চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় পুলিশের দুর্বলতায় ক্রমশ বাড়ছে অপরাধ। মহাসড়ক ও বাসাবাড়িতে অস্ত্রের মুখে ডাকাতি, চাঁদাবাজি, গুলি করে ও কুপিয়ে হত্যা, হামলাসহ জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখলের ঘটনা দিন-দুপুরে ঘটছে। শুধু তাই নয়, পুলিশের ওপর হামলা করে আসামি ছিনতাই, পুলিশকে মেরে রক্তাক্ত করা, ফাঁড়ি দখল করে চিহ্নিত সন্ত্রাসীর অফিস স্থাপনের মতো ঘটনাও ঘটছে। অথচ এসব ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, অতি সামান্যই।
পুলিশের আসামি ধরে আইনের আওতায় আনার কথা থাকলেও উল্টো পুলিশই হেনস্তার শিকার হচ্ছে। আবার কিছু পুলিশ সদস্যও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ নাগরিকরা। কেউ কেউ বলছেন, এরকম চলতে থাকলে পুলিশের মনোবল বাড়ার পরিবর্তে আরও কমবে। এখনই নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ।
জানা গেছে, জেলার উপজেলাগুলোর মহাসড়কে ডাকাতি আর গরুর খামার লুটের সংখ্যা বেড়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে খুনের ঘটনাও ঘটছে। শহরে পুলিশের সঙ্গে বাগবিতণ্ডা থেকে হচ্ছে হাতাহাতি।
গত ১৪ জানুয়ারির ঘটনা। নগরের কাপ্তাই রাস্তার চেকপোস্টে একটি সিএনজি অটোরিকশা তল্লাশি করার সময় পুলিশের ৫ সদস্যকে তাদের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করা হয়। এই ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে তারা গ্রেপ্তার করে। এদের একজন পটিয়ার বাসিন্দা প্রবাসী মোরশেদ খান। অন্যজন মোহাম্মদ করিম। অভিযোগ উঠেছে ওই ঘটনায় পুলিশের কয়েকজন সদস্য সিএনজি অটোরিকশায় থাকা প্রবাসীকে কীভাবে এনআইডি কার্ড পেয়েছেন- এরকম অবান্তর-অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করেছেন। পুলিশ পাল্টা ওই প্রবাসীর হামলার শিকার হওয়ার কথা বললেও ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতেও তিনি যে পুলিশকে মারধর করেছেন, এমনটা দেখা যায়নি। কেবল উত্তেজিত অবস্থায় দেখা গেছে ওই প্রবাসীকে। সেই ভিডিওতে প্রবাসী মোরশেদ খানকে উত্তেজিত কণ্ঠে বলতে শোনা যায়, ‘ট্যাক্স দিয়ে চলি আমরা, যারা চুরি করে, দুর্নীতি করে, তাদের আগে ধরুন। সাধারণ মানুষকে হয়রানি না করে।’ অপরজনকে ‘কীভাবে পাসপোর্ট বানিয়েছেন, কীভাবে এনআইডি পেলেন, কীভাবে বিদেশে গেলেন’, এভাবে জেরা করতে শোনা যায়। বিষয়টি যে হয়রানিমূলক ছিল, ভিডিও দেখেই বোঝা গেছে।
এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে চাঁন্দগাও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাবউদ্দিন এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাদের মারধর করা হয়েছে বলে দাবি করেন। অস্বীকার করেন তাদের বিরুদ্ধে যাত্রী হয়রানির অভিযোগ। গত ২১ নভেম্বর দুপুরে নগরের আকবরশাহ এলাকায় পুলিশের ওপর হামলা করে সীতাকুণ্ড থানার একটি বিস্ফোরক মামলার আসামি রায়হান উদ্দিনকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনায় ১ পুলিশ সদস্য আহত হন।
আরেকটি ঘটনা। গত বছরের ৫ আগস্টের পর নগরের আকবরশাহ থানার নাছিয়াঘোনায় পুলিশ ফাঁড়ি দখল করে অফিস খুলে বসেন সন্ত্রাসী নুরুল আলম নুরু। পরে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে পুলিশ সেটি উদ্ধার করলেও নুরুকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এসব ছাড়াও পুলিশের দুর্বল ভূমিকার কারণে ডাকাতি, আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে খুনের ঘটনা বাড়ছে। গত ১৪ জানুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের মিরসরাই বাণিজ্য মেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুন্না নামের এক যুবদল কর্মী খুন হন।
তার আগে ২ জানুয়ারি রাত আটটার দিকে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে মীর আরমান হোসেন (৪৮) নামে এক শ্রমিক দল নেতাকে পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটে।
এর আগে গত বছরের ২৯ আগস্ট নগরের অক্সিজেন কুয়াইশ এলাকায় আওয়ামী লীগের দুই নেতা খুন হন। গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চান্দগাঁওয়ে টার্ফ দখলকে কেন্দ্র করে জুবায়ের উদ্দিন বাবু নামে এক যুবদল কর্মী খুন হন। ১১ অক্টোবর বায়েজিদ বোস্তামী থানার শান্তিনগরে কুপিয়ে ও পিটিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক কর্মী ইমনকে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
একই বছরের ২১ অক্টোবর চান্দগাঁও থানার শমসের পাড়া এলাকায় আফতাব উদ্দিন তাহসীন নামে এক ছাত্রলীগ নেতাকে দিন-দুপুরে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এসব ঘটনায় উল্লেখযোগ্য কেউ গ্রেপ্তার হয়নি।
শুধু তাই নয়, গত ১৪ জানুয়ারি রাতে জেলার হাটহাজারীর ফতেয়াবাদে অস্ত্র দিয়ে জিম্মি করে গরু লুট করে ডাকাতরা। এর আগে পটিয়ায় এক খামার থেকে ১৯টি গরু ও নগরের পতেঙ্গা, পাঁচলাইশ, বোয়ালখালী, ফটিকছড়িতে বড় ধরনের গরু ডাকাতির ঘটনা ঘটে। সীতাকুণ্ডে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিনই ডাকাতের কবলে পড়ছেন চালক ও যাত্রীরা। এতে অনেকেই সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ঘটনা পুলিশ পরিচয়ে ঘটলেও অপরাধ দমনে পুলিশকে তৎপর দেখা যায়নি। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। থানায় অভিযোগ দিলেও ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখায় পুলিশ। পুলিশ আগে-ভাগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির অপেক্ষায় থাকে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে।
অনৈতিক কাজে জড়াচ্ছে পুলিশ
গত ১৭ জানুয়ারি রাতে নগরের চকবাজার থেকে আলমগীর হোসেন নামে পুলিশের একজন এএসআই ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার কাছে ১৬০ গ্রাম আইস পাওয়া গেছে।
এর আগে ৫ ডিসেম্বর নগরের বাকলিয়ার কল্পলোক আবাসিক এলাকার একটি বাসায় ডাকাতির সময় ৬ ডাকাতকে ধরে ফেলেন স্থানীয়রা। এর মধ্যে ফারুক নামে পুলিশের একজন এএসআই ছিলেন।
৩০ ডিসেম্বর শামীম ভূঁইয়া নামে পুলিশের বরখাস্তকৃত এক কনস্টেবল পুলিশ সদস্যের পরিচয় দিয়ে প্রতারণা করে দেড় লাখ টাকা ‘নগদ’-এ লেনদেন করার সময় গ্রেপ্তার হন।
এসব ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মো. রইছ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত হবে। চেকপোস্টের ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অগ্রহণযোগ্য। ৫ আগস্টের পর পুলিশ চ্যালেঞ্জ নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে। যারা পটপরিবর্তনের পর থেকে পুলিশের সঙ্গে এমন লাঞ্ছনার, হেনস্থার ও অনভিপ্রেত আচরণ করছেন তারা মোটেও ভালো করছেন না। এতে পুলিশের মনোবল ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুলিশি সেবাও ব্যাহত হতে পারে। সাধারণ মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। অন্যথায় কারোরই মঙ্গল বয়ে আনবে না।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা একেবারে তলানিতে পৌঁছেছে। ৫ তারিখের পর পুলিশের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। তাছাড়া বাহিনীটির ওপর জনগণের অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ ও বাইরের শৃঙ্খলার অভাবে পুলিশের মনোবল একেবারে শূন্যের কোঠায়। পুলিশের অভ্যন্তরে বদলি, বাধ্যতামূলক অবসর এবং ওএসডির মতো ঘটনা ঘটে চলেছে। খবর বেরিয়েছে পুলিশের কাছ থেকে পুলিশ ঘুষ গ্রহণ করছে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থেকেও অনেকের বিরুদ্ধে মামলার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এই ব্যাপারগুলো পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও রীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশব্যাপী রাজনৈতিক সহিংসতার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে হামলার ঘটনা ঘটছে। সম্মিলিতভাবে দেশের প্রতিটি নাগরিক পুলিশের প্রতি সহযোগিতার হাত না বাড়ালে এ থেকে উত্তরণ ঘটা সম্ভব নয়।’