গণপরিষদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে হতে পারে- দলগতভাবে বিএনপির অবস্থান এর বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্য কোনো নির্বাচন দলটি মেনে নেবে না। শনিবার (৮ মার্চ) দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার সঙ্গেও একমত দলটির হাইকমান্ড।
গণপরিষদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে হতে পারে- এনসিপির (জাতীয় নাগরিক পার্টি) এমন বক্তব্যের পর সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘আমাদের কথা পরিষ্কার, এ বিষয়ে কোনো জাতীয় ঐক্য হয়তো হবে না।’ জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজও ‘জাতীয় নির্বাচন ও গণপরিষদ নির্বাচন’ একসঙ্গে করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্যের ফলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে বিএনপি নেতারা গতকাল খবরের কাগজের সঙ্গে আলাপকালে সালাহউদ্দিনের কথারই পুনরাবৃত্তি করেছেন। তারা বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনই বিএনপির অগ্রাধিকার। সংসদ নির্বাচনের আগে গণপরিষদ নির্বাচন বা অন্য কোনো নির্বাচন তারা মানবে না।
বিএনপির নেতাদের পর্যবেক্ষণ, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিলম্বিত করতেই গণপরিষদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। ছাত্রদের মূল লক্ষ্য বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল বা পুনর্লিখন। কিন্তু সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘ সময়। আবার এটি রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়াও সম্ভব। তবে গণপরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য পৌঁছানো অনেক কঠিন হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘গণপরিষদ নয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচনই আমাদের অগ্রাধিকার। জাতীয় সংসদ নির্বাচনই সবচেয়ে জরুরি।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রতিটি দলের কিছু চাওয়া আছে। যেমন ওদের (এনসিপি) দলের কিছু চাহিদা রয়েছে। সবাই সবকিছু চাইতে পারে, তাদের বলারও অধিকার আছে। তবে পথ একটাই- সব রাজনৈতিক দল মিলে জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। তা না হলে আগামী নির্বাচনে জনগণের কাছে গিয়ে যার যেটা চাই সেটা পাস করে নিয়ে আসতে হবে। খুব সহজ ব্যাপার, জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সংসদে আসতে হবে। এটাই গণতন্ত্র। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
গণপরিষদ নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হতে পারে- জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের এমন সুপারিশের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আমীর খসরু বলেন, ‘কারও কারও মত বা সুপারিশ থাকতে পারে। যদি ঐকমত্য হয় তা হলে ভালো। তবে এখানে ঐকমত্য হওয়ার আমরা কোনো সুযোগ দেখছি না। সুতরাং যেখানে ঐকমত্য হওয়ার সুযোগ নেই সেগুলো এখন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আগামী নির্বাচনের পর এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’
তবে সংবিধান পুনর্লিখন বা আমূল পরিবর্তনের জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের বিষয়ে এখনো অটল অবস্থানে আছে এনসিপি। দলটির একাধিক নেতা বলছেন, সংবিধান পুনর্লিখনের জন্য গণপরিষদ নির্বাচন প্রয়োজন। এটি এনসিপির প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গতকাল বলেছেন, ‘বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন; বিশেষ করে গণপরিষদ নির্বাচনের কথা আমরা বলেছি। কারণ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এই ফ্যাসিস্ট সংবিধান অকার্যকর ও ব্যর্থ হয়েছে। ফলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়ে জাতিকে নতুন সংবিধান উপহার দিয়ে যাব ইন্শাআল্লাহ।’
এর আগে গত ৪ মার্চ এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছিলেন, ‘গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণে সহায়তা করবে। গণপরিষদ নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে হতে পারে। এর মাধ্যমেই নতুন কাঠামো ও নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’ এরপর ৬ মার্চ রয়টার্সে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারেও তিনি একই কথা বলেন। তবে নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দুই দিন পরই সরাসরি নাকচ করে দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।
মঙ্গলবার সংসদ ভবনে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বিষয়টি আবার সামনে নিয়ে আসেন। তিনি বলেছেন, গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন একসঙ্গে করা সম্ভব। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অতীতেও অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তবে এটি একমাত্র পদ্ধতি নয় বরং আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে জামায়াতে ইসলামী গণপরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে এখনো তাদের দলীয় অবস্থান পরিষ্কার করেনি। তবে দলটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চায়। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সুর মিলিয়ে এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগে করার দাবি তুলছে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, উপজেলা, পৌর বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মতো সামান্য বিষয় যেন অগ্রাধিকার না পায়। দলটি চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন আলোচনাসভা বা মানববন্ধনে নেতারা এই দাবি তুলছেন।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাই। তবে গণপরিষদ নির্বাচনের ব্যাপারে দলের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘যৌক্তিক সময়ের মধ্যে সংস্কার করে জাতীয় সংসদ নির্বাচন চাই। তবে জাতীয় নির্বাচনের আগে যে সময় রয়েছে তাতে স্থানীয় নির্বাচন করে জাতীয় নির্বাচন করার জন্য যথেষ্ট সময় থাকবে।’
অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করার প্রস্তাব দিয়েছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, যেহেতু সংবিধান সংশোধন করতে হবে, সংবিধান সভা হলে ভালো হতো। কিন্তু বিএনপির আপত্তি রয়েছে। ফলে সবাই একমত না হলে সংবিধান সংশোধন করা সম্ভব হবে না। কাজেই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানে সংশোধন আনা যেতে পারে।’