শেরপুর জেলাজুড়ে তার কথার বাইরে যাওয়ার সাহস ছিল না কারও। দলীয় নেতা-কর্মীদের পদ-পদবি দেওয়া, সামাজিক সংগঠনের নেতা-কর্মী নির্ধারণ, সচেতন নাগরিক কমিটি গঠন সব জায়গায়ই ছিল তার আধিপত্য। এ ছাড়া সরকারি দপ্তরের ঠিকাদারি, জমি দখল এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন কে পাবেন, কে পাবেন না সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। মূল কথা, তার ইশারা ছাড়া শেরপুরে কোনো কাজ করা ছিল অসম্ভব। শুধু তিনি নন, তার মেয়ে ও স্ত্রীকে খুশি করতে পারলেও অসম্ভব কাজ সম্ভব করা যেত। বলছি শেরপুর-১ (সদর) আসনে আওয়ামীদলীয় পাঁচবারের এমপি এবং দুই মেয়াদের হুইপ বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আতিউর রহমান আতিকের কথা। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিলেন শেরপুরবাসী। গত ১৬ বছরে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস না পেলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এখন ধীরে ধীরে সরব হচ্ছেন এলাকার মানুষ। বের হচ্ছে নানা অন্যায় ও অনিয়মের তথ্য।
জানা গেছে, আতিউর রহমান আতিক ছিলেন শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। জেলা ও উপজেলার রাজনীতিতে ছিল তার একক আধিপত্য। আর এই আধিপত্য ধরে রাখতে স্ত্রী, মেয়ে, ভাই, ভাতিজা এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের দলীয় পদ দেওয়া ও সরকারি চাকরি দেওয়ার পাশাপাশি বানিয়েছেন জনপ্রতিনিধিও। প্রভাব খাটিয়ে নিজের ছোট ভাইকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বানান তিনি। আর বড় মেয়ে শারমিন রহমান অমিকে পরিবার পরিকল্পনা অফিসের কর্মকর্তা পদে চাকরির ব্যবস্থা করেন। অমি সরকারি চাকরির পাশাপাশি বাবার হয়ে টেন্ডার সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীক-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অমির সঙ্গে কেউ কোনো কাজে দেখা করতে গেলে খুশি করতে হতো মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে। আর ভাতিজা আশিককে দিয়ে করেছেন নিয়োগ-বাণিজ্য ও জমি দখল। সদর উপজেলা পরিষদের পরবর্তী নির্বাচনে প্রার্থী করতে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচিতে মেয়ে অমিকে সঙ্গে রাখতেন আতিক।
প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনেও এমপি আতিউর রহমান ছিলেন এগিয়ে। নিজের নামে ছাড়াও স্ত্রী-সন্তানদের নামে বাড়ি-গাড়ি, শেরপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় জমি, ফ্ল্যাট ক্রয়, মার্কেট তৈরি, বাগানবাড়িসহ শত শত কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন তিনি। এর মধ্যে শেরপুর সদরের মাধবপুর এলাকায় ২৪ শতাংশের একটি পুকুর কিনে তা ভরাট করে সাততলা আলিশান বাড়ি নির্মাণ করেছেন আতিউর রহমান। এর প্রতিটি ফ্লোর ১২ হাজার বর্গফুটের। বাড়িটির আনুমানিক মূল্য ২০ কোটি টাকা। এর পাশেই তার আরেকটি তিনতলা ভবন রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া শেরপুর শহরের তিনআনি বাজারে বিলাসবহুল বাড়ি, গ্রামে ৩০ একর জমিতে বাগানবাড়ি, বনশ্রীসহ রাজধানীর দুটি আবাসিক এলাকায় পাঁচটি প্লট, রাজউকের প্লট এবং উত্তরা, ধানমন্ডি ও গুলশানে তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। সরকারি খাসজমি দলীয় নামে বরাদ্দ নিয়ে তা নিজের কাজে ব্যবহার করছেন। শেরপুরে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে তিনি সোনালী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, আয়কর অফিসসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তার ভবনে ফ্লোর ভাড়া নিতে বাধ্য করেছেন। সদর উপজেলার দুরুঙ্গি বিলে ৬০ একর ফসলি জমি এবং তেঁতুলিয়া এলাকায় ৫ একর জমি রয়েছে তার। ঢাকার লালমাটিয়ায় একটি দামি ফ্ল্যাট এবং নিকুঞ্জ ও আরেকটি আবাসিক এলাকায় আছে দুটি ফ্ল্যাট। শুধু তা-ই নয়, ব্রহ্মপুত্র সেতুসংলগ্ন গরুর হাট ও কাঁচাবাজার থেকে খাস কালেকশনের নামে প্রতিবছর সরকারি রাজস্ব খাতের ৬০ লাখ টাকা ও জেলা খাদ্যগুদাম থেকে সরকারি চাল ক্রয় এবং এসএমও নিয়োগের মাধ্যমে বছরে সমপরিমাণ টাকা নিয়েছেন সাবেক এই এমপি। এ ছাড়া শেরপুর সদরের তারাকান্দি বাজারের পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে নিচু জমি ক্রয় এবং তা ভরাট করে সমাজসেবা অফিসের কাছে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিক্রির প্রস্তাব করিয়েছিলেন আতিক। জেলার পল্লী বিদ্যুৎ অফিস, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, যুব উন্নয়ন অফিস, মৎস্য ভবন, পিটিআই অফিস, পাসপোর্ট অফিস ভবনের জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, জেলার জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, গণপূর্ত, সড়ক ও জনপথ, এলজিইডি ও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন আতিকসহ তার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। প্রতিটি দপ্তরের কাজ কে পাবে, আর কে পাবে না, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করতেন। পরিবারের ইশারায় চলত এসব সরকারি দপ্তর।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় আতিক বাড়ি/দোকান/অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া দেখিয়েছেন ২০ লাখ ৯২ হাজার ৬৯৭ টাকা। চাকরি থেকে সম্মানী ভাতা ১১ লাখ ৪ হাজার টাকা। নগদ দেখিয়েছেন ৩ কোটি ২৬ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫২ টাকা। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা দেখিয়েছেন ৪৮ লাখ টাকা। গাড়ি বাবদ দেখানো হয়েছে ৭৮ লাখ ৩৪ হাজার ৪০ টাকা। স্বর্ণ ও অন্যান্য ধাতু দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার। ইলেকট্রনিক সামগ্রী ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আসবাবপত্র ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার। জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২০৬৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ, আর জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ৮১ লাখ ২ হাজার ৯০০ টাকা। অকৃষি ৩৫ শতাংশ জমির ওপর ছয়তলা বাড়ি দেখানো হয়েছে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৪১ হাজার ৭৪৫ টাকার। টিনশেড আধা পাকা ঘর দেখানো হয়েছে ২ লাখ টাকার। আবার রাজউকের প্লটের কিস্তি বাবদ দেখানো হয়েছে ২২ লাখ ৯১ হাজার ৫০০ টাকা, যার মোট টাকার পরিমাণ ১০ কোটি ৬৫ লাখ ৭৩৪ টাকা।
আবার ওই নির্বাচনের হলফনামায় স্ত্রীর নামে দেখানো হয়েছে ৪৫ শতাংশ কৃষিজমি, যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৮৯ হাজার ৬০০ টাকা। অকৃষি ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৫২ লাখ ৫৫ হাজার ৪০০ টাকা। আর স্ত্রীর নামে স্বর্ণালংকার উপহারে প্রাপ্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে ১০০ ভরি। স্ত্রীর মোট সম্পদ ৫৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
তবে হলফনামার সঙ্গে বাস্তবে কোনো মিল নেই। অনুসন্ধানে বেরিয়েছে নানা দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ। এর মধ্যে নিজের নামে রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান- আতিউর রহমান মডেল কলেজ, আতিউর রহমান মডেল গার্লস স্কুল, আতিউর রহমান উচ্চবিদ্যালয়, আতিউর রহমান আলিম মাদ্রাসা, আতিউর রহমান হোমিওপ্যাথিক কলেজ ও হাসপাতাল এবং আতিকনগর প্রভৃতি। পাশাপাশি নিজের, স্ত্রী ও মেয়েদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর এবং স্ত্রী-কন্যার শতভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে।
এদিকে শুধু জমি কেনার কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সাবেক এমপি আতিক নিজের ক্ষমতা এবং কর্মকর্তাদের বদলির ভয় দেখিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ও ভূমি অফিসকে দিয়ে শেরপুর সদরের বিভিন্ন এলাকায় ১৯৯৭ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত সময়ে কেনা, আমমোক্তারনামার মাধ্যমে গ্রহণ ও হেবাসহ বিভিন্ন ধরনের অন্তত ২১টি দলিল সম্পাদিত করেছেন। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে এসব জমি তিনি কিনেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেসব সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক প্রায় শতকোটি টাকা।
অন্যদিকে ২০১৩ সালে শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও আলহাজ্ আব্দুস সাত্তার হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত করেন ডা. রেজুয়ানুর রহমান বকুল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি সাবেক এমপি আতিক দখল করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগী রেজুয়ানুর রহমান বকুল বলেন, ‘হুইপ আতিক ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আমাকে জামায়াত ঘরনার ট্যাগ দিয়ে হুমকি দেন। তখন প্রাণভয়ে আমি শেরপুর ছেড়ে দীর্ঘদিন জেলার বাইরে অবস্থান করি। আর সেই সুযোগে ওই কলেজেরই অসাধু কিছু শিক্ষকের যোগসাজশে আতিউর রহমান শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড আলহাজ আব্দুস সাত্তার হাসপাতালটি বন্ধ করে দেন। পরে তার নিজ এলাকা ভাতশালায় হোমিও কলেজের আগের নাম পরিবর্তন করে আতিউর রহমান হোমিওপ্যাথিক কলেজ নামে আরেকটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। আর নিজের নামে প্রতিষ্ঠা করা কলেজে শিক্ষক নিয়োগের নামে আতিক প্রায় ৩ কোটি টাকা বাণিজ্য করেন।
তবে আতিউর রহমান হোমিওপ্যাথিক কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম বলেন, শেরপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও আব্দুস সাত্তার হাসপাতালের জমি ও এফডিয়ারের টাকা নিয়ে নয়ছয় করায় তার কলেজের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হয়।
সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, সাবেক এমপি আতিকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। দুই দফায় দুদকের জালে পড়লেও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে তদবির করিয়ে দুদক থেকে ক্লিন সার্টিফিকেট নিয়েছিলেন আতিক। ২০১৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সাবেক এমপি আতিকের বিরুদ্ধে একটি মামলা করলেও অদৃশ্য কারণে তা খুব বেশি এগোয়নি। পরের বছরেরই জুলাইয়ে তাকে অব্যাহতি দেয় দুদক।
শেরপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হযরত আলী বলেন, ‘বিগত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক হুইপ আতিক ও তার দোসররা মিলে আমার বিরুদ্ধে ঢাকা ও শেরপুরে ৭৫টি মামলা করিয়েছে। আমার মিল, ফ্যাক্টরি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়েছে। আমার মেয়েকে চাকরিচ্যুত করেছে। আমার নির্বাচনি এলাকার জনগণের পাশে, নিজ বাড়িতে, দলীয় কার্যালয়ে, রাজনৈতিক কোনো অনুষ্ঠানে, এমনকি ঈদেও নিজ এলাকায় আসতে দেওয়া হয়নি। পুলিশের হয়রানি ও গ্রেপ্তার আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দলীয় কার্যক্রম চালাতে হয়েছে আমাকে।’
উল্লেখ্য, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে শেরপুরে ছাত্র হত্যার ঘটনায় মামলার আসামি হওয়ায় সপরিবারে আত্মগোপনে চলে যান সাবেক হুইপ আতিক। যে কারণে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।