নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের তাঁতী পরিবারের সন্তান লাক মিয়া। উজান গোপিন্দী গ্রামে তার বাপ-দাদারা খেত খামার করেই সংসার চালাতেন। তিন দশক আগেও বিভিন্ন বাজার ঘুরে ঘুরে শাড়ি কাপড় বিক্রি করতেন লাক মিয়াসহ তার ভাইয়েরা। কিন্তু আওয়ামী লীগ দলীয় চেয়ারম্যান হয়েই লাক মিয়া বনে যান ‘লাক সাহেব।’ পেয়ে যান আলাদিনের চেরাগ। গড়ে তোলেন বিশাল সাম্রাজ্য। বিনা ভোটে তিনবার ইউপি চেয়ারম্যান হন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবুর ঘনিষ্ঠতায় লাক মিয়া জমি দখল, নানা অনিয়ম-দুর্নীতি করেই বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। লাক ছাড়াও তার স্ত্রী ও দুই ভাইয়ের নামে রয়েছে অঢেল অর্থ সম্পদ।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে লাক ও তার স্ত্রী এবং এক কর্মচারীর নামে থাকা অ্যাকাউন্টে ২৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে লাক পরিবারের দখলে থাকা বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি এখনো দুদকের হিসাবের বাইরেই থেকে গেছে। আড়াইহাজার, নরসিংদী ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে তার সম্পদের পাহাড়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লাক মিয়া আড়াইহাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। তিনি ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের তিন বারের চেয়ারম্যান। উপজেলার উজান গোপিন্দী গ্রামের মৃত জাবেদ আলীর ছেলে লাক মিয়া। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র জনতার ওপর হামলা ও হত্যার চেষ্টাসহ হামলাকারীদের অর্থ দিয়ে সাহায্য করার অভিযোগে লাকের বিরুদ্ধে হওয়া মামলায় সম্প্রতি তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরপরই তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে বিভিন্ন সংস্থা।
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে লাক মিয়া ও তার স্ত্রী মাহমুদা বেগম এবং তাদের এক কর্মচারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য। এসব অ্যাকাউন্টে এখনো প্রায় ২ কোটি টাকা স্থিতি আছে। এ ছাড়া তাদের নামে প্রায় ৭০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে। এসব অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। তবে এর বাইরেও লাকসহ তার ভাই ও আত্মীয়স্বজনের নামে রয়েছে বিপুল পরিমাণ সম্পদ।
জানা গেছে, লাক মিয়া ও তার স্ত্রী মাহমুদা বেগম এবং বড় ভাই হক মিয়ার নামে আড়াইহাজার, নরসিংদী ও রাজধানীর গুলশানসহ বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে। আড়াইহাজারের উজান গোপিন্দী এলাকায় ১৫ বিঘা জমিতে প্রায় শতকোটি টাকা খরচ করে আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন লাক মিয়া। একই গ্রামে তার পুরোনো দোতলা বাড়ির পাশে আরও একটি বহুতল বাড়ির কাজও চলমান। এ উপজেলার ব্রাহ্মন্দী ও দুপ্তারা ইউনিয়নে লাক ও তার বড় ভাই হকের দখলে রয়েছে অন্তত ৭টি ফসলি জমির বিল। যেখানে আনুমানিক জমির পরিমাণ প্রায় ২ হাজার বিঘা। বিলের পাশের সনাতন সম্প্রদায়ের কয়েকটি বাড়িসহ জমিও দখলে নিয়েছেন এই লাক মিয়া।
আড়াইহাজার উপজেলায় লাক তার ভাইদের নিয়ে গড়ে তোলেন অন্তত সাতটি সুতা তৈরির কারখানা (স্পিনিং মিল)। আড়াইহাজার ছাড়াও মাধবী ও নরসিংদীসহ আশপাশের এলাকায় লাক মিয়ার আছে আরও অন্তত আটটি কারখানা। আড়াইহাজার উপজেলায় ভাই-ভাই নামে বিশাল মার্কেট আছে তার। এই মার্কেটে অন্তত ২০০টির বেশি দোকান ভাড়ায় চলে। রাজধানীর গুলশান এলাকায় তিনটি বাড়ির মালিক এই লাক পরিবার। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ফ্ল্যাটসহ নামে-বেনামে কিনেছেন আরও সম্পদ।
অথচ নব্বইয়ের দশকে এই লাক ছিলেন সামান্য একজন কাপড় বিক্রেতা। তার বাবা সাবেদ আলী ছিলেন গ্রামের একজন তাঁতী। বাড়ির পাশে ছোট্ট তাঁত খানায় কাপড় বুনে তা বিক্রি করতেন নারায়ণগঞ্জ শহরের কালির বাজারে। বাবার সঙ্গে লাকও নিয়মিত যেতেন এই বাজারে। সেসময় ব্যবসা ভালো হওয়ায় কয়েক বছরের মধ্যে গ্রামে শাড়ির সুতা বোনার কারখানা গড়েন লাকসহ তার ভাইয়েরা। এরপর জনি-জিয়া-পাকিজাসহ নানা নামে শাড়ি বাজারজাত করেন। একপর্যায়ে লাক মিয়া গ্রামের মানুষের জমি বন্ধক রেখে টাকা ধার দেওয়া শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে করত জমির দালালি। তবে সেসময় লাক পরিবারের কোনো সদস্য রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল না।
স্থানীয়রা জানান, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে আড়াইহাজারের সংসদ সদস্য হন নজরুল ইসলাম বাবু। তখন ব্রাহ্মন্দী ও দুপ্তারা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মিল-কারখানা গড়তে ব্যবসায়ীদের আগমন ঘটে। সেসময় সাবেক এমপি বাবুর পছন্দের তালিকায় আসে লাক মিয়ার নাম। এরপর ২০১২ সালে বাবুর সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। একইভাবে আরও দুইবার ইউপি চেয়ারম্যান হন লাক। এই সময়ে মধ্যে গড়ে তোলেন বিশাল সাম্রাজ্য।
লাক মিয়ার সাবেক গাড়িচালক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, রাজনীতিতে যোগদানের পর থেকে লাক মিয়ার সব আপদ-বিপদ সাবেক এমপি বাবুই দেখতেন। লাক মিয়া চেয়ারম্যান হওয়ার পর দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে গুলশানের একটি বাড়িতে থাকতেন। প্রথম স্ত্রী থাকতেন গ্রামের বাড়িতে। লাক মিয়া তুলা ও সুতা ব্যবসার পাশাপাশি বহু আগে থেকে জমির কেনাবেচাও করেন।
লাক মিয়াকে ছোটবেলা থেকে চিনেন ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহজাহান মিয়া। তিনি বলেন, লাক গ্রামের মানুষের জমি দখল করে ধনী হয়েছেন।
প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘লাকের জমি দখল থেকে বাদ যায়নি প্রতিবেশীরাও। তবে তার বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনকে দিয়ে হয়রানি করা হতো।’
উজান গোপিন্দী গ্রামের এই বাসিন্দা বলেন, লাক তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুই ভাই জয়নাল ও হক মিয়াকে দিয়ে অন্যের জমি দখলে নিতেন। আর তাতে কাজ না হলে তার পালিত বাহিনী দিয়ে হুমকি আর হামলা করাতেন। পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী বালিয়াপাড়ার সোহেল ছিল লাকের অন্যতম হাতিয়ার। এখানে লাক যা চাইত তাই হতো। গ্রামে উজান গোবিন্দ বিনাইরচর উচ্চ বিদ্যালয়ের স্থাপনার নাম জোর করে তার নামে করেছিলেন।
রফিকুল ইসলামের স্ত্রী ফাহিমা সুলতানা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় লাক জোর করে আমারও সাত শতাংশ জমি দখলে নিয়েছে। মূলত নামমাত্র মূল্যে গ্রামবাসীর কাছ থেকে জমি লিখে নিয়ে সেই জমি ভরাটের পর বিভিন্ন কোম্পানির কাছে বিক্রি করেন লাক মিয়া।’ সুতা কারবারে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বিপুল টাকার মালিক হয়েছেন বলেও জানান তিনি।
গ্রামবাসীর এসব অভিযোগ লিখিত পেলে লাক মিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাত হোসেন। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘লাক মিয়ার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকায় পুলিশ সে অনুসারে ব্যবস্থা নিয়েছে। অন্যদিকে তার অবৈধ সম্পদের বিষয়ে কাজ করছে দুদক। তবে জমি দখলসহ গ্রামবাসীর বিভিন্ন অভিযোগ লিখিত আকারে পেলে তদন্ত শুরু করবে উপজেলা প্রশাসন।
লাক মিয়ার বিরুদ্ধে আড়াইহাজার ও মাধদীসহ বিভিন্ন থানায় আটটি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনায়েত হোসেন। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি লাক মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরে আদালতে হাজির করা হলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। লাক গ্রেপ্তার হলেও তার সহযোগীরা এখনো পলাতক। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন ওসি।
লাক মিয়া ও তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়ে দুদক দুটি মামলা করে। লাক মিয়াসহ তার স্ত্রী ও ভাইদের বিপুল সম্পদের অনুসন্ধানে দুদক কাজ করছে কি না এমন প্রশ্নে দুদকের নারায়ণগঞ্জের উপপরিচালক নিয়ামুল গাজী বলেন, দুদকের অনুসন্ধান এখনো চলমান রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা আড়াইহাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় তার সম্পদের তথ্য সংগ্রহ করছেন।
সামান্য একজন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কীভাবে এত সম্পদের মালিক হলেন সেসব বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। লাক মিয়াসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি সরকারকে আইনি ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হবে বলেও জানান তিনি।