ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড নিছক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা- তা নিশ্চিত হতে কয়েকটি সংস্থার তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের তদন্তে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এ ঘটনায় নাশকতার সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ পাননি সংশ্লিষ্টরা। গতকালও বিভিন্ন সংস্থার তদন্তকারীরা পোড়া কার্গো ভিলেজ পরিদর্শনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করেছেন। বর্তমানে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের দিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গতকালও সকাল থেকে দিনভর বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক)। গতকাল সন্ধ্যার পরেও বেবিচক সদর দপ্তরে তদন্তসংশ্লিষ্ট বৈঠক ও আলোচনা চলছিল। এর মাঝে গতকাল আনুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে ‘বেবিচক’ চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘ইমপোর্ট কুরিয়ার সেকশন থেকে কার্গো ভিলেজে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে আগুনে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ বা ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করার বিষয়টিও রয়েছে জোরালো আলোচনায়। যদিও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের দাবি, কার্গো ভিলেজের আগুনে ক্ষতি হয়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি। এর সঙ্গে বিমা সুবিধা থাকা না থাকা বা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার বিষয়গুলো সংশ্লিষ্টদের আলোচনার মধ্যে রয়েছে।
গতকাল দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কার্গো ভিলেজের আমদানি কমপ্লেক্সটি পোড়া কঙ্কালসার কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পোড়া ভবনের সামনে বেশ কিছু পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া কাউকে পোড়া কার্গো ভিলেজের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এর পাশেই ৯ নম্বর গেট দিয়ে আমদানি পণ্য স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় খালাসের কাজ চলছে।
শাহজালাল এয়ারপোর্ট ও বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে জানান, গত রবিবার বিকেলে আগুন সম্পূর্ণ নিভে যাওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত অনেক সংস্থা কার্গো ভিলেজের পোড়া বিভিন্ন অংশ থেকে নানা আলামত বা নমুনা সংগ্রহ করেছে। অনেকে ভেতরের ও আশপাশের ভিডিও ফুটেজসহ নানা দিক নিয়ে বিশ্লেষণ করছেন। ওই সব নমুনার সঠিক ফলাফল পেতে কয়েক দিন সময় লাগবে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ের তদন্তে গতকাল পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডে নাশকতার তেমন কোনো চিহ্ন বা প্রমাণ মেলেনি। তবে এটি নিয়ে আরও অনেক কাজ করার আছে। তারপরই নিশ্চিত হওয়া যাবে, এই অগ্নিকাণ্ড দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা।
এদিকে পুড়ে যাওয়া কার্গো ভিলেজের অবকাঠামো ব্যবহারযোগ্য নাকি পুরোপুরি পরিত্যক্ত হবে, সেটির জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা। ভবনের কাঠামো পর্যবেক্ষণ ও নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা যে মতামত দেবেন, সে অনুযায়ী পোড়া ভবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে বেবিচক সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, ‘গত শনিবার বেলা ২টা ১৫ মিনিটের দিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনাল (ইমপোর্ট কার্গো ভিলেজ) এলাকায় আগুনের সূত্রপাত ঘটে। সেখানে ইমপোর্ট কুরিয়ার সেকশন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। বিষয়টি আমরা নিশ্চিত নই, তবে প্রাথমিকভাবে এমনটিই ধারণা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে অনেক সংস্থা কাজ করছে। এসব তদন্ত শেষে আগুন লাগার প্রকৃত বা সুনিশ্চিত কারণ জানা যাবে।’
আগুন লাগার পর সেই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, আগুনের সময় ১৫টি ফ্লাইট ভিন্ন ভিন্ন রুটে পাঠানো হয়েছিল। ওই সময় বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় যত যাত্রী আটকে পড়েছিলেন তাদের পরের দিন বিকেল ৪টার মধ্যে নির্ধারিত গন্তব্যে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের আরও দল যোগ দিলে আগুন পর্যায়ক্রমে নিয়ন্ত্রণে আসে।
বেবিচক চেয়ারম্যান আরও বলেন, “আগুন লাগার সময় কার্গো টার্মিনালের ভেতরে বেশ কয়েকটি উড়োজাহাজ অবস্থান করছিল। আমরা দ্রুত সেগুলোকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছি, যাতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা না থাকে। উত্তর ও দক্ষিণ উভয় পাশেই ‘কাট-অফ মেকানিজম’ ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হই। সবার সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই বড় বিপর্যয় এড়ানো গেছে।”
এ সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বেবিচকের সদস্য (অপারেশন্স ও প্ল্যানিং) এয়ার কমোডর আবু সাইদ মেহবুব খান, সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) এস এম লাবলুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এদিকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (বাপি) গতকাল তাদের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, কার্গো ভিলেজের আগুনে শীর্ষ ৪৫টি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রায় ২০০ কোটি টাকার কাঁচামাল পুড়ে গেছে। এতে দেশের ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই আকস্মিক ক্ষতি পুরো খাতকে বহুবিধ ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে।
বাপির মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ওই অগ্নিকাণ্ডের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও ভ্যাকসিনসহ জীবনরক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সামগ্রিকভাবে এ ঘটনার অর্থনৈতিক প্রভাব প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ সময় অগ্নিকাণ্ডের দ্রুত তদন্ত, ক্ষতিপূরণে কার্যকর ব্যবস্থা এবং বিকল্প কার্গো ব্যবস্থাপনা জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।
অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও ক্ষতিপূরণ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে গতকালও ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা ছিল। একটি সূত্র বলেছে, আগুনে পুড়ে যাওয়া বিমানবন্দরের ওই কার্গো ভিলেজটির ছোট একটি অংশের বিমা কাভারেজ রয়েছে ২০ লাখ টাকার।
যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, কার্গো ভিলেজের আমদানি করা পণ্য বা মালামাল সাধারণত যে দেশ থেকে আমদানি করা হয়, সেই দেশেই বিমা সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। ফলে সেসব দেশ থেকে বিমার অর্থ সুবিধা পেতে পারেন ব্যবসায়ীরা।