বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিনিয়োগে খরা চলছে। কঠোর পদক্ষেপ আর নিত্যনতুন কৌশল নিয়েও অন্তর্বর্তী সরকার আয় বাড়াতে পারছে না। আশানুরূপভাবে ব্যয়ও কমাতে পারছে না।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে এবার ঋণের কিস্তি মিলেনি। সবকিছু মিলিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আর্থিক সংকটে আছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হলে বড় অঙ্কের চাপে পড়বে।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আর্থিক সংকটে আছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে নিজের ওপর চাপ বাড়াল। যা সমগ্র অর্থনীতির ওপরই চাপ বাড়বে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতিতে ইতিবাচক ধারা আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে বা অর্থনীতিতে ভালো অবস্থা বিরাজ করছে- এটা বলার মতো পরিস্থিতি হয়নি। সরকারের আয় বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যয় কমাতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ বাড়বে। এই মুহূর্তে বেতন কাঠামো কার্যকর করা খুব জরুরি বলে মনে করছি না।’
অর্থনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, এর আগে বেতন বাড়ানোর সময়ে যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে বেতন বাড়ানো হলে সরকারি চাকরিজীবীদের দুর্নীতি কমবে। আমার প্রশ্ন, আসলেই কি সরকারি চাকরিজীবীদের দুর্নীতি কমেছে?
তিনি আরও বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার মূল্যস্ফীতি বাড়ার হার দুই অঙ্ক থেকে এক অঙ্কে নামিয়ে এনেছে। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতেও বেতন খুব একটা বাড়েনি। অথবা বলা যায়, নিচের পদে বেতন কাঠামো এখনো অনেক কম।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বড় ধরনের আর্থিক চাপে আছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো কার্যকর হলে সরকারের ওপর চাপ অনেক বাড়বে। সরকারের অন্যতম আয় হচ্ছে রাজস্ব আয়। সব ধরনের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি আছে। সরকার অনেক চেষ্টা করেও ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারছে না। তাই রাজস্ব আয় বাড়িয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন খাতে বাড়তি অর্থ যোগাড় করতে পারবে এমন আশা করা ঠিক না।
এরই মধ্যে সম্প্রতি নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার বিষয়ে কী ভাবছে সরকার তা জানতে চেয়ে অর্থ বিভাগকে চিঠি পাঠায় জাতীয় পে-কমিশন। এর উত্তরে অর্থ বিভাগ থেকে জাতীয় পে-কমিশনকে জানানো হয়েছে, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেলে বাস্তবায়নে যে বাড়তি অর্থের চাপ আসবে তা রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে মেটানো সম্ভব। নতুন কাঠামোতে বেতন-ভাতা বাড়ানোর প্রভাব শুধু সরকারের ব্যয় বাড়াবে তা নয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যয় করার মতো আয় আগের তুলনায় বাড়বে। এতে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।’
এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এবং এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব আয় বাড়ানোর চাপে পড়বে সরকার। গত তিন মাসে অর্থাৎ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘাটতি হয়েছে ৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, এ সময় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৯৯ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৯১ হাজার ৫ কোটি টাকা। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের হিসাবে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির পাশাপাশি পৃথকভাবে প্রতি মাসেই রাজস্ব আদায় ছিল গতিহীন। প্রতি মাসেই লক্ষ্যের তুলনায় আদায় হয়েছে কম। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ১১১ কোটি টাকা। এ সময় লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। প্রথম মাসেই রাজস্ব আদায়ে ২ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা ঘাটতি দিয়ে শুরু। অর্থবছরের দ্বিতীয় মাস আগস্টে লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি হয়েছে ৩ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৩৮ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। কিন্তু আদায় হয়েছে ৩৬ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা। ফলে ২ হাজার ৩২২ কোটি টাকার ঘাটতি হয়েছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের বিনিয়োগের পরিস্থিতি ভালো না। তাই রাজস্ব আদায় বাড়বে এমন আশা করে বেতন কাঠামো কার্যকর করা ঠিক হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন ধরনের খরচের চাপে পড়বে সরকার। নির্বাচনি সরঞ্জাম কিনতে হবে। এর সঙ্গে বিভিন্ন ঋণের সুদ আসল পরিশোধের চাপ আছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের চাপ কীভাবে সামলাবে তা ভেবে দেখার বিষয়।’
এরই মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনের খসড়া প্রস্তাব প্রণয়ন করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। প্রস্তাবে গত ১০ বছরের ব্যবধানে বেতন বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে ৯০ থেকে ৯৭ শতাংশ।
জাতীয় পে-কমিশনের সভাপতি সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খান খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘মূল্যস্ফীতির চাপ আছে। আশা করি বেতন বাড়লে সরকারি চাকরিজীবীরা স্বস্তিতে থাকবেন।
প্রস্তাবে গ্রেড-১-এর কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৪ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। ধাপে ধাপে সমন্বয় করে ২০ গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১৫ হাজার ৯২৮ টাকা মূল বেতন নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় বেতন কমিশন।
সম্প্রতি এক বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই গেজেটের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হবে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে। আগামী বছরের শুরুতে এটি কার্যকর হতে পারে।
খোদ কমিশনের খসড়ায়ও বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কারণ বর্তমানে বিনিয়োগের পরিস্থিতি দুর্বল।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, একদিকে বাড়ছে ভর্তুকির চাপ। অন্যদিকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তির চাপ। বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপও প্রায় দ্বিগুণ হতে চলেছে।
তারা আরও বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বাড়ি ভাড়া মূল বেতনের ১৫ শতাংশ করা হয়েছে। চিকিৎসা ভাতা এবং জাতীয়করণের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের আন্দোলন কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।’
চলতি অর্থবছরের মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ৪৩ হাজার ৫৩১ কোটি টাকা এবং ভাতা বাবদ ৪১ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মোট বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দ ৮৪ হাজার ৬৮৪ কোটি টাকা।