সয়াবিন তেলের সরবরাহ আগামী দুই দিনের মধ্যে স্বাভাবিক হবে বলে গত সোমবার রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজার পরিদর্শন শেষে ঘোষণা দিয়েছিলেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সেই বাজারের অধিকাংশ খুচরা বিক্রেতা জানান, এখনো তেল আছে, তেল নেই অবস্থা। চাহিদা মতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কাটেনি সংকট। কারওয়ান বাজারসহ অন্যান্য বাজারেও একই অবস্থা দেখা গেছে। সপ্তাহের ব্যবধানে মুরগির দাম কেজিতে কমেছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা। ব্রয়লার মুরগির কেজি ১৮০ টাকা ও সোনালি মুরগি ২৭০ টাকায় নেমেছে। তবে আগের মতোই চড়া দামে বেগুন, শসা, লেবু বিক্রি হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৬ মার্চ) বিভিন্ন বাজার ঘুরে ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
বাজার থেকে সয়াবিন তেল হাওয়া হয়ে গেলে গত বছরের ৯ ডিসেম্বর বাণিজ্য উপদেষ্টা প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৮ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেন। ওই দিন বলেছিলেন, বেশ কিছুদিন ধরে বাজারে তেলের ঘাটতি রয়েছে, এ নিয়ে প্রধান উপদেষ্টাসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, ভোক্তারাও অস্বস্তিতে রয়েছেন। সে জন্য আমরা তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেছি। নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করি বাজারে আর তেলের ঘাটতি হবে না।
কিন্তু তারপর থেকেই সয়াবিন তেল নিয়ে চলছে লুকোচুরি খেলা। অধিকাংশ দোকানে ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ভোক্তা অধিদপ্তর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ভোজ্যতেল রিফাইনারি মিলমালিক, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের নিয়ে সভা করে। ওই দিন ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘রমজান উপলক্ষে প্রচুর ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। ২৪ ফেব্রুয়ারির পর কোনো সংকট হবে না। কিন্তু তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ১৭ দিন পরও বাজারে তেলের সংকট কাটেনি। বাধ্য হয়ে গত সোমবার বাজার মনিটরিং করেন বাণিজ্য উপদেস্টা। ওই দিন বলেছিলেন দুই দিন পর তেলের বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার বিভিন্ন বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, কোনো কোনো দোকানে ১ ও ২ দুই লিটারের বোতলজাত তেল থাকলেও ৫ লিটারের তেল নেই। আবার কারও কাছে সিটি গ্রুপের তীর ব্র্যান্ডের থাকলেও অন্য কোম্পানির তেল নেই। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাণিজ্য উপদেষ্টা যা ই বলুক, কোম্পানি থেকে দিচ্ছে না তেল। এ জন্য নেই। তাদের ধরতে হবে।
টাউন হল বাজারের মুন ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী আবরার হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোনো বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। মিল থেকে দিচ্ছে না। খোলা তেল পাওয়া গেলেও দাম বেশি। তাদের ধরতে হবে। মিলে অভিযান চালাতে হবে। তাহলেই বাজার স্বাভাবিক হবে। তারা সিন্ডিকেট করেই তেলের বাজারে সংকট রাখছে। এ সময় রাজু আহমেদ নামে এক ক্রেতা বলেন, তেল নিয়ে চলছে চোর-পুলিশ খেলা। মিলে না ধরে বাজারে লোক দেখানো অভিযান চালানো হচ্ছে।’
একই বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের মো. বাবুল মিয়া ও শাহজালাল স্টোরের লোকমান হোসেন বলেন, ‘বাণিজ্য উপদেষ্টা আমাদের দোকানের সামনে দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, তেলের সমস্যা হবে না। কিন্তু মিল থেকে তো চাহিদামতো তেল পাচ্ছি না। সকালে পেলে বিকেলে শেষ হয়ে যায়। বিকেলে পেলে রাতেই শেষ।’ কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল বাজার, সেগুনবাগিচা বাজারেও দেখা গেছে একই চিত্র।
কারওয়ান বাজারের বিসমিল্লাহ স্টোরের শাহ আলম বলেন, ‘তীর ব্র্যান্ডের ৫ লিটারের তেল আছে। তবে ১ ও ২ লিটারের নেই।’ বিভিন্ন পাড়া-মহাল্লাতেও তেল মেলে না। মোহাম্মদপুরের ফিউচার হাউজিংয়ের মায়ের দোয়া স্টোরের মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বেশকিছু দিন ধরে তেল পাচ্ছি না। খোলা তেল পাওয়া গেলেও দাম বেশি। তাই রাখি না।’
ব্রয়লার ১৮০, সোনালি ২৭০ টাকা
মুরগি বিক্রেতারা বলছেন, রমজানে চাহিদা কমে গেছে। কিন্তু সরবরাহ আগের মতোই আছে। তাই দাম কমছে মুরগির। গত সপ্তাহে ব্রয়লার ২০০ থেকে ২১০ টাকা কেজি, সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা বিক্রি হলেও গতকাল কারওয়ান বাজার, টাউন হল বাজারসহ অন্য বাজারেও দেখা গেছে কেজিতে ৬০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। টাউন হল বাজারের ব্রয়লার হাউজের স্বত্বাধিকারী মো. বিল্লাল হোসেনসহ অন্য বিক্রেতারা বলেন, ‘রমজানে হোটেল বন্ধ। চাহিদা কমে গেছে। এ জন্য দাম কমছে। ব্রয়লার ১৮০, সোনালি ২৭০ টাকা কেজি, দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা।’
তবে আগের মতোই ডিমের ডজন ১২৫ থেকে ১৩০ টাকা, রুই, কাতলা আকারভেদে ৩২০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি, পাবদা ৪০০ থেকে ৫০০, তেলাপিয়া, পাঙাশ ১৮০ থেকে ২৫০, ইলিশ ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সেঞ্চুরির উপরেই বেগুন শসা লেবু
রমজান উপলক্ষে বেড়ে গেছে বেগুন, শসা, লেবুর দাম। পাঁচ রমজান চলে গেলেও কমেনি এসব পণ্যের দাম। অসাধু ব্যবসায়ীরা মিলেমিশে বাড়িয়েছেন দাম। গতকালও বিভিন্ন বাজারে লম্বা বেগুন ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। তবে সবুজ বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। লেবুর হালি ৬০ থেকে ৮০ টাকা। বড়টা ১০০ থেকে ১২০ টাকা। হাইব্রিড শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা ও দেশি জাতের শসা ১০০ থেকে ১২০ টাকা। তবে আগের মতোই কাঁচা মরিচের কেজি ৮০ থেকে ১২০ টাকা, আলু ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি, পেঁয়াজ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, দেশি আদা ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা, আমদানি করা আদা ২২০, দেশি রসুন ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, আমদানি করা রসুন ২৪০ টাকা কেজি বিক্রি করতে দেখা গেছে।
কমেনি খেজুরের দাম
প্রচুর আমদানি হলেও রমজানে খেজুরের দাম বেড়ে গেছে। কারওয়ান বাজারের বিক্রমপুর ফল বিতানের শরিফুল ইসলামসহ অন্য বাজারের ফল বিক্রেতারা বলেন, ‘রমজান শুরুর আগেই সব খেজুরের দাম বেড়েছে। গতকালও মেডজুল খেজুর ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা কেজি, জাহিদি ২০০ থেকে ২৪০ টাকা, মরিয়ম ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০, তিউনিসিয়ার খেজুর ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। মাল্টার কেজি ৩০০ টাকা, আপেল ৩২০ থেকে ৩৫০, তরমুজ ৬০ থেকে ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।’
বিক্রি কমলেও কমেনি চালের দাম
রমজানে চালের চাহিদা কমে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে। তারপরও দাম কমেনি। আগের মতোই চড়া দামে মিনিকেট ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা কেজি, আটাশ ৬৫ টাকা ও মোটা চাল ৫৫ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। বেগুন, শসা, লেবুতে উত্তাপ ছড়ালেও একটু স্বস্তির বার্তা দিয়েছে চিনি, ছোলা ও ডাল। পঞ্চম রমজানেও ছোলা, চিনি, খেসারি ও বুটের ডালের দাম বাড়েনি। বিভিন্ন বাজারে খুচরা বিক্রেতারা বলেন, আগের মতোই ছোলা ১০৫ থেকে ১১০ টাকা। ছোলার ডাল ১৩০ টাকা থেকে কমে ১২০ টাকা কেজি, বেসন, খেসারির ডাল ১১০, চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।