যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ইছহাক আলীর অনিয়ম-দুর্নীতি, হয়রানিমূলক বদলি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছেন সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন কর্মসূচিতে সমিতির দপ্তরে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমনকি বহিরাগতদের দিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। এতে কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এসব ঘটনায় ম্যানেজারের বিরুদ্ধে অধিকাংশ কর্মকর্তা অনাস্থা এনেছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে ইছহাক আলীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়েছে। মামলাটি করেছেন জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার শাহানুর রহমান। এর আগে সন্ধ্যা থেকে অর্ধশত কর্মী কোতোয়ালি থানায় অবস্থান নিয়ে ইছহাক আলীকে আটকের দাবি জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মধ্যকার বৈষম্য দূরীকরণসহ গ্রামীণ জনপদে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে আন্দোলনে নামেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এই আন্দোলন দমাতে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার ইছহাক আলী ব্যক্তিস্বার্থে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ৩৮ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে বদলি করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। যশোর সদর দপ্তর থেকে বদলি করে অন্য স্থানে কর্মরতদের মোটা টাকার বিনিময়ে এখানে আনা হয়েছে। এ বদলি প্রত্যাহারের দাবিতে গত ৯ অক্টোবর শহরতলির তপস্বীডাঙ্গায় সমিতির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। তবে একটু পরে সমিতির ম্যানেজারের আশীর্বাদপুষ্ট বিভিন্ন ঠিকাদার আসেন সমিতিতে। তারা এসে আন্দোলনরতদের ওপর হামলা করেন। এই ঘটনায় পাঁচজন আহত হন। বৃহস্পতিবারও সমিতির সদর দপ্তরে দাবি নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি করতে গেলে ম্যানেজারের আশীর্বাদপুষ্ট বহিরাগতরা এসে আন্দোলনরতদের ওপর হামলা করেন। এ ঘটনায় জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার শাহানুর রহমান আহত হন। পরে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনরতরা কর্মবিরতি পালন করে কোতোয়ালি মডেল থানা ঘেরাও করে ম্যানেজারের বিচারের দাবি জানান। রাতে বিক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীরা ইছহাক আলীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
এদিকে দুই সপ্তাহ ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনে অস্থিরতা বিরাজ করছে সমিতিতে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎসেবা থেকে ভোগান্তিতে পড়ছেন সমিতির নিয়ন্ত্রণাধীন চার উপজেলার বাসিন্দারা।
সমিতির সদর দপ্তরের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার শাহানুর রহমান বলেন, ‘বিভিন্ন দাবি আদায়ের লক্ষ্যে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছিলাম। এতে ক্ষিপ্ত হন সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ইছহাক। তিনি ৭ অক্টোবর যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর আওতাধীন কর্মকর্তা, লাইনম্যানসহ ৩৮ জন এমআরসিএমকে হয়রানিমূলক বদলি করেন। এরপর নাটক সাজান ম্যানেজার। দাবি মানা হবে আশ্বাস দিয়ে বিকেলে তার রুমে ডেকে নিয়ে যান আমাকে। এর আগে থেকে ওই রুমে বহিরাগত কয়েকজন সন্ত্রাসীদের রেখে দেন ম্যানেজার। রুমে ডেকে নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দেন। এ সময় আগে থেকে ওই রুমে থাকা সন্ত্রাসীরা আমাকে মারধর করে হত্যার হুমকি দেন। এমনকি তারাই অফিস ভাঙচুর করে চলে যান। পরে সহকর্মীরা আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সমিতিতে রীতি হলো একটি স্টেশনে কমপক্ষে দুই বছর চাকরি করতে হবে। কিন্তু এই ম্যানেজার তিন মাসের মধ্যে সদর দপ্তর থেকে অন্যত্র বদলি করে দিচ্ছেন। এই বদলির পেছনে অর্থের লেনদেন আছে। ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থের বিনিময়ে সদর দপ্তর থেকে অন্যত্র বদলি করছেন। দুই বছরে আমাকে চারবার বদলি করা হয়েছে। এমনকি নারী সহকর্মীদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অফিসের সব শ্রেণির স্টাফদের সঙ্গে বাবা-মা তুলে গালিগালাজ করেন ম্যানেজার ইছহাক আলী। তার বেঁধে দেওয়া নিয়মে অফিস করতে হয়।’
আরেক কর্মকর্তা বলেন, গত ২০ সেপ্টেম্বর সমিতিতে বিভিন্ন পদে ৮৮ জনের নিয়োগ পরীক্ষা হয়েছিল। সেই পরীক্ষায় ঝিকরগাছার ডেপুটি ব্যবস্থাপক মেজবাহ উদ্দিনকে সদস্যসচিব ও এজিএম (প্রশাসন) আব্দুর রউফকে দিয়ে নিয়োগ বোর্ড গঠন করা হয়। কিন্তু পরীক্ষার দিন এই দুজনকে বোর্ডে না রেখে নিয়োগ সম্পন্ন করেছেন সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার ইছহাক আলী। ৫ থেকে ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রথম ধাপের ৩৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাকিদের নিয়োগের কাজ চলছে।
সূত্র আরও জানায়, পরীক্ষার আগে ওই ৩৩ জনকে উত্তরপত্র দেওয়া হয়েছিল। যার ফটোকপি ম্যানেজারের টয়লেট কক্ষে দেখতে পান সমিতির অন্য কর্মকর্তারা। সমিতির মিটার রিডার কাম মেসেঞ্জার আবু তালেব জানান, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর ম্যানেজারের এখানে দায়িত্বের দেড় বছরও হয়নি। এর মধ্যে তিনি অসাধু, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও বহিরাগত ঠিকাদারদের নিয়ে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন। তাদের নিয়েই গ্রাহকদের হয়রানি, ভূতুড়ে বিল ও অবৈধ জরিমানা করে যাচ্ছেন। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই তাদের বদলি করা হচ্ছে।