ঢাকা ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
রামিসা হত্যাকাণ্ড: আদালতে আনা হলো আসামি সোহেল-স্বপ্নাকে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে আজ থেকে সোনারগাঁয় ফয়জুলের মৃত্যুর ঘটনায় বিচার দাবিতে মানববন্ধন সক্ষমতা বাড়াতে সুপরিকল্পিত বাজেটের তাগিদ টেকনাফ দিয়ে মাছ ধরা নৌকায় মানবপাচার প্রাকৃতিকভাবেই এইচআইভি দমনে সক্ষম দুই নারীর গল্প ঝিনাইদহে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে গ্রাম্য চিকিৎসক আটক নিশ্চিহ্নের পথে শেরেবাংলার জন্মভিটা শিশু রামিসা হত্যা মামলার রায় আজ আম পাড়া নিয়ে ব্যস্ত মৌসুমি শ্রমিকরা মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্জিন ঋণ বিধিমালা বাতিলের দাবি খুলনায় ধারাবাহিক খুন-চাঁদাবাজিতে উদ্বেগ, কাজে আসছে না বিশেষ অভিযানও নারায়ণগঞ্জে এনসিপির অনুষ্ঠানের চেয়ার টেবিল ভাঙচুর, আহত ১০ জয়পুরহাটে দিনমজুরকে পিটিয়ে হত্যা গ্রাহকের ব্যানারে আন্দোলনে ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বিষয় ও কর্মদিবস কমানোর পরিকল্পনা ক্যানসার চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা পুঁজিবাজারে লেনদেন বেড়েছে ৪৫ শতাংশ সাভারে তিন কারখানা থেকে ১৮৬৮ শ্রমিক অব্যাহতি এখনো উৎপাদনে আসেনি বন্ধ চিনিকল ৭ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল সিরাজগঞ্জে ৪০০ একর জমির ওপর শিল্প পার্ক ৭ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ‘বরফ চিবিয়ে’ দিন পার, হামাগুড়ি দিয়ে বেস ক্যাম্পে ফেরা, বেঁচে ফেরা পর্বতারোহীর রোমহর্ষক বর্ণনা বন্ধ কারখানা চালু হলে গতি ফিরবে অর্থনীতিতে ময়মনসিংহে বাড়তি ভাড়া আদায়ে যাত্রীদের ভোগান্তি দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সমাবেশ যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে ৭ জুন  ২০২৬ তারিখের নামাজের সময়সূচি বাজেট অধিবেশন বসছে আজ
Nagad desktop

বাণিজ্য উপদেষ্টার আশ্বাসের পরও তেল আছে-নেই অবস্থা

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৫, ০৬:৩০ এএম
বাণিজ্য উপদেষ্টার আশ্বাসের পরও তেল আছে-নেই অবস্থা
ছবি: সংগৃহীত

সয়াবিন তেলের সরবরাহ আগামী দুই দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হবে বলে গত সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার পরিদর্শন শেষে ঘোষণা দিয়েছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই বাজারের অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতা জানান, এখনো তেল আছে, তেল নেই অবস্থা। চাহিদা মতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কাটেনি সংকট। কারওয়ান বাজারসহ অন্যান্য বাজারেও একই অবস্থা দেখা গেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে মুরগির দাম কেজিতে কমেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ টাকা ও সোনালি মুরগি ২৭০ টাকায় নেমেছে। তবে আগের মতোই চড়া দামে বেগুন, শসা, লেবু বিক্রি হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বাজার থেকে সয়াবিন তেল হাওয়া হয়ে গেলে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বাণিজ্য উপদেষ্টা প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৮ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ওই দিন বলেছিলেন, বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে তেলের ঘাটতি রয়েছে, এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ভোক্তারাও অস্বস্তিতে রয়েছেন। সে জন্য আমরা তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছি। নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করি বাজারে আর তেলের ঘাটতি হবে না।

কিন্তু তারপর থেকেই সয়াবিন তেল নিয়ে চলছে লুকোচুরি খেলা। অধিকাংশ দোকানে ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ভোক্তা অধিদপ্তর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোজ্যতেল রিফাইনারি মিলমালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ে সভা করে। ওই দিন ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘রমজান উপলক্ষে প্রচুর ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারির পর কোনো সংকট হবে না। কিন্তু তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ১৭ দিন পরও বাজারে তেলের সংকট কাটেনি। বাধ্য হয়ে গত সোমবার বাজার মনিটরিং করেন বাণিজ্য উপদেস্টা। ওই দিন বলেছিলেন দুই দিন পর তেলের বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।  কিন্তু বৃহস্পতিবার বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো কোনো দোকানে ১ ও ২ দুই লিটারের বোতলজাত তেল থাকলেও ৫ লিটারের তেল নেই। আবার কারও কাছে সিটি গ্রুপের তীর ব্র্যান্ডের থাকলেও অন্য কোম্পানির তেল নেই। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাণিজ্য উপদেষ্টা যা ই বলুক, কোম্পানি থেকে দিচ্ছে না তেল। এ জন্য নেই। তাদের ধরতে হবে।

টাউন হল বাজারের মুন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আবরার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। মিল থেকে দিচ্ছে না। খোলা তেল পাওয়া গেলেও দাম বেশি। তাদের ধরতে হবে। মিলে অভিযান চালাতে হবে। তাহলেই বাজার স্বাভাবিক হবে। তারা সিন্ডিকেট করেই তেলের বাজারে সংকট রাখছে। এ সময় রাজু আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, তেল নিয়ে চলছে চোর-পুলিশ খেলা। মিলে না ধরে বাজারে লোক দেখানো অভিযান চালানো হচ্ছে।’

একই বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের মো. বাবুল মিয়া ও শাহজালাল স্টোরের লোকমান হোসেন বলেন, ‘বাণিজ্য উপদেষ্টা আমাদের দোকানের সামনে দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, তেলের সমস্যা হবে না। কিন্তু মিল থেকে তো চাহিদামতো তেল পাচ্ছি না। সকালে পেলে বিকেলে শেষ হয়ে যায়। বিকেলে পেলে রাতেই শেষ।’ কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল বাজার, সেগুনবাগিচা বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র।

কারওয়ান বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের শাহ আলম বলেন, ‘তীর ব্র্যান্ডের ৫ লিটারের তেল আছে। তবে ১ ও ২ লিটারের নেই।’ বিভিন্ন পাড়া-মহাল্লাতেও তেল মেলে না। মোহাম্মদপুরের ফিউচার হাউজিংয়ের মায়ের দোয়া স্টোরের মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বেশকিছু দিন ধরে তেল পাচ্ছি না। খোলা তেল পাওয়া গেলেও দাম বেশি। তাই রাখি না।’

ব্রয়লার ১৮০, সোনালি ২৭০ টাকা

মুরগি বিক্রেতারা বলছেন, রমজানে চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু সরবরাহ আগের মতোই আছে। তাই দাম কমছে মুরগির। গত সপ্তাহে ব্রয়লার ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি, সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা বিক্রি হলেও গতকাল কারওয়ান বাজার, টাউন হল বাজারসহ অন্য বাজারেও দেখা গেছে কেজিতে ৬০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। টাউন হল বাজারের ব্রয়লার হাউজের স্বত্বাধিকারী মো. বিল্লাল হোসেনসহ অন্য বিক্রেতারা বলেন, ‘রমজানে হোটেল বন্ধ। চাহিদা কমে গেছে। এ জন্য দাম কমছে। ব্রয়লার ১৮০, সোনালি ২৭০ টাকা কেজি, দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা।’

তবে আগের মতোই ডিমের ডজন ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, রুই, কাতলা আকারভেদে ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি, পাবদা ৪০০ থেকে ৫০০, তেলাপিয়া, পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০, ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

সেঞ্চুরির উপরেই বেগুন শসা লেবু 

রমজান উপলক্ষে বেড়ে গেছে বেগুন, শসা, লেবুর দাম। পাঁচ রমজান চলে গেলেও কমেনি এসব পণ্যের দাম। অসাধু ব্যবসায়ীরা মিলেমিশে বাড়িয়েছেন দাম। গতকালও বিভিন্ন বাজারে লম্বা বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে সবুজ বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। লেবুর হালি ৬০ থেকে ৮০ টাকা। বড়টা ১০০ থেকে ১২০ টাকা। হাইব্রিড শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা ও দেশি জাতের শসা ১০০ থেকে ১২০ টাকা। তবে আগের মতোই কাঁচা মরিচের কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা, আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, দেশি আদা ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা, আমদানি করা আদা ২২০, দেশি রসুন ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, আমদানি করা রসুন ২৪০ টাকা কেজি বিক্রি করতে দেখা গেছে।

কমেনি খেজুরের দাম

প্রচুর আমদানি হলেও রমজানে খেজুরের দাম বেড়ে গেছে। কারওয়ান বাজারের বিক্রমপুর ফল বিতানের শরিফুল ইসলামসহ অন্য বাজারের ফল বিক্রেতারা বলেন, ‘রমজান শুরুর আগেই সব খেজুরের দাম বেড়েছে। গতকালও মেডজুল খেজুর ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি, জাহিদি ২০০ থেকে ২৪০ টাকা, মরিয়ম ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০, তিউনিসিয়ার খেজুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। মাল্টার কেজি ৩০০ টাকা, আপেল ৩২০ থেকে ৩৫০, তরমুজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।’

বিক্রি কমলেও কমেনি চালের দাম

রমজানে চালের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে। তারপরও দাম কমেনি। আগের মতোই চড়া দামে মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, আটাশ ৬৫ টাকা ও মোটা চাল ৫৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। বেগুন, শসা, লেবুতে উত্তাপ ছড়ালেও একটু স্বস্তির বার্তা দিয়েছে চিনি, ছোলা ও ডাল। পঞ্চম রমজানেও ছোলা, চিনি, খেসারি ও বুটের ডালের দাম বাড়েনি। বিভিন্ন বাজারে খুচরা বিক্রেতারা বলেন, আগের মতোই ছোলা ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। ছোলার ডাল ১৩০ টাকা থেকে কমে ১২০ টাকা কেজি, বেসন, খেসারির ডাল ১১০, চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সক্ষমতা বাড়াতে সুপরিকল্পিত বাজেটের তাগিদ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:২৯ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ এএম
সক্ষমতা বাড়াতে সুপরিকল্পিত বাজেটের তাগিদ
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের অধিকাংশ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পেশাগত দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ক্রমবর্ধমান সেই উন্নয়নের গতিতে এগিয়ে চলেছে। যদিও চব্বিশের অভ্যুত্থানকেন্দ্রিক সহিংস ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবকাঠামোগত যে বিপর্যয় ঘটেছে, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে মারাত্মক বেগ পেতে হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। 

তবু যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার স্বার্থে বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট খাতের আরও আধুনিকায়ন জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য তারা আগামী জাতীয় বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা ও উন্নয়নে সময়োপযোগী ও সুপরিকল্পিতভাবে অর্থ বরাদ্দেরও তাগিদ দিচ্ছেন। 

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুটি বিভাগের (জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা) জন্য ৩১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এই দুটি বিভাগের জন্য উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যার মধ্যে জননিরাপত্তায় ১ হাজার ২২৪ কোটি টাকা ও সুরক্ষা সেবায় ১ হাজার ৩৩৬ কোটি টাকা। যদিও ওই দুটি বিভাগ পরে একীভূত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয়ে আসছে। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জননিরাপত্তা ও সুরক্ষা সেবা বিভাগের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ছিল ৩১ হাজার ১২ কোটি টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে দাঁড়িয়েছিল ২৯ হাজার ৩৩১ কোটি টাকায়।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহাম্মদ নুরুল হুদা গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে আইনশৃঙ্খলা খাতের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও বাস্তবতায় আমাদের দেশের রাজস্ব কম, সম্পদের স্বল্পতা রয়েছে–তার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো উচিত। কারণ জনগণের জানমালের বা সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেই সঙ্গে চাহিদা বৃদ্ধির বিষয়টিও ক্রমবর্ধমান। সব মিলিয়ে আগামী বাজেটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সরকার বিশেষ নজর দেবে–এমনটাই প্রত্যাশা করি।’

গত ৩০ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ অধিবেশনে এক বক্তব্যে পুলিশের জন্য তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে কিছু আলোচনা তুলে ধরেন। এতে বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা এবং সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি সংসদে উপস্থাপন করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

আইনশৃঙ্খলা খাতের সংশ্লিষ্টরা বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা খাতের সবচেয়ে বড় অংশীজন হচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ, যারা দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখাসহ সামাজিক শৃঙ্খলা-নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালন করে থাকে। প্রায় সোয়া দুই লাখ সদস্যের বাংলাদেশ পুলিশের দায়িত্ব পালন এবং অবকাঠামোগত বিষয়ে এখনো মারাত্মক সংকট রয়ে গেছে। বিশেষ করে পুলিশের কনস্টেবল থেকে শুরু করে উপ-পরিদর্শক (এসআই) পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধা, যানবাহন, বাসস্থান, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সুবিধাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এর বাইরে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি, র‌্যাব, আনসার ভিডিপি, কোস্টগার্ড ছাড়াও কারাগার, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ এই খাতের সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা খাত একটি রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ খাতের আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণসহ কাজের ধারাগুলো চলমান বা গতিশীল প্রক্রিয়া। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য সব সময় সময়োপযোগী আর্থিক বাজেট হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি কোন কোন বিষয়ে কেমন অর্থ লাগবে, সেটিও সুনির্দিষ্টকরণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা উচিত। যেহেতু আধুনিক দেশগুলো নানা প্রযুক্তি-সরঞ্জামের মাধ্যমে এই ধরনের বাহিনীগুলোকে এগিয়ে নিচ্ছে, সে ক্ষেত্রে আমাদেরও উচিত সে রকম বাস্তবসম্মত বাজেট প্রণয়ন করা।’

যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
যত আক্রোশ মুক্তিযুদ্ধে
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম স্মারক, ঐতিহাসিক স্বাধীনতা জাদুঘর এখন এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। যে ভূগর্ভস্থ জাদুঘরে একসময়ে ৭ মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধের ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের রেপ্লিকা, ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা যুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাস সাজানো ছিল–সেই জাদুঘর এখন পোড়া গন্ধ, ভাঙা কাচ আর অন্ধকারে ডুবে থাকা এক নীরব ধ্বংসাবশেষ। জাদুঘরটির পোড়া দেয়াল আর ভাঙা কাচের নিচে চাপা পড়ে আছে একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, গর্ব, আভিজাত্য-অহংকার।

  • ৪৭ মাস ধরে তালাবদ্ধ স্বাধীনতা জাদুঘর, সংস্কারে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা
  • এই জাদুঘরটি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থানের নিচেই ধ্বংসস্তূপ; ৬৭ একর জায়গায় প্রকল্পটিতে রাষ্ট্রের ব্যয় ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা 
  • রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতি ৫-১০ কোটি টাকা, পূর্ণাঙ্গ সংস্কারে সম্ভাব্য ব্যয় ২০ কোটি টাকারও বেশি
  • ‘জুলাই আন্দোলনকে সমর্থন করেছি, কিন্তু ইতিহাসের ওপর এ ধরনের ধ্বংস মেনে নিতে পারিনি। মনে হয়েছে হামলাকারীদের যত রাগ মুক্তিযুদ্ধের ওপর’: দর্শনার্থী

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নজিরবিহীন হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এই জাদুঘরের কোনো ছবি, ভাস্কর্য কিংবা নিদর্শন অক্ষত নেই বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অথচ ঘটনার ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি সংস্কারের দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই, একটিমাত্র মামলার অগ্রগতিও থমকে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বরাদ্দ ও সিদ্ধান্ত ছাড়া জাদুঘরটি পুনরায় সংস্কার ও চালু করা সম্ভব নয়। ফলে বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস ধারণ করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনার ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে–এই স্মৃতিস্মারক রক্ষায় বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সিদ্ধান্তের ওপর।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের যে স্থানটিতে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ১৬ ডিসেম্বর যেখানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল, ঠিক সেই ইতিহাসের কেন্দ্রস্থলেই নির্মিত হয়েছিল স্বাধীনতা জাদুঘর।

২০১৫ সালের ২৫ মার্চ উদ্বোধন হওয়া এই জাদুঘর ছিল দেশের প্রথম ভূগর্ভস্থ জাদুঘর। প্রায় ৬৭ একর এলাকাজুড়ে নির্মিত পুরো প্রকল্পের ব্যয় ছিল প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা। জাদুঘরটিকে অনেকেই বলতেন বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস জানার ‘ওয়ান স্টপ সেন্টার’। কারণ এখানে মুঘল আমল থেকে ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ৭ মার্চের ভাষণ, গণহত্যা, শরণার্থী জীবন, সেক্টর কমান্ডারদের যুদ্ধ, আত্মসমর্পণ–সবকিছুর ধারাবাহিক উপস্থাপন করা ছিল।

এই জাদুঘরে ছিল ‘স্বাধীনতা স্তম্ভ’, ‘শিখা চিরন্তন’, জলাধার, ম্যুরাল, মিলনায়তন এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনী গ্যালারি। এসব গ্যালারিতে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের প্রায় ২৬ হাজার ঘটনার আলোকচিত্র প্রদর্শিত ছিল। এর মধ্যে ১৪৪টি কাচের প্যানেলে ছিল তিন শতাধিক ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। আরও ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিদেশি সংবাদপত্রের কাটিং, পোস্টার, টেরাকোটা ম্যুরাল, যুদ্ধের নিদর্শন এবং আত্মসমর্পণের টেবিলের প্রতিকৃতি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই গ্যালারিগুলো অন্ধকারাচ্ছন্ন, জাদুঘরটির পরতে পরতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ৫ আগস্টের ধ্বংসযজ্ঞের ভাঙা পোড়া স্মৃতিচিহ্ন।

৫ আগস্ট ২০২৪: হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ

জাদুঘর কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের দিন বিকেলে স্বাধীনতা জাদুঘরে সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পিত হামলা চালানো হয়। গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালানো হয়। 

এ বিষয়ে স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক মো. গোলাম কাউছার খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখানকার গ্যালারিগুলোতে থাকা কোনো নিদর্শনই অক্ষত নেই। প্রদর্শিত আলোকচিত্রগুলোর ডিসপ্লে, টিভি মনিটর, সাউন্ড সিস্টেম, চেয়ার, ফ্যান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, এমনকি পানির পাম্প, বিদ্যুতের তার পর্যন্ত খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাদুঘরের ভেতর একটি নিদর্শনও আগের জায়গায় নেই। জাদুঘরটির বাইরে থাকা প্রাচীরে স্থাপিত ঐতিহাসিক ভাস্কর্যগুলোও ভেঙে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া ভাঙচুর করা অনেক জিনিসে ভেতর ও বাইরে আগুনে দেওয়া হয়। 

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় গিয়ে কথা হয় সেই দিনের ঘটনার সাক্ষী পিডব্লিউডির এক কার্য সহকারীর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘হামলাকারীরা শুধু ভাঙচুরই করেনি, বরং জাদুঘরের ভেতরে থাকা বিভিন্ন সামগ্রী টেনে বের করে এনে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। সেই আগুন জাদুঘরের বিভিন্ন অংশে টানা দুদিন পর্যন্ত জ্বলেছে। তিনি আরও জানান, হামলার সময় তাকে মারধরের চেষ্টাও করা হয়। পরে নিজেকে স্থানীয় লোক পরিচয় দেওয়ার পর রক্ষা পান। সেই সময়ের ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেছেন।

যত আক্রোশ যেন মুক্তিযুদ্ধের ওপর

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ধ্বংসস্তূপের নীরব সাক্ষী মুক্তিযোদ্ধা মনসুর ঘরামি (৭৫)। একাত্তরে ৯ নম্বর সেক্টরের হেমায়েত বাহিনীর এই যোদ্ধার সার্টিফিকেট নেই। তিনি উদ্যান এলাকায় ভাঙারি কুড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাদুঘরের বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ থেইকা মুক্তিযুদ্ধের ছবি, যা কিছু আছিল সব লুট কইরা নিয়া গেছে। সেই দিনের পর থাইকা এটা বন্ধ। আর খোলে নাই।’ কথা বলতে বলতে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করছি দেশ বাঁচাইতে, টাকার জন্য না। এই রকম বাংলাদেশ তো চাই নাই।’

তার মতো অনেকেই মনে করছেন, হামলাটি শুধু একটি স্থাপনার ওপর ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ইতিহাস ও প্রতীকগুলোর ওপর আঘাত। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মৌটুসী ইসলাম বলেন, ‘এই জাদুঘরে আমি একবার গিয়েছি। এ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের সার্বিক চিত্র এর ভেতরে সাজানো ছিল; যা আমাদের জন্য লেসন। অথচ বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর সারা দেশে যে আঘাত ২৪-এ আমরা ঘটতে দেখেছি সেটা অপ্রত্যাশিত। জুলাইকে আমিও সমর্থন করেছি। কিন্তু এ ধরনের ধ্বংস মেনে নিতে পারিনি। আমি আশা করি, বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার স্বাধীনতা জাদুঘরসহ ধ্বংসের শিকার জাদুঘরগুলো সংস্কার করে আবার চালু করার উদ্যোগ নেবে।’

স্বাধীনতা জাদুঘর এলাকায় দীর্ঘদিন যাতায়াতকারী বেসরকারি চাকরিজীবী মোবাশ্বের আলম (৫৬) বলেন, ‘বিগত দিনে কত আন্দোলন-সংগ্রাম দেখেছি। সরকার বদল হতেও দেখেছি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে এ দেশের জন্মের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর যে ধরনের আঘাত ও ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে; সে ধরনের ঘটনা আগে আমরা দেখিনি। মনে হয়েছে হামলাকারীদের যত রাগ মুক্তিযুদ্ধের ওপর! এ ধরনের সন্ত্রাসী সব কর্মকাণ্ড দমনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ মনে করছি। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন, অনেক রক্তের বিনিময়ে জয় করা এ দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যের ওপর আর কোনো আঘাত যেন না আসে।’

সংস্কার ও মামলার অগ্রগতি নেই

স্বাধীনতা জাদুঘরের পরিচালক গোলাম কাউছার বলেন, ‘এটি কোনো ব্যক্তির জাদুঘর নয়, এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জাদুঘর। তাই নতুন করে গবেষণা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে আবার দাঁড় করাতে হবে। ফলে এটি শুধু সংস্কারের বিষয় নয়; পুরো উপস্থাপনাই নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ আগের ডিসপ্লেগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নতুন করে আলোকচিত্র, দলিল, কিউরেশন এবং প্রদর্শনী পরিকল্পনা করতে হবে।’ তিনি জানান, এতে সময় ও বড় অঙ্কের অর্থ লাগবে। সরাসরি ক্ষতির পরিমাণ ৫ থেকে ১০ কোটি টাকা হলেও পূর্ণাঙ্গ পুনর্নির্মাণে ২০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।

মামলা প্রসঙ্গে গোলাম কাউছার জানান, স্বাধীনতা জাদুঘরের চারটি মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্ত্রও লুট হয়ে যায়। পরে লুট হওয়া অস্ত্র ও ভাঙচুরের ঘটনায় শাহবাগ থানায় মামলা করা হয়। বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধারের খবর পাওয়া গেলেও সেগুলোর সঙ্গে জাদুঘরের অস্ত্রের মিল পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। এদিকে সংশ্লিষ্ট থানায় খোঁজ নিয়ে মামলার কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার পর একটি মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উল্লেখযোগ্য তদন্ত অগ্রগতি, চার্জশিট বা গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ হয়নি। এ নিয়ে সমালোচনা রয়েছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন– বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসবাহী একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় এমন হামলার পরও কেন তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই? 

৪৭ মাসেও নেই সংস্কারের উদ্যোগ

ঘটনার পর ৪৭ মাস পেরিয়ে গেলেও জাদুঘরটি এখনো বন্ধ। ভেতরে নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। পোড়া দেয়াল, ভাঙা কাচ, ক্ষতিগ্রস্ত ম্যুরাল, গ্যালারিগুলোসহ জাদুঘরের গোটা এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন। 

জাদুঘরটি নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাদুঘরের ভেতরে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সব ভাঙা হয়েছে। তবে ১৯৭১-কে বাদ দিয়ে আমরা কিছুই করতে পারব না। খুবই যত্ন করে নতুন আঙ্গিকে স্বাধীনতা জাদুঘর আবার তুলে ধরা হবে। নতুনভাবে ডিসপ্লে, কিউরেশন এবং দর্শনার্থীদের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরে বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কারকাজ শুরু করা সম্ভব হতে পারে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাদুঘরটি সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। পিডব্লিউডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি।

স্বাধীনতা জাদুঘরের বর্তমান ভগ্নদশা শুধু একটি রাষ্ট্রীয় স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের স্মৃতি সংরক্ষণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার রক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে–দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার দায় কি এড়াতে পারে রাষ্ট্র? এ প্রসঙ্গে লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন বলেছেন, ‘ইতিহাস কখনো মুছে ফেলা যায় না। পরবর্তী প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস খুঁজে বের করবেই। কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রাষ্ট্রের একটি মীমাংসিত সত্য। সেটিতে কারও হাত দেওয়া উচিত নয়।’

রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৮:৩০ এএম
রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে
এভাবেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন যাত্রীরা। ছবি: খবরের কাগজ

গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল সকাল থেকে। তা উপেক্ষা করেই শহরতলির উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন রাজধানীর হাতিরপুল এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা কাউসার। কারওয়ান বাজার মোড়ে ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পরে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশে বাসের দেখা পান। কিন্তু সেই বাসে ওঠার জো নেই, বাদুরঝোলা হয়ে গন্তব্যে ছুটছেন অনেক যাত্রী। সাভারের রেডিও কলোনি যেতে ফাতেমাকে আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়।

এই চিত্র গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টার। ফাতেমার মতো আরও অনেক যাত্রীকে গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিশেষ করে সাভার-নবীনগর, উত্তরা, টঙ্গী-কামারপাড়া, গাজীপুরসহ শহরতলির বিভিন্ন এলাকায় যেতে যাত্রীদের বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

রাজধানীর কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, প্রগতি সরণি, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, মিরপুর রোড, বিমানবন্দর সড়ক ঘুরে খবরের কাগজের প্রতিনিধিরা দুর্ভোগের চিত্র দেখেছেন।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ থাকায় রাজধানীবাসীর ‘বড় অংশ’ রয়ে গেছে ঢাকার বাইরে। ৭ জুন থেকে সেই প্রতিষ্ঠানগুলো খুলবে। তাই আজ শনিবার রাজধানীমুখী যাত্রীদের ঢল দেখা যাবে। তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে সিটি বাসগুলোও বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।

খবরের কাগজের একজন প্রতিবেদক বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলামোটর থেকে সাভারগামী ওয়েলকাম পরিবহনের বাসে উঠেন। সেই বাসে পা ফেলার জায়গাও ছিল না। পথে যেতে যেতে কথা হয় ষাটোর্ধ্ব একজন যাত্রীর সঙ্গে।

তিনি জানান, নোয়াখালীর সোনাপুর থেকে বেলা সাড়ে ৯টার দিকে তিনি গুলিস্তান এসে পৌঁছান। সাভারগামী বাসের জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। আরেকজন নারী যাত্রী বলেন, ‘জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে অনেকটা জোর করে বাসে উঠেছি। বাসে সিট ছিল না বলে নারী যাত্রীদের উঠাতে চাইছিল না হেল্পার।’

ওই বাসে আসন না পেয়ে নারী যাত্রী দাঁড়িয়েই যাচ্ছিলেন হেমায়েতপুরে। বাসটির হেল্পার মিল্টন বলেন, ‘ঈদের পরে অনেক যাত্রীই তো রইয়া গেছে বাড়ি। তারা তো ফিরে নাই। আজকের (শুক্রবার) রাতের পরে তারা সবাই ফিরতে শুরু করবে। তাদের আনতে টাউন সার্ভিসের বাসগুলো বিভিন্ন গন্তব্যে গেছে।’

রাজশাহীর আলোকচিত্রী রায়হান বিশ্বাস গতকাল ঢাকায় এসেছেন জরুরি কাজে। তিনি জানান, সিরাজগঞ্জের এলেঙ্গার মোড়ে তিনি ঢাকার সিটি সার্ভিসের বেশ কয়েকটি মিনিবাসে ঢাকামুখী যাত্রী দেখেছেন। ঠাকুরগাঁও থেকে রাজধানীতে ফেরার পথে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে ঢাকার ‘টাউন সার্ভিস’ বাস দেখার কথা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাসেল রহমান। পথে-পথে সেসব বাস বিকল হয়ে থাকার কথাও জানান তিনি।

তাদের কথার সত্যতা পাওয়া যায় শুক্রবার বেলা ২টার দিকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কেও টাউন সার্ভিসগুলো গেটলক হয়ে রাজধানীর দিকে ফিরছিল। সাভার পরিবহন, সেলফি, মিরপুর লিঙ্ক, রাজধানী, নীলাচল নামের বেসরকারি বাসগুলো তো বটেই;  এমনকি শহরতলি রুটে চলাচল করা বিআরটিসির এসি বাসও দূরপাল্লায় যাত্রী পরিবহন করছে।

এসব বাসে ঢাকায় ফিরতে যাত্রীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। ঈদের ফিরতি যাত্রার দ্বিতীয় পর্বে এসব অনিয়ম দেখার জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) বা হাইওয়ে পুলিশের কোনো অভিযান নজরে পড়েনি বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এবং ঢাকা যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির (আরটিসি) সদস্য সচিব শহিদুল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বার্তা পেয়েও সাড়া দেননি হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি দেলোয়ার হোসেন মিঞা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদের ছুটিতে এখনো যারা বাড়ি রয়ে গেছেন, তাদের ঢাকায় ফিরিয়ে আনতে দূরপাল্লার বাস পর্যাপ্ত নয়। তাই ঢাকার ভেতরে চলাচল করা অনেক বাস সুযোগ বুঝে দূরপাল্লার রুটে গেছে।

আরটিসির নিয়ম অনুযায়ী এসব বাস দূরপাল্লার রুটে চলাচলের অনুমতি পায় না। কিন্তু প্রশাসনের চোখে ধুলা দিয়ে অনেক মালিক বাস দূরের জেলায় পাঠিয়েছেন। এখন স্থানীয় প্রশাসনও নীরব। কারণ, বাসগুলো তো যাত্রী পরিষেবা দিচ্ছে। আমরাও সমিতিতে আলোচনা করেছি, এসব বাস দূরপাল্লার রুটের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়।’

রাজধানীর ভেতরে বা শহরতলিতে চলাচল করা অধিকাংশ বাসের ফিটনেস নেই, চালকদেরও ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, ঈদযাত্রা বা ফিরতি যাত্রায় ঢাকার এসব টাউন বাসই দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণ।

পরিবহন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক আসিফ রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘যদিও দুই চালকেরই ভারী যান পরিচালনার লাইসেন্স থাকে, কিন্তু ইন্টারসিটি চালক হুট করে মহাসড়কে নেমে এলে সেই সড়কের চরিত্র বুঝতে পারবেন না। দুই ধরনের সড়কের চরিত্র ভিন্ন। হুট করে চালকের যানবাহনের ধরন (ট্রান্সপোর্ট মুড) পরিবর্তন হলে বিপদের সমূহ শঙ্কা থাকে।’

প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:৪১ পিএম
প্রান্তিক ধাপের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাতিলের সুবিধা পাবেন না বস্তিবাসী
আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিইআরসি

সরকার গত বুধবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন দাম নির্ধারণের এক দিনের মাথায় বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আবাসিকের প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শূন্য থেকে ৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী (লাইফলাইন) প্রান্তিক গ্রাহক এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারী প্রথম ধাপের আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম আগের হারেই থাকছে। এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে বিইআরসি।

তবে বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিম্ন আয়ের বা বসতিতে বসবাস করা গ্রাহকরাও এই সুবিধা পাবেন না। কারণ তারা পরিবার নিয়ে কমপক্ষে দুটি ঘরে বসবাস করেন। অন্ধকার এড়াতে ও একটু স্বস্তি পেতে দুটি ফ্যান, দুটি লাইট, একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ ব্যবহার করেন। এতে মাসে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুতের ব্যবহার হয়, যা কমপক্ষে ১৯২ ইউনিটে গিয়ে দাঁড়াবে। এই পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

ডিপিডিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মানুষ অনেক বিলাসী হয়ে গেছেন। কাজেই যে মানুষটি বসতিতে থাকেন বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করেন তিনিও দুটি রুম নিয়ে থাকেন। পরিবারের একটু স্বস্তির জন্য দুটি ফ্যান ব্যবহার করেন। ফ্রিজ ব্যবহার করেন। অধিকাংশ পরিবার সারা দিন টিভি দেখে। কাজেই পুরো মাসে এসব পরিবারে ৩০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার হতেই পারে। এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিল আসবে। এ জন্য তাকে প্রতি মাসে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করতে হবে।’

বিইআরসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা বহাল থাকবে। জুন থেকে এ হার কার্যকর হবে। এর আগে গত বুধবার বিইআরসি খুচরা বিদ্যুতের যে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছিল, সেখানে প্রান্তিক গ্রাহকদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। সে হিসাবে প্রান্তিক গ্রাহকদের ইউনিটপ্রতি ৬৯ পয়সা এবং প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ৯২ পয়সা বেশি গুনতে হতো।

বিইআরসি জানায়, বুধবার জারি করা আদেশে নির্ধারিত এ দুই শ্রেণির মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য ৪ জুন বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো আবেদন করে। পরে শুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন, ২০০৩-এর ধারা ২২(খ) ও ৩৪ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ (খুচরা) ট্যারিফ প্রবিধানমালার বিধান অনুযায়ী বর্ধিত মূল্যহার কার্যকর না করে আগের মূল্যহার বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহারের ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর আয় কমবে। সেই ঘাটতি সরকারকে অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সমন্বয় করতে হবে। তবে বুধবার জারি করা খুচরা বিদ্যুতের নতুন দাম-সংক্রান্ত আদেশের অন্য সব অংশ অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানিয়েছে বিইআরসি। এর ফলে ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট, ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট, ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট, ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট এবং ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারী আবাসিক গ্রাহকদের জন্য ঘোষিত নতুন মূল্যহার বহাল থাকছে। শিল্প, বাণিজ্যিক, সেচ ও অন্যান্য গ্রাহক শ্রেণির ক্ষেত্রেও নতুন দামে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলোর প্রস্তাবের ওপর গত ২০ ও ২১ মে গণশুনানি করে বিইআরসি। পরে বুধবার বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুনর্নির্ধারণ করা হয়। সেখানে বেশি ইউনিট ব্যবহারকারীদের মতো আবাসিক গ্রাহকদের সব স্তরেই দাম বাড়ানো হয়েছিল। তবে প্রান্তিক ও প্রথম ধাপের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নিয়ে আলোচনা শুরু হলে এই দুই শ্রেণির বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। তার পরও নিম্ন আয়ের গ্রাহকরা সেই সুবিধা পাবেন না। কারণ সারা দেশে অধিকাংশ গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল আসে ৫০ থেকে ৭৫ ইউনিটের।

জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০১ পিএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০২:০২ পিএম
জীবনধারা বদলান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

আধুনিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য অনুষঙ্গ বিদ্যুৎ। ঘর-বাড়ি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সব ক্ষেত্রই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রাকৃতিক জলাশয় ধ্বংস, গাছপালা নিধন, খাল-নদী-নালা ভরাট করে গড়ে ওঠা আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে বিদ্যুতের ব্যবহার যেমন বেড়েছে, তেমনি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে এর অপচয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এবং পরিকল্পনাহীন অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় হচ্ছে। এর আর্থিক ক্ষতি বহন করতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে, যা যাচ্ছে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে। বছর বছর বাড়ছে বিদ্যুতের দাম।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, জনপ্রিয় ইংরেজি প্রবাদ ‘আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ’, এখনো যথেষ্ট পালনীয়। এর বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, ‘তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাও, তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠো’। পাঠ্যবইয়ের এই শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, সব বয়সী মানুষের জন্যই এখন সমানভাবে প্রযোজ্য। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের জীবনধারা ও অভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইন্টারনেটের বিস্তারের কারণে মানুষ রাত জেগে থাকতে বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকেই সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠেন। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের জীবনেও। গভীর রাত পর্যন্ত পড়াশোনা বা অনলাইন কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকার কারণে তাদেরও সকাল শুরু হয় দেরিতে।

একসময় শিক্ষার্থীরা ভোরে উঠে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসে পড়াশোনা করত। কিন্তু এখন অধিকাংশ শিক্ষার্থী দিনের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার পর পড়তে বসে। ফলে ফ্যান, লাইট বা এসির ব্যবহার প্রয়োজন হয়। ফলে যে কাজ একসময় প্রাকৃতিক পরিবেশে সম্পন্ন হতো, তা এখন অনেকটাই বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এতে দিন-রাতে সমান তালে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে।

এ ছাড়া বিদ্যুতের অপচয়ের আরেকটি বড় ক্ষেত্র সরকারি ও বেসরকারি অফিস। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা অফিসে পৌঁছানোর আগেই কক্ষের লাইট, ফ্যান এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) চালু করে রাখা হয়। অনেক ক্ষেত্রে অফিস শেষ হওয়ার পরও এসব যন্ত্র দীর্ঘ সময় চালু থাকে। দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে লাখের বেশি অফিস রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে সামান্য অপচয়ও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একই চিত্র দেখা যায়– হাসপাতাল, ব্যাংক, মার্কেট, শপিং মল এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক ভবনেও। দিনের আলো পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম আলোর ব্যবহার অব্যাহত থাকে। অনেক ভবনে জানালা থাকা সত্ত্বেও ভারী পর্দা টেনে রাখা হয়, ফলে দিনের বেলায়ও লাইট জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এতে বিশাল অঙ্কের বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

নানা সংকটে ভবন নির্মাণের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। শহরাঞ্চলের নতুন অফিস কিংবা বাসাবাড়িতে ক্রমেই কমে আসছে প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের ব্যবহার। বাংলাদেশ গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে এই দেশে শীতপ্রধান দেশের মতো ভবন নির্মাণের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বহু ভবন নির্মিত হচ্ছে শীতপ্রধান দেশের নকশার আদলে। ফলে পর্যাপ্ত বাতাস ও সূর্যের আলো প্রবেশের সুযোগ থাকছে না সেসব ভবনে। এতে বাসিন্দাদের সারা বছর ফ্যান, এসি ও বৈদ্যুতিক আলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবন নির্মাণে স্থানীয় আবহাওয়া ও পরিবেশকে গুরুত্ব দেওয়া হলে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতেও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রবণতা কমে গেছে। অনেক সময় দেখা যায়, উপাসনালয়ে মানুষের সংখ্যা কম থাকলেও একাধিক ফ্যান, এসি ও লাইট দীর্ঘ সময় ধরে চালু রাখা হয়। শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, বাসাবাড়িতেও বিদ্যুতের অপচয় উদ্বেগজনক মাত্রায় বেড়েছে। অনেক পরিবারে দিনে এবং রাতে অপ্রয়োজনীয় লাইট জ্বালিয়ে রাখা হয়। ব্যবহারের পর টেলিভিশন, কম্পিউটার, চার্জার কিংবা অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ করা হয় না। সবার মাঝে ধারণাটা এমন যে– ‘আমার বিল তো আমি দিই, সমস্যা কোথায়?’ প্রকৃত সত্য হলো, ভোক্তার এই বিল জমা দেওয়ার পরও রাষ্ট্রকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে জনগণের করের টাকা থেকে।

নগরবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে সংযমী হতে জনসাধারণকে আহ্বান করা যেতে পারে। অযথা বিদ্যুৎ ব্যবহার থেকে সরে আসার জন্য সতর্কতামূলক প্রচারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ধনাঢ্যদের প্রতি বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানির উৎসের সন্ধান করার আহ্বান জানানো যেতে পারে।

নগর পরিকল্পনাবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের শহরগুলোতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের ব্যবহার বাড়াতে এবং বিদ্যুতের অপচয় কমাতে ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবর্তন আনা দরকার। ভবনের চারপাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক করা, যাতে পাশের ভবন আলো-বাতাসে বাধা না দেয়। একই সঙ্গে ভবনের দেয়ালে জানালার সঠিক অনুপাত নির্ধারণ করা, যা দিনের আলো ঘরের ভেতরে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। ভবনের উচ্চতা ও চারপাশের ফাঁকা জায়গার অনুপাত এমনভাবে নির্ধারণ করা দরকার যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে ভবনের ভেতর, যা বিদ্যুতের চাহিদা কমিয়ে দেবে।’

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করা না গেলে সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে বিপুল অর্থ ভর্তুকি হিসেবে দিতে হয়। গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) বৈঠকে জানানো হয়, পাইকারি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পরও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে।

অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়াসহ মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। 

প্রতিবছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও আর্থিক ক্ষতির সমাধান হচ্ছে না। গত বুধবারও নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। চলতি জুন মাস থেকেই নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।

এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সময় পাইকারি পর্যায়ে ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য প্রতি ইউনিট ৭ টাকা। নতুন সিদ্ধান্তে তা ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় উন্নীত হবে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে। এ ছাড়া বিদ্যুতের সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ ৩১ দশমিক ৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮ দশমিক ৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, কম খরচে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অপচয় কমানো গেলে জাতীয় পর্যায়ে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। 

সংকট সমাধান করতে লাভের চেয়ে গ্রাহককে গুরুত্ব দিতে বললেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, “বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে বড় সংকট রয়েছে। এ খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে ‘চোরদের নিয়ন্ত্রণে’। এসব চোর ভোক্তাবিরোধী এবং গণবিরোধী। তাই সংকটের সমাধান হচ্ছে না।”

তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটানোর জন্য বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে কিন্তু ঘাটতি কি কমেছে? উল্টো প্রতিবছর বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে কম খরচে উৎপাদন এবং সরকারকে মুনাফা অর্জনের চিন্তা থেকে সরে আসতে হবে। তারা দাম বাড়াতে চায়; কিন্তু সাধারণ মানুষের হয়ে দাম কমানোর জন্যও আইন করা প্রয়োজন। আর যারা চুরি করে কাঠামোগতভাবে সংকট তৈরি করে রেখেছে সেই চোরদের ধরে ধরে বিচার করতে হবে, না হলে এই ঘাটতি থেকেই যাবে।’