাও পরিশোধ করেনি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাব এখনো জব্দ আছে। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কাছে পাওনা রাজস্ব ৮০ কোটি ১০ লাখ ৫৭ হাজার ৩৮০ টাকার একটি টাকাও পরিশোধ করেনি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব জব্দ আছে। ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাওনা ৩০ কোটি ৩ লাখ ১৯ হাজার ৯৭৩ টাকার ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করায় হিসাব খুলে দেওয়া হয়েছে। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাওনা ২৩ কোটি ৮০ লাখ ২ হাজার ৪৮৫ টাকার ৮ কোটি টাকা পরিশোধ করায় ব্যাংক হিসাব খুলে দেওয়া হয়েছে। মানারাত ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কাছে পাওনা ২ কোটি ৯৪ লাখ ৮৭ হাজার ৮০৮ টাকার কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি। ব্যাংক হিসাব জব্দ আছে। অতীশ দীপংকর ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির কাছে পাওনা ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩৫ টাকার ১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যাংক হিসাব জব্দ আছে। সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাওনা ৪৫ কোটি ৫ লাখ ৪ হাজার ৮৪৩ টাকার কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এভাবে প্রথম সারির ৪০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে আদায় হয়েছে মোট পাওনার ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে জানা যায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজস্ব পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখতে ১৪ সদস্যের টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এ টাস্কফোর্সে ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক শাখা, ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) কর্মকর্তারা আছেন। 

চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই টাস্কফোর্সের কর্মকর্তারা পর্যায়ক্রমে এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়, ব্যয়, কর-শুল্ক-ভ্যাট পরিশোধের তথ্য খতিয়ে দেখেন। বিশেষভাবে ব্যাংক লেনদেনের তথ্য, শিক্ষার্থী ভর্তির পরিমাণ এবং এ খাতে আদায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উপকরণ ক্রয়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজনের আয়-ব্যয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হয়। সব তথ্যপ্রমাণ যাচাই-বাছাই করে এই ৪০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজস্ব পরিশোধের তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এনবিআরের কাছে দাখিল করা তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিক্ষার্থী ভর্তির তথ্যে মিথ্যা হিসাব দেওয়া হয়েছে। রেজিস্ট্রারে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ও ভর্তি ফির ক্ষেত্রে যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, ব্যাংক লেনদেনে তার থেকে বেশি। আবার বিভিন্ন উপকরণ কেনা, সেমিনার, শিক্ষামূলক কার্যক্রম আয়োজন, প্রশিক্ষণ, বেতন-ভাতাসহ সব ক্ষেত্রেই হিসাবের রেজিস্টারের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেনের কোনো মিল নেই। বিনা বেতনে অনেক শিক্ষার্থীকে পড়ানো হচ্ছে এমন তথ্য দেওয়া হলেও তা সঠিক না। স্কলারশিপের তথ্যেও রয়েছে গরমিল। শুধু তাই নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ ব্যয়েও মিথ্যা হিসাব দেওয়া হয়েছে।

এনবিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘আয়কর আইন ২০২৩-এর ২১৪ ধারা অনুসারে গত ৪ মার্চ কর অঞ্চল-১১ থেকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার বরাবর চিঠি পাঠিয়ে ২০০২-০৩ থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ১৬ অর্থবছরে ১৮০ কোটি ৫০ লাখ ৯৪ হাজার ৫৬৪ টাকা রাজস্ব পাওনা দাবি করা হয়। চিঠিতে এ অর্থ ২৫ মার্চের মধ্যে পরিশোধের জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয় এবং সময়মতো রাজস্ব পরিশোধ না করলে ২০২৩-এর ২৭৫ ধারা অনুযায়ী জরিমানা আরোপসহ অন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। এ বিষয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, এনবিআর থেকে চিঠি পাঠিয়ে রাজস্ব পাওনার কথা বলা হয়েছে। আমরা আইনজীবীকে জানিয়েছি। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. ফকরুল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে রাজস্ব আদায়ে এনবিআর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে। বকেয়া পরিশোধ করলে জব্দ হিসাব প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।’

ধুঁকছে ইজারা দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ০২:৩৭ পিএম
ধুঁকছে ইজারা দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল
বন্ধ হয়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট জুট মিল। ছবি : খবরের কাগজ

চারপাশে সুনসান নীরবতা। শ্রমিকের কোলাহল নেই। কাজের পালাবদলে মিলের ভেপু আর বাজে না। তাঁতসহ যন্ত্রপাতি, লোহালক্কড় অযত্নে পড়ে আছে। জং ধরা ভাঙা মেশিন, এটা-সেটা খুলে পড়েছে যেখানে সেখানে। ২০২০ সালের ২ জুলাই লোকসানের কারণ দেখিয়ে বন্ধের পর চার বছর ধরে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল খুলনার ‘ক্রিসেন্ট জুট মিলস লিমিটেড’ এভাবেই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। 

এই মিলটিতে ১ হাজার ১০০টি তাঁত মেশিনে মাসিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৭৬৬ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন হেসিয়ান, ১ হাজার ২১০ দশমিক ৫০ টন সেকিং ও ২৪৪ দশমিক ৭৫ টন সিবিসি লুম। এখানে প্রিমিয়ার লেমিনেশন প্ল্যান্ট ইউনিটে প্রতিদিন ১০ হাজার পিস লেমিনেটেড ব্যাগ তৈরি করা সম্ভব ছিল। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি) মিলটি বন্ধের তিন মাসের মধ্যে আধুনিকায়ন করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দিয়ে চালুর কথা বললেও চার বছরেও তা সম্ভব হয়নি। 

একইভাবে বন্ধ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত দৌলতপুর জুট মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়া হয়েছে ফরচুন গ্রুপকে। দীর্ঘদিনেও তারা মিলের ২৫০টি তাঁত মেশিনের সব কয়টি চালু করতে পারেনি। স্বল্প পরিসরে উৎপাদনে কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫০-২০০ জনের। পাটকলের একাংশে বসানো হয়েছে জুতা তৈরির কারখানা। 

জানা যায়, বন্ধ হওয়া খুলনাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকলের মধ্যে এ পর্যন্ত চারটি ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে স্বল্প পরিসরে চালু হয়েছে দৌলতপুর ও জেজেআই পাটকল। বাকি পাটকলগুলো কবে চালু হবে, তা বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। ফলে দীর্ঘদিনেও সেখানে প্রত্যাশা অনুযায়ী মিলগুলোতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি।

পাটকল রক্ষায় সম্মিলিত নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট কুদরত-ই খুদা বলেন, ‘শ্রমিকের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলে লোকসান হয়নি। পাটকল বন্ধের পরও প্রতিবছর বিজেএমসি কর্মকর্তাদের পেছনে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। মূলত পাটকলের সম্পদের প্রতি পুঁজিপতিদের নজর পড়েছে। এগুলো ইজারা নিয়ে লুটপাট চালানো হবে।’ 

বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ্জামান বলেন, ‘দৌলতপুর ও জেজেআই পাটকল ইজারা প্রদানের পর স্বল্প পরিসরে চালু হলেও প্রত্যাশিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। এর আগে ইজারা দেওয়া খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত অ্যাজাক্স ও সোনালী জুট মিল লুটপাটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। পাটকল মালিকরা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়ে মিল বন্ধ করে দিয়েছেন।’ 

মিলে কর্মসংস্থানের হার ২ শতাংশের কম
২০২০ সালে খুলনাঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল বন্ধ হলে চাকরি হারান প্রায় ৩৩ হাজার ৩০৬ জন স্থায়ী-অস্থায়ী শ্রমিক। গত চার বছরে চারটি মিল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদন শুরু করেছে দৌলতপুর ও জেজেআই জুট মিল। দৌলতপুর জুট মিলে শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে ১৫০-২০০ জন। জেজেআই জুট মিলে কাজ করছেন ২৮০-৩০০ জন শ্রমিক। ৯টি পাটকলের বিপরীতে চার বছরে কর্মসংস্থানের হার মাত্র ১ দশমিক ৫১ শতাংশ।

প্লাটিনাম জুট মিলের সাবেক সিবিএ সভাপতি মো. খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের দাবি, মিল আধুনিকায়ন করে আবার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় চালু করা হোক। কিন্তু বিজেএমসি তা করেনি। তারা মিল ইজারা দিয়ে চালুর যে চেষ্টা করছে, তা শ্রমিকদের জন্য খুব একটা কাজে আসবে না।’

শ্রমিক নেতারা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত মিলে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা দিয়ে বিদায় করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আবারও মিলগুলো গড়ে তুলবেন। যাতে এ এলাকার দক্ষ শ্রমিকরা চাকরিতে পুনর্বহাল হতে পারেন। কিন্তু যারা লিজ নিয়েছে তাদের মধ্যে এ ধরনের কোনো তৎপরতা নেই।’

তবে বিজেএমসি খুলনা কার্যালয়ের আঞ্চলিক সমন্বয় কর্মকর্তা মো. গোলাম রব্বানী জানান, কিছুদিন পর পাটকল পুরোদমে চালু হবে। তখন এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বাড়বে ও প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

মিলের জমিতে অর্থনৈতিক জোন করার দাবি
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের অতীত ইতিহাস সুখকর নয় জানিয়ে নাগরিক নেতারা বলছেন, বিগত দিনে ইজারা দেওয়া সব কটি পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। পাটকলের সম্পদ মর্টগেজ দিয়ে ব্যাংক থেকে বিশাল অঙ্কের টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। মিলের দামি যন্ত্রাংশও গোপনে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। 

এদিকে বন্ধ হওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের জমিতে অর্থনৈতিক জোন করার দাবি উঠেছে। খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস এম কামাল হোসেন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী খুলনায় দুটি অর্থনৈতিক জোন করার ঘোষণা দিলেও জমি পাওয়া যায়নি। মিলের জমিতে অর্থনৈতিক জোন করে সেখানে গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হবে। শিল্পনগরী খুলনা হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলের অর্থনীতিও বদলে যাবে।’ 

এর মধ্যে গত ১৮ মে ইজারা দেওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পরিদর্শনে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। মন্ত্রী বলেন, ‘লিজ দেওয়া মিলগুলো দেখে আশ্চর্য হয়ে গেছি! শিল্প-কলকারখানা করার কথা বলে মিল বরাদ্দ নিয়েছে, কিন্তু আশানুরূপ কোনো ফলাফল দিতে পারেনি। এটা দুর্ভাগ্যজনক। মিলগুলোর সম্ভাবনাময় অবস্থানগত কারণে এগুলো নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।’

থাইরয়েড রোগী প্রায় ৫ কোটি, চিকিৎসক মাত্র ৩৫০

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১০:৫১ এএম
থাইরয়েড রোগী প্রায় ৫ কোটি, চিকিৎসক মাত্র ৩৫০
ছবি: সংগৃহীত

দেশের প্রায় ৫ কোটি মানুষ থাইরয়েডের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন। হিসাবে দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি। তবে থাইরয়েডে আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি জানে না যে তারা এ সমস্যায় ভুগছেন। অ্যাসোসিয়েশন অব ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড্রোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ডায়াবেটোলজিস্ট অব বাংলাদেশ (এসিইডিবি) সূত্র এ তথ্য তুলে ধরেছে। এ ছাড়া পুরুষদের তুলনায় নারীরা চার থেকে পাঁচ গুণ বেশি আক্রান্ত হন বলে জানিয়েছেন থাইরয়েড বিশেষজ্ঞরা। 

কিন্তু বিশাল সংখ্যার এই থাইরয়েড রোগীদের জন্য বর্তমানে দেশে নেই রোগ নির্ণয়ের সুবিধা। চিকিৎসা খরচও বেশি এবং পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় মানসম্পন্ন চিকিৎসা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অথচ থাইরয়েড রোগের কারণে হাইপোথাইরয়েডিজম, থাইরয়েড অটোইমিউনিটি, হাইপারথাইরয়েডিজম, গলগণ্ড এবং আয়োডিনের অভাবজনিত ব্যাধিসহ হতে পারে থাইরয়েড ক্যানসারও। বলছেন বিশেষজ্ঞরা। 

বিশ্বব্যাপী থাইরয়েড ব্যাধি হলো সবচেয়ে সাধারণ অন্তঃস্রাবী ব্যাধি, যেটি হলে দেখা দেয় বিভ্রান্তি বা চেতনা হারানো, নিম্ন রক্তচাপ বা হৃৎস্পন্দন, বিষণ্নতা বা উদ্বেগ, মারাত্মক বমি এবং ডায়রিয়া, তীব্র ক্লান্তি বা দুর্বলতা, চোখের শুষ্কতা, জ্বালা, চাপ বা ব্যথা এবং ঘুমের ঝামেলাসহ নানান সমস্যা। বর্তমানে বাংলাদেশও এমন একটি দেশ, যেখানে থাইরয়েড রোগের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি। এ অবস্থায় ‘থাইরয়েড রোগ, অসংক্রামক রোগ’ স্লোগান নিয়ে এ বছর পালিত হচ্ছে বিশ্ব থাইরয়েড দিবস। পাশাপাশি ২৫ থেকে ৩১ মে থাইরয়েড সচেতনতা সপ্তাহ পালনে থাকছে নানা আয়োজন।

বাংলাদেশ থাইরয়েড অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ড্রোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম খবরের কাগজকে বলেন, ধারণা অনুযায়ী দেশে জনসংখ্যার ২০ শতাংশ থাইরয়েডজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। তাদের চারভাগের তিন ভাগই কোনো ধরনের চিকিৎসা নিচ্ছেন না। অর্থাৎ প্রায় তিন কোটিই রয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসার বাইরে। যার ফলে তারা পরে ভুগছেন থাইরয়েডজনিত হাইপোথাইরয়েডিজম, থাইরয়েড অটোইমিউনিটি, হাইপারথাইরয়েডিজম, গলগণ্ড এবং আয়োডিনের অভাবজনিত ব্যাধি এবং থাইরয়েড ক্যানসারের মতো অসুখে।  

ডা. শাহজাদা সেলিম জানান, থাইরয়েড হরমোনের তারতম্যজনিত সমস্যা দুই রকম হতে পারে। শরীরে থাইরয়েড হরমোনের পরিমাণ কমে গেলে তাকে বলে হাইপোথাইরয়েডিজম ও বেড়ে গেলে হাইপারথাইরয়েডিজম। এ দুইয়ের মধ্যে হাইপোথাইরয়েডিজমের সমস্যা অনেক বেশি। আমাদের দেশে এটি আরও প্রকট। কম আইকিউসম্পন্ন মানুষ, বন্ধ্যত্ব ও স্থূলদেহি হওয়ার পেছনে হাইপোথাইরয়েডিজম অন্যতম কারণ। আবার হাইপোথাইরয়েড হলে অল্প খাবার খেয়েও মানুষের ওজন বেড়ে যাবে, শরীর দুর্বল লাগবে। এসব রোগীর কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দেয়, নারীদের ক্ষেত্রে অনিয়ন্ত্রিত মাসিকের সমস্যা হয়। অপরদিকে হাইপার থাইরয়েডের ক্ষেত্রে তার বিপরীত লক্ষণ দেখা যায়। ফলে এর চিকিৎসাও ভিন্ন হয়।   

অসংগতি নিয়ে আলো দেখছে ‘গলার কাঁটা’ বিআরটি-লাইন ৩

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২৪, ১১:৩১ এএম
অসংগতি নিয়ে আলো দেখছে ‘গলার কাঁটা’ বিআরটি-লাইন ৩
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ সাত বছরের জনদুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের আওতায় গাজীপুর-এয়ারপোর্ট করিডরে বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি লাইন-৩) উত্তর অংশের কাজ সম্পন্ন হতে চলেছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এটি পুরোপুরি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া সম্ভব বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। 

সাত বছরে ছয় দফা পিছিয়েছে বিআরটি প্রকল্পের কাজ। গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এই পথে ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার করিডর নির্মাণে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা। শুরু থেকেই প্রকল্পের কাজে গতি ছিল না। কয়েক দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়েও কাজ শেষ হয়নি। 

এরপর ২০২৪ সালের জুন ও পরে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের সর্বশেষ ব্যয় ধরা হয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। সাত বছরে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৮ কোটি ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। রাজধানীবাসীর জন্য একটি সুলভ ও নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ২০১১ সালে রিভাইজড স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান ২০১৬ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। ২০১১ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করে। পরে ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর একনেকের সভায় বিআরটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। 

২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের সময় নির্ধারণ করা হয়। গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট কাজ শুরু করে ২০১৭ সালে। শুরুতে প্রকল্পের দৈর্ঘ্য ছিল চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত। পরে সময়-ব্যয় দুটোই বাড়ানো হলেও প্রকল্পটি সংকুচিত করে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত করা হয়। প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)।

২০২২ সালের আগস্টে নির্মাণাধীন বিআরটি প্রকল্পের উত্তরা এলাকায় গার্ডার পড়ে প্রাইভেটকারের ৫ জন আরোহী নিহত হন। এ ঘটনায় চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্যাঝুবা গ্রুপ করপোরেশনের (সিজিজিসি) গাফিলতি খুঁজে পায় সড়ক বিভাগের তদন্ত কমিটি। পরে সেই বছরের অক্টোবরে এ প্রকল্প নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট প্রকল্প গলার কাঁটা হয়ে গেছে। গাজীপুরে রাস্তার যে অবস্থা, সেখানে এই প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত, সে ভাবনার ঘাটতি ছিল।’

চলতি মে মাস পর্যন্ত এই প্রকল্পের প্রায় ৯২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রকল্প পরিচালক ইলিয়াস শাহ বলেন, কাজ এখন পুরোদমে চলমান আছে। এখন বাসস্টেশন, গাজীপুর ও বিমানবন্দর অংশে উড়াল সড়কের কাজ চলছে। এই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই কাজ শেষ হবে।
 
গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের ব্যবস্থাপক-১ আব্দুর রহমান নাহিয়ান খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব মিলিয়ে ছয় দফায় পেছানো হয়েছে এই প্রকল্পের কাজ।’ কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে এয়ারপোর্ট অংশটি অত্যন্ত ব্যস্ততম সড়ক। এই সড়কে ইউটিলিটির কাজ করতে গিয়ে ডিপিডিসি, ওয়াসা, বিটিসিএলসহ নানা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা আমরা পাইনি। করোনাকালে বিআরটি-৩ প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হয়েছিল।’

সাত বছর পর এই প্রকল্প খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা অসংগতি থেকেই যাচ্ছে। প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে গেলে টঙ্গী, বোর্ডবাজার এলাকার বাসিন্দারা জনদুর্ভোগের নানা ফিরিস্তি তুলে ধরেন। তারা বলেন, ফুটপাত বন্ধ করে বিআরটি স্টেশনের স্থাপনা নির্মাণ, বিশেষ লেনের দুই পাশে বিভাজক না রাখায় চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের ৯টি ফ্লাইওভারের মধ্যে গত ঈদুল ফিতরের আগে ৭টি খুলে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে যানজট কিছুটা নিরসন হলেও ব্রিজের নিচের অংশে বেহাল দশা রয়েই গেছে। টঙ্গী বাজার, ফায়ার সার্ভিস গেট, টঙ্গী স্টেশন রোড, চেরাগ আলী, বোর্ড বাজার, বাইপাস ও চৌরাস্তা এলাকার বিআরটি ব্রিজের নিচে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজট লেগেই থাকছে। মহাসড়কের তিন লেনের রাস্তা কমে দুই লেনে দাঁড়িয়েছে। 

গাজীপুর মেট্রোপলিটনের ট্রাফিক পুলিশের উপকমিশনার আলমগীর হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়কে ক্রমেই যানবাহন বাড়ছে। বিআরটি স্টেশন এলাকাগুলোতে সড়ক কিছুটা চেপে যাওয়ায় যান চলাচলে ধীরগতি দেখা দিচ্ছে। এর মধ্যে মানুষ ফুটপাত ব্যবহার করতে না পারলে ব্যাপক যানজট দেখা দেবে।’

প্রকল্প কর্মকর্তা আবদুর রহমান নাহিয়ান বলেন, ‘বিআরটি-৩ পুরোদমে চালু হওয়ার পরে সিটি সার্ভিস ও আন্তজেলা বাস চলাচলের জন্য প্রশস্ত করিডর না-ও পেতে পারে। তখন যানজট পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এই সমস্যা সমাধানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর কাজ করছে।’

প্রকল্পে এলিভেটেড (উড়াল অংশ) থাকছে ৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার। স্টেশন ২৫টি। এর মধ্যে ঢাকায় ৪টি ও গাজীপুর মহানগরীতে পড়েছে ২১টি। তবে কোনো স্টেশনের নির্মাণ কাজ এখনো শেষ হয়নি। সড়ক পারাপারে প্রতিটি স্টেশনে পদচারী-সেতু নির্মাণের কথা থাকলেও মাত্র একটির কাজ শেষ হয়েছে। 

বিআরটির জন্য বিশেষ লেনের দুই পাশে নেই সড়ক বিভাজক। স্টেশনগুলো বিআরটি লেনের ওপর। উচ্চতা প্রায় ৬ মিটার। স্টেশনের দুই পাশের পিলার ফুটপাতের ওপর। স্টেশনে ওঠানামার জন্য চারটি চলন্ত ও পায়ে হাঁটার দুটি সিঁড়ি রাখা হয়েছে। সব কটি ফুটপাতের ওপর। এসব জায়গা পার হতে পথচারীদের মূল সড়কে নামতে হচ্ছে।

বিআরটি-৩ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে আবদুল্লাহপুরে তুরাগ নদে ১০-লেনবিশিষ্ট সেতু নির্মাণ করতে হবে আলাদাভাবে। সেই কাজটি ডিসেম্বরের আগেই শেষ করতে সেতু কর্তৃপক্ষকে চাপে রেখেছে গ্রেটার ঢাকা সাসটেইনেবল আরবান ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ কবে নাগাদ এই সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ করবে, এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে পারেননি বিআরটি কর্মকর্তারা। 
ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘প্রকল্প নিয়ে নানা সমস্যার কারণে মানুষের কাছে বিআরটি’র বিষয়টি ভুলভাবে যাচ্ছে। সারা বিশ্বেই বিআরটি যাত্রী পরিবহনে সুপরিচিত বিষয়। ডিসেম্বরে কাজ শেষ হলে আমরা প্রকল্প বুঝে পাব।’

প্রতি ঘণ্টায় ১০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে বিআরটি বাস

বিআরটি প্রকল্পের জন্য ইতোমধ্যে ১৩৭টি বাসের দরপত্র আহ্বানের কাজ চলছে। আগামী ১০ জুন দরপত্র আহ্বান করা হবে। প্রকল্প চালু হলে পর্যায়ক্রমে বাসগুলো চালানো হবে। ঢাকা বিআরটি কোম্পানি লি.-এর মহাব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন জানান, প্রতি ঘণ্টায় একমুখী যাতায়াতে ১০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে বাসগুলো। এ করিডর ব্যবহার করে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরে যেতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ৫০ মিনিট। গাজীপুর থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত বিস্তৃত করিডরে উভয়মুখী বিআরটি বাস চলাচলের জন্য রাস্তার মাঝখানের অংশে ২টি ডেডিকেটেড বিআরটি লেন থাকবে।

প্রকল্প কর্মকর্তারা বলছেন, বিআরটি-৩ লাইনের মাধ্যমে প্রতিদিন প্রায় চার লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। যাত্রীদের বিআরটি বাস ব্যবহার করতে হলে টিকিট কাউন্টার বা ভেন্ডিং মেশিন থেকে টিকিট কিনতে হবে। অনলাইনেও র‍্যাপিড পাস কেনার সুযোগ থাকছে।

উত্তরার সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে দিয়াবাড়ি থেকে হাউজ বিল্ডিং পর্যন্ত রাস্তার অংশে বিআরটি ফিডার সার্ভিসের মাধ্যমে বিআরটি মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। বাইপাসসহ আরও ৪টি র‍্যাম্প সংযুক্ত থাকবে।

মিক্সড ট্রাফিক লেনের যানবাহনের ইউটার্ন সুবিধা দিতে গাজীপুরা ও সাইনবোর্ডে ২টি ইউটার্ন ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। ময়মনসিংহমুখী যানবাহনসহ জয়দেবপুর চৌরাস্তায় যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে ২ লেভেলের ১টি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। আবদুল্লাহপুর ইন্টার সেকশনের বিভিন্নমুখী যানবাহন চলাচল সহজ ও নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে এলিভেটেড অংশের সঙ্গে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত পথচারীদের রাস্তা পারাপার নিরাপদ এবং নির্বিঘ্ন করতে এ প্রকল্পের আওতায় হাজি ক্যাম্প থেকে বিমানবন্দর টার্মিনাল পর্যন্ত ৬২০ মিটার দীর্ঘ একটি প্রশস্ত পথচারী-পারাপার আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে এবং বিআরটি ও এমআরটি লাইন-১ এর স্টেশনসহ মোট ৭টি প্রবেশপথ থাকবে। 

গাজীপুরে করিডরে বিআরটি প্রকল্পই মস্ত ভুল
অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান 
পুরকৌশল বিভাগ, বুয়েট 

যে করিডরে বিআরটি প্রকল্প করা হচ্ছে, এই করিডরে এই প্রকল্প নির্মাণ করাটা মস্তবড় ভুল। কারণ এটা বন্দি করিডর। এই করিডরের দুই পাশে অনেক শিল্প কারখানা আছে। জাতীয় মহাসড়কে আমরা আরবান ট্রান্সপোর্টকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে সংকুচিত করে ফেললাম। এখানে যদি কোনো ইকোনমিক করিডর হয় ভবিষ্যতে, যখন দুই পাশে অনেক ইন্ডাস্ট্রি হবে, তখন মহাসড়ক প্রশস্ত করতে চাইলে সওজ জায়গা পাবে কোথায়?

আমি বলব, প্রকল্প পরিকল্পনায় ত্রুটি আছে। এই পরিকল্পনা আরও সুদূরপ্রসারী হওয়া উচিত ছিল। একটা জাতীয় মহাসড়কের অর্ধেকের বেশি দেওয়া হচ্ছে ঢাকা-গাজীপুর যাতায়াতের জন্য। এখানে প্রাধান্য দেওয়া উচিত ছিল দূরপাল্লার যানবাহনের। তাই পরিকল্পনা ও নকশা দুটাতেই ত্রুটি আছে। এরপরও যদি এই প্রকল্পের প্রকৌশলগত দিক থেকে বিবেচনা করি, তাহলে দেখা যাবে ছোট ছোট অনেক ফ্লাইওভার করা হয়েছে। বাস ওঠালাম আর নামালাম, অনেকটা রোলার কোস্টারের মতো। 

চীনে যখন গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তখন তারা রাস্তা আলাদা করে ফেলে। সড়কের পাশে আলাদা করে কোনো ফ্লাইওভার নির্মাণ করে না। ইন্দোনেশিয়াতে যে বিআরটি করা হয়েছে, তা পুরোটাই এলিভেটেড। আমরা চাইলে পুরো বিআরটিকে এলিভেটেড করে দিতে পারতাম। এর চেয়ে ঢাকা-জয়দেবপুর আলাদা লাইন করে দুটো কমিউটার ট্রেন চালালে বেশি উপকার মিলত। রেলের সেই জায়গা আছে। তাহলে কয়েক গুণ বেশি যাত্রী পরিবহন করা যেত। 

এখানে ঠিকাদার নিয়েও প্রশ্ন আছে। অভিযোগ আছে, তাদের আর্থিক সামর্থ্য ছিল না। তারা অনেক কম টাকায় এই প্রকল্প নিয়েছে, যেটা সম্ভব না। প্রাক্কলিত ব্যয় থেকে যদি ঠিকাদার অনেক কম চায়, তাহলে সেটা যাচাই করে দেখতে হবে। আবার এটাও সঠিক যে এই করিডরে কাজ করা খুব চ্যালেঞ্জিং। এখানে ট্রাফিক বেশি। তাই যখন প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছিল, তখন সময়সীমা যৌক্তিক হওয়া উচিত। ফিজিবিলিটি স্টাডিতেও গলদ ছিল। বিআরটি বাস্তবতার মুখ দেখছে বিদেশি অর্থায়নে। নির্দিষ্ট হারে সুদ দিতে হবে। চাপে পড়তে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়।