আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পেয়ে আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছিলেন সাবেক হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। পদ পেয়ে নিজ জেলা জয়পুরহাট নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। বিনা ভোটে জয়পুরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সমানতালে করেছেন লুটপাট, দখলদারি, চাঁদাবাজি, নিয়োগ ও পদ-বাণিজ্য। করেছেন অর্থ পাচারও। বিদেশে রয়েছে বাড়ি। জেলায় নিজের অনুসারীদের দিয়ে তৈরি করেন নিজস্ব বাহিনী। তার কথায় চললে মিলত দলীয় পদ, হতেন জনপ্রতিনিধি। আর বিরোধিতা করলে বা অবাধ্য হলে খেতেন মামলা, দলীয় নেতা হলেও খাটতে হতো জেল।
জয়পুরহাট-২ আসনের এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের নানা অপকর্ম। স্বপন অত্যন্ত চতুর রাজনীতিক ছিলেন। কমিটি-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন অবৈধ আয়ের টাকা তিনি সরাসরি হাতে নিতেন না। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ডলারে নিতেন। তার সমসাময়িক রাজনীতিকরা খবরের কাগজকে জানান, এভাবেই ডলার কালেকশন এবং পরে তা পাচার করে সেন্ট্রাল লন্ডনে বাড়ি করেছেন তিনি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর এখন স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ওই বাড়িতেই থাকছেন।
জানা গেছে, সরকার পতনের পর আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের রাজত্বে ধস নামে এবং তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এরপর পালিয়ে ভারত হয়ে লন্ডনে পাড়ি দেন স্বপন। সেখানেই তার স্ত্রী ও সন্তান বসবাস করেন। দেশের অর্থ পাচার করে সাবেক হুইপ স্বপন লন্ডনে সম্পদ গড়েছেন। সেন্ট্রাল লন্ডনে তার রয়েছে রাজকীয় ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাড়িটির ছাদ টালি দিয়ে নির্মাণ করা। সামনে রয়েছে একাধিক গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। তার সন্তান ও স্ত্রীর জন্য দামি গাড়িও রয়েছে লন্ডনে। বিলাসবহুল বাড়িটির পেছনে রয়েছে বিনোদনের সব ব্যবস্থা। ওই এলাকায় প্রতিটি বাড়ির মূল্য গড়ে (বাংলাদেশি টাকায়) ২১ কোটি থেকে ৫০ কোটি। লন্ডনে স্বপনের রয়েছে নানা ব্যবসা। স্বামী ও স্ত্রী দুজনই ব্রিটিশ পাসপোর্টধারী। তা গোপন করেই হয়েছেন আওয়ামী লীগের তিনবারের এমপি ও সংসদের হুইপ।
সরকারদলীয় নেতা হওয়ায় একাধিক কোম্পানির পরিচালক বা পরিচালক পরিষদে রয়েছেন তিনি। দলীয় প্রভাবে বিভিন্ন কোম্পানির নামে একাধিক সরকারি ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৯০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারিসহ একাধিক অভিযোগের অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দেশেও নামে-বেনামে অঢেল সম্পত্তি গড়েছেন স্বপন। রাজধানীর বনানী কবরস্থানের পাশে তার রয়েছে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, মহাখালী ডিওএইচএসে ফ্ল্যাট, বসুন্ধরায় পাঁচ কাঠার ওপরে বিলাসবহুল বাড়ির কাজ চলমান রয়েছে। নিজের জেলা জয়পুরহাট সদরে, পাঁচবিবি, ক্ষেতলাল ও কালাই উপজেলায় তার একাধিক বাড়ি রয়েছে।
স্বপনের সমসাময়িক সাবেক ছাত্রনেতা ও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সর্বশেষ চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্ব পান আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। ঠাণ্ডা মাথার চতুর এ নেতা স্বপনকে পদ-বাণিজ্যের বিষয়ে তেমন বিতর্কিত হতে দেখা যায়নি। কারণ তিনি কোনো নেতার কাছ থেকে সরাসরি টাকা নিতেন না। স্বপন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ডলার নিতেন বলে জানিয়েছেন ওই বিভাগের কয়েকজন নেতা।
তারা জানিয়েছেন, চতুর নেতা স্বপন যাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া যেত না তাদের থেকে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন। এর মধ্যে নোয়াখালীর একরাম চৌধুরী, ফেনীর নিজাম হাজারী, লক্ষ্মীপুরের নুর উদ্দিন চৌধুরী নয়ন, আনোয়ার হোসেন খান, চট্টগ্রামের পটিয়ার সামসুল হক চৌধুরী, কক্সবাজারের আবদুর রহমান বদি, কুমিল্লার মুরাদনগরের জাহাঙ্গীর আলম সরকার, সাবেক রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক মুজিব, কুমিল্লার বরুড়ার শফি উদ্দিন শামীম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগরের বাদল, চট্টগ্রামের ড. আলী রেজা নদভী, সীতাকুণ্ডের দিদারুল আলম দিদার, চট্টগ্রাম নগরীর মহি উদ্দিন বাচ্চু, আব্দুস সালাম, সিডিএ সালামসহ অসংখ্য নেতার কাছ থেকে আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০০৮ সালে জয়পুরহাট-২ আসনে স্বপন নৌকার মনোনয়নে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেন। সে সময় আওয়ামী লীগের জয়জয়কার হলেও লজ্জাজনক কম ভোটে বিএনপির প্রার্থী গোলাম মোস্তফার কাছে পরাজিত হন তিনি। তবে স্বপনের ভাগ্যের চাকা খোলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রয়াত অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিনের হাত ধরে। তার তদবিরে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পদ পান তিনি। ওই তদবিরে ২০১৪ সালের নির্বাচনে ফের আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবার সংসদ সদস্য হন। এর মধ্যে নিজের আখের গোছাতে থাকেন স্বপন। লবিং করে ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় সংসদের হুইপ হন। সর্বশেষ ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে স্বপন স্বপ্ন দেখেন মন্ত্রীর চেয়ারে বসার। এ লক্ষ্যে সব ধরনের লবিং-তদবিরও করেন। মন্ত্রিত্বের ডাকের জন্য অপেক্ষাও করেন। তবে শেষ পর্যন্ত ডাক না পেলেও প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় দ্বিতীয়বারের মতো হুইপ হন স্বপন।
জয়পুরহাটে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে স্বপনের বিলাসী চলাফেরা শুরু হয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। এর আগে তার সহযোগী ছাত্রনেতা ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে ধারদেনা করে চলতেন তিনি। ২০১৪ সালে এমপি হওয়ার পর তার হাতে টাকা কামানোর মেশিন চলে আসে। একই সঙ্গে এলাকায় তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। তার স্ত্রীর বিলাসী জীবন দেখে স্বপনের সহযোদ্ধারা রীতিমতো অবাক হয়েছেন।
২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত নির্বাচনি হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপনের সম্পদ ও অর্থ বেড়েই চলছিল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তখন ব্যবসা ও মাছ চাষ করে বছরে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আয় করতেন স্বপন। ১৬ বছরে বিপুল আকারে তার আয় ও ব্যবসা বেড়েছে। একই সঙ্গে তার স্ত্রীও শূন্য থেকে কোটিপতি হয়েছেন।
২০২৪ সালে স্বপনের বার্ষিক আয় লাখ থেকে কোটি টাকার ঘরে পৌঁছায়। আয় বাড়ে তার স্ত্রীরও। দশম সংসদ নির্বাচনের হলফনামা অনুযায়ী, স্বপনের বার্ষিক আয় ছিল ব্যবসা থেকে ৩৪ লাখ ৭৫ হাজার ৫২০ টাকা। একই খাত থেকে তার ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় ছিল ১১ লাখ টাকা। ২০২৪ সালের স্বপনের ব্যবসা ও হুইপ হিসেবে পাওয়া বেতন-ভাতা থেকে বার্ষিক আয় ছিল ১ কোটি ১৪ লাখ ৬০ হাজার ৩৫২ টাকা। ব্যবসায় তার নির্ভরশীলদের আয় ছিল ২৪ লাখ টাকা। এই হিসাবে স্বপনের আয় বেড়ে তিন গুণের বেশি হয়। তার স্ত্রীসহ নির্ভরশীলদের আয় দ্বিগুণের বেশি বাড়ে।
দুই হলফনামা থেকে দেখা গেছে, ১০ বছর আগে শেয়ারসহ নানা খাতে স্বপনের বিনিয়োগ ছিল ৬ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। স্ত্রী ও স্বপনের ওপর নির্ভরশীলদের এই খাতে কোনো বিনিয়োগ ছিল না। এখন শেয়ারবাজারে তার নিজের ৯৯ লাখ ৫২ হাজার ৯০০ টাকা, স্ত্রীর ৪৩ লাখ ২৯ হাজার ১০০ টাকা এবং নির্ভরশীলদের নামে ৫ লাখ ১১ হাজার ৩০০ টাকা বিনিয়োগ আছে। সেই হিসাবে তার পরিবারের বিনিয়োগ বেড়েছে ২২ গুণের বেশি।
বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বপনের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংকে জমার পরিমাণ ২২ গুণের বেশি বেড়েছে। দশম নির্বাচনের হলফনামায় উল্লেখ ছিল, ব্যাংকে স্বপনের ৩২ হাজার ৫৬৪ টাকা ও তার স্ত্রীর ২৩ হাজার ৯৬ টাকা মিলিয়ে মোট জমা ৫৫ হাজার ৬৬০ টাকা। এবারের হলফনামা অনুযায়ী ব্যাংকে হুইপ পরিবারের মোট জমা আছে ১২ লাখ ২৬ হাজার ১৭ টাকা।
আগে স্বপনের গাড়ি না থাকলেও ২০২৪-এ এসে দেখা গেছে, তার ৬৮ লাখ ৯৬ হাজার ৪৪৬ টাকা মূল্যের একটি এসইউভি গাড়ি আছে। ১০ বছরে স্বপন ও তার স্ত্রীর স্বর্ণের পরিমাণ ৭০ ভরি থেকে বেড়ে ৯০ ভরি হয়েছে।
সর্বশেষ হলফনামায়- অস্থাবর সম্পদের পাশাপাশি স্বপনের পরিবারের স্থাবর সম্পদ বেড়েছে। নিজের নামে কৃষিজমি না বাড়লেও ১০ বছরে তার স্ত্রীর নামে ৩ লাখ টাকা মূল্যের ৩০ শতাংশ এবং নির্ভরশীলদের নামে ১ কোটি ২৬ লাখ ৭০ হাজার টাকার ৩৭৪ শতাংশ জমি হয়েছে। ১০ বছর আগে স্বপনের সাড়ে ১৭ হাজার টাকা মূল্যের সাড়ে ৫ শতাংশ জমি ছিল। ১০ বছরের ব্যবধানে এই জমির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৩১ টাকা মূল্যের সাড়ে ৭৪ শতাংশ জমি এবং পূর্বাচলের ২১ লাখ টাকা মূল্যের সাড়ে সাত কাঠার প্লট। তার স্ত্রীর নামে ৭৪ শতাংশ জমি রয়েছে; তিনি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় পাঁচ কাঠা জমি কেনার জন্য ৭৫ লাখ টাকা বায়না দিয়েছেন। তার নির্ভরশীলদের নামে জয়পুরহাটে দেড় কোটি টাকার বেশি মূল্যের জমি আছে।
সংসদ সদস্য হওয়ার আগে তার কোনো ব্যাংকঋণ না থাকলেও ২০২৪ সালে বিভিন্ন কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা পরিচালক হওয়ার সুবাদে আবু সাঈদ আল মাহমুদের ৭৬৪ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা নর্দান পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের নামে ৪৭২ কোটি টাকা ও ঢাকা সাউদার্ন পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেড নামে ২৯২ কোটি টাকা ঋণ নেন তিনি।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আত্মগোপন করেন স্বপন। নিজের ঘনিষ্ঠ লোক ছাড়া কারও সঙ্গে যোগাযোগ করছেন না তিনি।