ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি এখন সরগরম। তবে অন্য সময়ের নির্বাচনের তুলনায় এবারের চিত্র ব্যতিক্রম। ছাত্রসংগঠনের পাশাপাশি অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। অতীতে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রসংগঠনগুলোর একক প্রভাব থাকলেও এবার স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও শক্ত অবস্থানে। ফলে ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্য সমীকরণ মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নির্বাচনে অংশ নিলে জয়ী নাকি পরাজিত হবে, সে নিয়ে অনিশ্চয়তায় তারা। ফলে নির্বাচন নিয়ে সুযোগ পেলেই অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে প্যানেলের চাইতে ব্যক্তির গুরুত্ব বেশি পেলে এবারের ডাকসুর চিত্র ভিন্ন হবে। সে ক্ষেত্রে যে সরকারই আসুক চাপ অনুভব করবে। প্রথাগত ছাত্ররাজনীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসবে। জুলাই আন্দোলনের যে চূড়ান্ত বিজয় তার প্রতিফলনও ঘটবে এই ডাকসু নির্বাচনে। আমার এটিও মনে হয়, ক্যাম্পাসে ছাত্রসংগঠনের যে একক আধিপত্য সেটি হয়তো ভেঙে যেতে পারে। সব মিলিয়ে যাদের ভোটের সংখ্যা বেশি হবে তারা একটা প্রভাব বিস্তার করবে।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে দেশের পটপরিবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতিতেও ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ ছাত্রসংগঠনগুলো সহাবস্থান করে ক্যাম্পাসে। বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের একাংশ থেকে গঠিত হয় গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ। এসব ছাত্রসংগঠন কর্মসূচিও পালন করে বড় ধরনের ঝামেলা ছাড়াই। একই সঙ্গে ছাত্ররাজনীতির বিকল্প হিসেবে কার্যকর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি ছিল শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বিষয়টি আমলে নেয়। ধাপে ধাপে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছে নির্বাচনের প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক অধিকাংশই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দিয়েছেন। তবে নির্বাচনকে ঘিরে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কারণ ছাত্রসংগঠনগুলোর জন্য ভোটের সমীকরণ করা কঠিন হয়ে গেছে। গত ১৮ আগস্ট মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের শেষ দিন থাকলেও একদিন বাড়ানো হয়। ছাত্রীদের একটি হলে মনোনয়ন ফরম নিতে গিয়ে মবের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছে ছাত্রদল। তাদের বক্তব্য, নির্বাচন নিয়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হয়নি। গত সোমবার রাতে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন ঘিরে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে ‘আচরণবিধি লঙ্ঘন ও প্রশাসনের ওপর চাপ’ তৈরির অভিযোগ আনে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একাধিক ফেসবুক গ্রুপেও এই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার এক নেত্রী ফেসবুকে লেখেন, ‘সুষ্ঠু ডাকসু পেতে শিক্ষার্থী সংসদ নামক দুটি ফেসবুক গ্রুপ ও প্রত্যেক হলের গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিতে হবে। এই দাবি সব প্যানেলের তোলা উচিত। পলিটিক্যাল রংবাজদের প্রোপাগান্ডার রাজনীতি চালু রাখলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব না।’ সেই পোস্টে আরেকজনের মন্তব্য- ‘নিরঙ্কুশ বিজয়’ দেওয়ার দায়িত্বও নিতে হবে ডাকসুকে?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে ভোটার বেশি রোকেয়া হলে। আর ছাত্র হলের মধ্যে বেশি ভোটার জগন্নাথ হলে। যেসব প্রার্থী হল দুটির ভোট বেশি পাবেন তারা ডাকসুতে বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন। অন্য সময়ের তুলনায় এবার ভোট পড়ার হারও বেশি হবে। কারণ একক ছাত্রসংগঠন কোনো কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। ফলে সবাই উৎসাহ নিয়ে ভোট দিতে আসবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রসংগঠনের এক নেতা খবরের কাগজকে বলেন, এবার আসলে নির্বাচন নিয়ে কেউ নিশ্চিত হতে পারছে না। কারণ অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী। যারা ব্যক্তি উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য কাজ করেছেন। ছাত্রসংগঠনগুলোও শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় ছিল। ফলে সবার মধ্যে একটা অনিশ্চয়তা কাজ করছে। নির্বাচনে কী হবে?
সব শেষ অনুষ্ঠিত ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে প্যানেল হিসেবে ছাত্রলীগের একক প্রাধান্য ছিল। ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক ছাড়া সব কটিতে জয় পায় তারা। তবে এবার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার কারণে সংগঠনটি এখন নিষিদ্ধ। কোনো দলীয় সরকার ক্ষমতায় না থাকায় এবারের নির্বাচনে দলীয় ছাত্রসংগঠনের প্রভাব কম থাকবে। একাধিক ছাত্রসংগঠন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় নির্বাচনে একক প্যানেলের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে রাজনৈতিক সংগঠনের ঊর্ধ্বে গিয়ে ব্যক্তির ইমেজকে প্রাধান্য দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। আমলে নিচ্ছেন, প্রার্থীর অতীত আচার-আচরণ ও প্রতিশ্রুতি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক শিক্ষার্থী খবরের কাগজকে বলেন, ‘যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল, সকলকেই তো ছাত্রলীগের ছায়ায় থাকতে হয়েছিল। এখন অনেক সিনিয়র ভাই এবং বন্ধু আছে যারা ছাত্রলীগের গেস্টরুম কিংবা প্রোগ্রাম যাওয়া নিয়ে খারাপ ব্যবহার করেছেন, এখন তারা ভালো মানুষ সাজছেন। এমন লোককে তো আর ভোট দিতে পারি না। তিনি হয়তো জুলাই অভ্যুত্থানের পরে শিক্ষার্থীবান্ধব হয়েছেন। কিন্তু পরে আবার একই রূপে ফিরে আসবেন না, তার তো নিশ্চয়তা নেই! এখন যে, ছাত্রলীগ থেকে আমাকে অত্যাচার-নির্যাতন থেকে কিছুটা বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন এবং কিছুটা সমীহ করেছেন অবশ্যই তাকে ভোটটা দেব।’
শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া তাসনিম তানজিলা খবরের কাগজকে বলেন, ‘ডাকসু নিয়ে তো আমাদের প্রত্যাশা অনেক। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি না থাকায় যৌক্তিক দাবিও বাস্তবায়ন করেনি প্রশাসন। এখন যিনি সমস্যা নিরসনে কাজ করবেন এবং শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবেন, অবশ্যই এমন একজনকে পছন্দের তালিকায় রাখব।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ছাব্বিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিগত সময়গুলোতে যারা শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে সব দাবি আদায়ে সোচ্চার ছিলেন, অবশ্যই তাদের প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রাখব। যার ফলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমি প্যানেলের তুলনায় সবার আগে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দিতে চাই, যিনি শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করবেন।’
আজ প্রকাশ্যে আসবে সব প্যানেল, বাম জোটের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’
গতকাল দুপুরে মধুর ক্যান্টিনে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করেছে বাম সংগঠনগুলোর জোট। ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’ নামে পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করা হয়। এতে শেখ তাসনিম আফরোজকে (ইমি) সহসভাপতি (ভিপি) ও মেঘমল্লার বসুকে সাধারণ সম্পাদক (জিএস) প্রার্থী করা হয়।
ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ), সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (একাংশ) ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগ-বিসিএল সমর্থিত আংশিক প্যানেল ঘোষণা করে। তাদের প্যানেলের নাম ‘নাঈম-অনয়-অদিতি’ প্যানেল। এতে সহসভাপতি (ভিপি) পদে নির্বাচনে অংশ নেবেন ছাত্রলীগ-বিসিএল ঢাবি শাখার সভাপতি নাঈম হাসান হৃদয়, জিএস পদে নির্বাচন ছাত্র ইউনিয়নের শিক্ষা ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক এনামুল হাসান অনয়, এজিএস পদে নির্বাচন করবেন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাবি শাখার সদস্য সচিব অদিতি ইসলাম।
গতকাল পূর্ণাঙ্গ প্যানেল দেওয়ার কথা থাকলেও এই প্রতিবেদন লেখার সময় রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক মুখপাত্র উমামা ফাতেমার নেতৃত্বে থাকা স্বতন্ত্র প্যানেল, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দীন মোহাম্মদ খালিদের নেতৃত্বে থাকা ‘ডিইউ ফার্স্ট’ নামের প্যানেল পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা করতে পারেনি। ডাকসুর মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় এক দিন বাড়ানোর কারণে তারা প্যানেল ঘোষণা দিতে সময় নিচ্ছেন বলে ধারণা করা হয়। আজ বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর তারা পূর্ণাঙ্গ প্যানেল ঘোষণা দিতে পারেন। ফলে আজ বুধবার প্রকাশ্যে আসবে সব প্যানেল।
উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় এক দিন বাড়ানোয় প্রশাসন ছাত্রদলকে সুবিধা দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের নেতারা। আর ছাত্রশিবির সময় বাড়ানোকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রশাসনের পক্ষপাতী আচরণ হিসেবে দেখছে।
মনোনয়নপত্র জমা শেষে ঢাবি শিবিরের সভাপতি এস এম ফরহাদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন হঠাৎ করে এক দিন মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় বাড়াল। এটি স্পষ্টত একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি তাদের পক্ষপাতমূলক আচরণ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ছিল যে তারা যে তারিখ ঘোষণা করবে, সেই তারিখ মেইনটেইন করা।’
এমন অভিযোগ নাকচ করে দেন ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘কোনো দলের চাপে নয়, শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে মনোনয়ন ফরম বিতরণ ও জমার সময় বাড়ানো হয়েছে।’
শিবিরের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের
ছাত্রশিবিরের প্যানেলের প্রার্থীদের এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুলিয়াস সিজারের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ)। ঢাবি সংসদের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুম রানা জয় এবং সালাউদ্দিন আম্মার নিলয় এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থী সর্বমিত্র চাকমা শিবির সমর্থিত প্যানেল থেকে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। এই ঘটনায় গতকাল বিকেলে জগন্নাথ হলে ৭১ বিরোধী অপশক্তির রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে হলে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রাধ্যক্ষ অফিসের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে হলটির একদল শিক্ষার্থী।
প্রসঙ্গত, ডাকসুর ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে কাল ২১ আগস্ট প্রাথমিক প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশিত হবে। চার দিনের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে ২৬ আগস্ট প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ এবং সব শেষ ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত নির্বাচনের ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।