তৈরি পোশাক খাতের কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যাদেশ পেয়ে থাকে। বায়ারদের সঙ্গে সরাসরি দর-কষাকষি করে পণ্যের দাম বাড়ানোরও সুযোগ পায়। এসব বাড়তি সুবিধা পাওয়ার পরও কমপ্লায়েন্স কারখানাতেও শ্রমিকের মজুরি বাড়ানো হয় না। অন্য সুযোগ-সুবিধাও আটকে আছে আগের বৃত্তেই।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলো বাড়তি সুবিধা পেলেও তাতে মুনাফা খুব একটা বাড়ে না। মুনাফা যা বাড়ে তাতে মজুরি বাড়ানো সম্ভব না। কমপ্লায়েন্স কারখানায় শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দেওয়া নিয়ে লুকোচুরি চলছে।
পোশাক কারখানার শ্রমিকরা বলেছেন, বিভিন্ন আজুহাতে শ্রমিকদের বেতন ও অন্য সুবিধা বাড়ানো হয় না। কমপ্লায়েন্স কারখানা আলাদাভাবে মজুরি বাড়াতে না পারলেও কার্যাদেশ বেশি পেলে বেতন বাড়িয়ে শ্রমিকদের আয় বাড়াতে পারে।
কমপ্লায়েন্সের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। তবে দেশের প্রচলিত শ্রম আইন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, কোম্পানির প্রচলিত আইন, কোম্পানির প্রচলিত বিধিমালা, আইএলও কনভেনশনের নীতিমালা এবং বায়ারদের নির্দেশিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো কারখানার স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও পরিবেশ বজায় রাখার মানদণ্ড পূরণ করলে সেই কারখানাকে কমপ্লায়েন্স স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের সব ধরনের ন্যায়সংগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার একধরনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা আছে কমপ্লায়েন্সে। কারখানার শ্রমিক-কর্মচারীদের নিরাপদ পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, অগ্নিকাণ্ডকালীন বহির্গমনও নিশ্চিত করার কথা বলা আছে কমপ্লায়েন্সে। শ্রমিকের কল্যাণমূলক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার কথা বলা আছে সেখানে।
এই কারখানাগুলো কার্যাদেশ নিশ্চিতের সময় সরাসরি দর-কষাকষির সুযোগ পায়। নিয়মিত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পণ্যের অর্ডারও পায়। কমপ্লায়েন্স কারখানা ব্যবসা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার দিক থেকেও এগিয়ে। নগদ সহায়তা, মূসক অব্যাহতি, রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) থেকে স্বল্পসুদে ঋণ এবং শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুবিধাও বেশি পায়।
শ্রমিকের মজুরি দেওয়ায় প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কারখানাগুলো। ভারত, কম্বোডিয়া, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম ও পাকিস্তানের পোশাক শ্রমিকরা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি মজুরি পান। শুধু তা-ই নয়, দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের তুলনায়ও কম মজুরি দিচ্ছে শীর্ষ রপ্তানি আয়ের এই খাত। যেকোনো দুর্যোগেও পোশাক শ্রমিকরা অবহেলিত। করোনার মতো ভয়ংকর ব্যাধির মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কাজ করেছেন। কারখানার কমপ্লায়েন্স বজায় রাখতে সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে।
গার্মেন্টস অধিকার আদায় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সায়েদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বায়াররা যখন পরিদর্শনে আসেন, তখন অনেক সময় কারখানার প্রকৃত চিত্র দেখতে পান না। কমপ্লায়েন্স কারখানা ভালো ব্যবসা করে ভালো মুনাফা করে। তাই শ্রমিকদের নায্য মজুরিসহ বাড়তি কিছু সুবিধা তারা দিতে পারে। এসব মানা হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারিতে বিদেশিদের পাশাপাশি দেশের মধ্যে শ্রমিকের অধিকার নিয়ে যারা কাজ করছেন তাদের কঠোর হতে হবে।’
বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির প্রধান তাসলিমা আখতার খবরের কাগজকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক খাতে কয়েক বছর আগে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন আমরা মজুরি বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছি। এসব বাস্তবায়নের দাবি করছি। কমপ্লায়েন্স কারখানা আলাদাভাবে মজুরি বাড়াতে না পারলেও অর্ডার বেশি এলে তা বোনাস হিসেবে দিতে পারে। বিষয়টি মালিকদের ভেবে দেখা উচিত।’
তবে ব্যবসায়ীরা বলেছেন অন্য কথা। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নতুন সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অধিকাংশ কারখানা কমপ্লায়েন্স অনুসরণ করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়ছে না। কারণ অধিকাংশ কারখানা এখনো বেসিক পণ্যে (যেমন টি-শার্ট, ট্রাউজার, আন্ডারগার্মেন্টস) সীমাবদ্ধ, যেগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র এবং দাম কম। অন্যদিকে ভ্যালু-অ্যাডেড এমএমএফভিত্তিক পণ্য উৎপাদনে অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
ব্যবসায়ী এই নেতা বলেন, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারতসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহ করায় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। পাশাপাশি ডিজাইন, উদ্ভাবন ও বাজারবৈচিত্র্যের অভাব এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে প্রয়োজন পণ্যের বৈচিত্র্য, এমএমএফভিত্তিক ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘কমপ্লায়েন্স কারখানার প্রতি বায়াররা আগ্রহী এটা সত্য। কিন্তু তার মানে এই না, কমপ্লায়েন্স কারখানা মানেই মুনাফার পাহাড়। অনেক রকম হিসাব কষে আমাদের কারখানা চালাতে হয়। সেখানে বাড়তি মজুরি দেওয়া সম্ভব না। এ ছাড়া ডলারসংকটের কারণে আমরা বেকায়দায় আছি। জ্বালানি খরচ বেড়েছে। কাঁচামালও এখন বেশি দামে আনতে হচ্ছে। কমপ্লায়েন্স কারখানা হিসেবে দর-কষাকষি করতে দাম বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও সুফল পুরোটা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ দাম আমাদের চাহিদামতো বাড়ানো যায় না। সবকিছু মিলিয়ে কমপ্লায়েন্সের শর্ত অনুযায়ী শ্রমিকের মজুরি বাস্তবায়নের পথে এখনো অনেক বাধা রয়েছে। আশা করি একসময় বাংলাদেশ এ বাধা কাটিয়ে উঠবে।’
তবে অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, কমপ্লায়েন্স কারখানার মালিকরা ভালো অর্ডার পেলে সরাসরি মজুরি না বাড়লেও অতিরিক্ত বোনাস দিয়ে শ্রমিকদের আর্থিক সুবিধা দিতে পারেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. আবুল বাশার মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এক জোট হয়ে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করেন। আমরা দেখি এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব থাকে। পোশাক কারখানার মালিকরা বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে মজুরি বাড়াতে চান না। সরকারের মধ্যস্থতা লাগে। যা মজুরি দেওয়া হয়, তা সুষ্ঠু জীবনযাপনের জন্য যথেষ্ট না। এবার আসি কমপ্লায়েন্স কারখানার ক্ষেত্রে। এসব কারখানা তার জোটের বাইরে গিয়ে মজুরি বাড়াবে না। তারা মুনাফা করলে শ্রমিকদের বোনাস হিসেবে দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে বেতন না বাড়লেও শ্রমিকদের আয় বাড়বে।’
একই মত জানিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, যেহেতু কমপ্লায়েন্স কারখানায় সমস্যা কম থাকে। তাই শ্রমিকদের বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে এসব কারখানা আরও সদয় হতে পারে। এতে তাদের মুনাফা কমবে না। বরং বাড়বে। কারণ এতে শ্রমিকদের কাজের প্রতি আগ্রহ বাড়বে। সুবিধা পেলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে। ফলে কমপ্লায়েন্স কারখানার মালিকদের আয় বাড়বে।
গার্মেন্টস ট্রেড ইউনিয়নের সহসভাপতি জলি তালুকদার খবরের কাগজকে বলেন, কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলো ভালো ব্যবসা করে। বেশি অর্ডার পায়। শ্রমিকদের বেশি কাজ করতে হয়। অথচ মজুরি বাড়ায় না। আবার বাড়তি বোনাসও দেয় না। শ্রমিকদের নায্য পাওয়া থেকে ঠকানো হচ্ছে।