বৃহস্পতিবার ১৮ সেপ্টেম্বর। বেলা সাড়ে ১১টা। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় সেই ক্ষতিগ্রস্ত হায়দার আলী ভবনটি এখনো একইভাবে পড়ে রয়েছে। ভবনের বাইরে পোড়া নারকেল গাছ কঙ্কালসার চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভবনটির বাইরে টিনশেডের বেস্টনীতে ঝুলছে শোকবাণীসংবলিত বিভিন্ন ব্যানার। শিক্ষার্থী-অভিভাবক যারাই ওই ভবনের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন, তারা এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাঁড়াচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থীকে নির্বাক দৃষ্টিতে ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখা গেল।
২ মাস আগে গত ২১ জুলাই এই মাইলস্টোন ক্যাম্পাসেই ঘটেছিল স্মরণকালের ভয়াবহ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। ঘটনাস্থলে এবং পরে হাসপাতালে মোট ৩৬ জনের করুণ মৃত্যু হয়, যাদের অধিকাংশই ছিল ছোট্ট কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থী।
বৃহস্পতিবার কথা হয় শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে। আলাপকালে জানা যায়, দুই মাস পার হলেও এখনো শিক্ষার্থী বা সংশ্লিষ্টদের মনে একধরনের অজানা ভয় ও আতঙ্ক কাজ করছে। বিশেষ করে মাথার ওপর বা আকাশ দিয়ে কোনো বিমান উড়ে গেলে তাদের মনে পড়ে যায় ২১ জুলাইয়ের বিভীষিকাময় সেই ঘটনার কথা।
দুপুরে অবস্থানকালে যখন ছুটির ঘণ্টা বাজল, শ্রেণিকক্ষ থেকে একে একে বের হয়ে আসছিল শিক্ষার্থীরা। ক্লাস ভবনের সামনে অপেক্ষমাণ অভিভাবকরা একটু এগিয়ে নিজের সন্তানদের খুঁজে নিচ্ছিলেন। অনেক মা তার সন্তানকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরে আদর করছিলেন। কিন্তু সেই বিধ্বস্ত ‘হায়দার আলী’ ভবনের সামনে ছিলেন না কোনো অপেক্ষমাণ অভিভাবক। হচ্ছিল না কোনো ক্লাস, ছিল না শিক্ষার্থীদের হৈ-হুল্লোর। সেখানে শুধুই নিস্তব্ধ-নীরবতা।
মাইলস্টোনের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আরাফাত এ সময় খবরের কাগজকে বলে, ‘এখন সবকিছুই প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমরাও ট্রমা থেকে উঠে এসেছি, যদিও কাউন্সেলিং চলমান রয়েছে। তবে এখন বড় কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’
এ বিষয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান শিক্ষক ফারহানা শারমিন খবরের কাগজকে বলেন, মাইলস্টোনে দুর্ঘটনার পর থেকে গত ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৪২৩ জনকে কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বেশি। প্রথম দিকে কাউন্সেলিং সপ্তাহে শুক্রবার বাদে ছয় দিন চলত। তবে ট্রমা কাটিয়ে ওঠার কারণে এটা কমে এসেছে। বর্তমানে সপ্তাহে তিন দিন (রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার) কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া যেসব শিক্ষার্থী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে, তাদের মধ্যে ১৬ জনের সঙ্গে কথা বলে কাউন্সেলিং করা হয়েছে। গতকাল রবিবার থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের প্রত্যেকের বাসায় গিয়ে হোম কাউন্সেলিং করা হচ্ছে।
এদিকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তরিকুল ইসলাম বলেছে, ‘আমি মাইলস্টোনের হোস্টেলে থাকি। তবে হায়দার আলী ভবনের সামনে দিয়ে চলাচল করার সময় প্রতিবারই ভয় কাজ করে। আমার সেই সব ছোট ভাই-বোনের কথা মনে পড়ে। ওদের জন্য খুব কষ্ট লাগে, মন খারাপ হয়।’
ভবনটি নিয়ে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা কী- জানতে চাইলে মাইলস্টোনসংশ্লিষ্টরা জানান, হায়দার আলী ভবনটি এমন থাকবে না। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে ভবনটি সংস্কার করে পাঠদানের উপযোগী করা হবে। পাশাপাশি নিহতদের স্মরণে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা স্মৃতিফলক তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের স্কুল সেকশনের প্রধান শিক্ষক ক্যাপ্টেন (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভয় ও ট্রমা কাজ করছিল। প্রথম দিকে শিক্ষার্থীরা আতঙ্কিত থাকলেও নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সেই আতঙ্ক কাটানো সম্ভব হয়েছে। মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীরাও খুবই ইতিবাচক। কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মানসিকতার অনেক উন্নতি ঘটিয়েছে।’
আহত শিক্ষার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আহতদের চিকিৎসার জন্য মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ সহযোগিতা করছে। তাদের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া নিহত এক শিক্ষকের একটি সন্তানের দায়িত্ব মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ নিয়েছে। নিহত তিনজন শিক্ষকের বেতন এখনো চলমান রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নিহত ও আহতদের তালিকা নিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা চলমান রয়েছে।
এদিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন দগ্ধ দুই শিক্ষার্থী নিলয় (১৩) ও রুপি বরুয়ার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় গতকাল রবিবার তাদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
দগ্ধ-আহতদের চিকিৎসাসেবা প্রসঙ্গে গতকাল রবিবার মুঠোফোনে কথা হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় দগ্ধ ৩৬ জনকে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। তাদের মধ্যে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হওয়ায় গতকাল রবিবার পর্যন্ত ২৮ জনকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। এখনো আটজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আশা করছি, তারাও খুব দ্রুতই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবে।’
নিহত-আহতদের পরিবারের দাবি
বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় নিহত ও আহতের পরিবার ও অভিভাবকরা দাবি জানিয়ে বলেছেন, মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির ২১ জুলাই দিনটিকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘শোক দিবস’ পালন করা উচিত। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে এর আগে কখনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুসহ ৩৬ জনের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেনি। একই সঙ্গে তারা এই ঘটনায় নিহতদের কবরগুলো সংরক্ষণে সরকারের পদক্ষেপ কামনা করেন।