জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে বাড়ছে লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহ। এতে ওই অঞ্চলের নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অনেক কিছু হুমকির মুখে পড়ছে। ওই অঞ্চলে কর্মরত উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, এসব অঞ্চলের পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে বাড়ছে নারীর স্বাস্থ্যজনিত নানা সমস্যা। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পুরুষের তুলনায় বেশি মৃত্যু হয় নারীর। অন্যদিকে নতুন করে গত কয়েক বছরে যুক্ত হয়েছে তাপপ্রবাহ, যার কারণে নারীরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন হিটস্ট্রোকে। উপকূলীয় অঞ্চলের নারীর স্বাস্থ্য ও জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে প্রতিনিয়ত।
বাংলাদেশ সয়েল রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে সমুদ্রের নোনা পানিতে প্লাবিত হতো বাংলাদেশের প্রায় ৮ দশমিক ৩ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি। অথচ ২০০৯ সালে এসে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১০৫ দশমিক ৬ মিলিয়ন হেক্টর। এ ছাড়া গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশের কৃষিজমিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পরিবেশ যে বিপন্ন হয়ে ওঠে তার প্রভাব প্রথমে এসে পড়ে নারীর ওপর। পানির স্তর নিচে নেমে যায়, নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে যায়, নদীর পানি শুকিয়ে যায়, যে দু-একটি নলকূপে মিষ্টি পানি ওঠে সেখানেও পানির জন্য হাহাকার দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়, না হলে কলসি নিয়ে পানির খোঁজে দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয়। শুধু খাওয়ার পানিই নয়, সংসারে সবকিছুর জন্য যে পানি ব্যবহার করা হয়, সেই পানি সংগ্রহ করার দায়িত্বও থাকে নারীর ওপর।
অন্য একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ বরেন্দ্র এবং উত্তর নদী অববাহিকা এলাকার তুলনায় উপকূলীয় এলাকার ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ নারীর পানীয় জল সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন হয়।
পশুর নদী অববাহিকায় সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) আরেক গবেষণা প্রতিবেদন অনুসারে, এ অঞ্চলের মানুষ ভূগর্ভস্থ পানি ও অন্যান্য খাবার থেকে দৈনিক ১৬ গ্রামের বেশি লবণ গ্রহণ করছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। ২০০৯-১০ সালে খুলনার দাকোপ উপজেলার ১৩-৪৫ বছর বয়সী ৩৪৫ জন অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত নোনা পানি গ্রহণের ফলে নারীদের উচ্চ রক্তচাপ, জরায়ুর প্রদাহ, গর্ভকালীন খিঁচুনি, গর্ভপাত হয়েছে। এ ছাড়া অনেক নারীর অপরিণত শিশুও জন্ম নিয়েছে।
এ বিষয়ে অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি)-এর সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ফেরদৌসি বেগম বলেন, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত নোনা পানি গ্রহণ ও ব্যবহারের ফলে অন্তঃসত্ত্বার উচ্চ রক্তচাপ বেড়ে যায়। এর ফলে জরায়ুর প্রদাহ, গর্ভকালীন খিঁচুনি ও গর্ভপাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পাশাপাশি অপরিণত শিশু জন্মের আশঙ্কাও থাকে এই লোনা পানি ব্যবহারের ফলে। তাই গর্ভাবস্থায় নারীদের লোনা পানি গ্রহণ ও ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।
উপকূলীয় অঞ্চলের নারীদের উন্নয়নে কাজ করছে ইউএনডিপি। সংস্থাটির জেন্ডার টিম লিডার শারমিন ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে চুল ও ত্বকের ক্ষতি হয়। রং কালো হয়ে যায় ও দ্রুত বার্ধক্য চলে আসে। উপকূলের নারী ও শিশুদের চিংড়িপোনা ধরার জন্য ভাটার সময় ভোরে ও দিনের বেলায় প্রায় ৭-৮ ঘণ্টা লবণাক্ত পানিতে থাকতে হয়। এর ফলে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে। লবণাক্ত পানির কারণে নারীরা এখন জরায়ু ক্যানসারের মতো জটিল রোগে ভুগছেন।’
এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর যে কয়েক লাখ নারী জরায়ু ক্যানসারের ঝুঁকিতে থাকেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা। নারীদের জরায়ুসংক্রান্ত অসুখের তীব্রতা লবণাক্তপ্রবণ গ্রামগুলোতে বেশি। সে জন্য অল্প বয়সেই এ এলাকার নারীরা জরায়ু কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন।
এ বিষয়ে শারমিন ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করছি। বিশেষ করে সুপেয় পানির অভাবের কারণে ওই এলাকার নারীরা পানি কম পান করেন। ফলে তারা উচ্চ রক্তচাপ, চর্মরোগ, প্রি-একলাম্পশিয়া, এমনকি গর্ভপাতের শিকার হন। আবার লোনা পানির অতিরিক্ত ব্যবহারেও তাদের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। চর ও প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় নারীরা সহজে স্যানিটারি ন্যাপকিন, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পান না। মাসিক ব্যবস্থাপনার অভাবে নারী ও কম বয়সী মেয়েরা নিয়মিতভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি খান দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা না জেনে।
জলবায়ু পরিবর্তনের আরও একটি অভিঘাত হচ্ছে ক্রমেই তাপপ্রবাহ বেড়ে চলা। এখানেও নারীদের বিপন্নতা বেশি দেখা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. কালাম মল্লিক বলেন, ‘অতিরিক্ত তাপপ্রবাহের মাঝেও নারী তার শরীর ঢেকে রাখেন অনেক রকম পোশাকে। ফলে অত্যধিক তাপপ্রবাহ নারীর, বিশেষভাবে অন্তঃসত্ত্বা নারীর হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়ে দেয়। আবার এই তাপপ্রবাহের মধ্যে রান্নাঘরে অনেকটা সময় কাটাতে হয়, যেখানে ধোঁয়া ও তাপ ছাড়াও পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা থাকে না। ফলে নারীরা হাঁপানি ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া পোশাকের কারণে যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারীর মৃত্যুঝুঁকিও অনেক বেশি থাকে।’
জাতিসংঘ জনসংখ্যা কর্মসূচির (ইউএনএফপিএ) প্রতিবেদন অনুসারে, অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদায়ী নারী এবং কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। শুধু স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যেসব দুর্যোগ সৃষ্টি হচ্ছে, সেখানে পুরুষের তুলনায় নারীর মৃত্যুঝুঁকি ১৪ গুণ বেশি। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে নিহত ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের মধ্যে ৭৭ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০০৪ সালের সুনামিতে নিহতদের ৭০ শতাংশই ছিলেন নারী। ২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের পর মায়ানমারের ৮৭ শতাংশ নারী তাদের কাজ হারান। ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলায় আক্রান্তদের (নিহত ও আহত) ৭৩ শতাংশই ছিলেন নারী।
নারীদের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে সচেতন করার ওপর গুরুত্বারোপ করে শারমিন ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে এবং নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে ইউএনডিপি। আমরা ওই সব এলাকার পুরুষদেরও সচেতন করছি, যেন তারা নারীদের কাজে সহযোগিতা করেন এবং কাজ ভাগাভাগি করে নারীদের ওপর চাপ কমান। নারীদের যে দূর-দূরান্ত থেকে পানি আনার কাজটি করতে হয় তাতে পুরুষরা যেন সহযোগিতা করেন, সে বিষয়ে আমরা সচেতনতা তৈরি করছি। এ ছাড়া নারীর সার্বিক ক্ষমতায়ন যেন হয় ও তারা যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় থাকেন, সে ব্যাপারে আমরা কাজ করছি। এর ফলে নারীরা কেবল তাদের স্বাস্থ্য বিষয়েই নয়, সার্বিক জীবন সম্পর্কেই সচেতন হবেন।’