ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের তিক্ততা গত দেড় বছরে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে নিরাপত্তা ইস্যুতে সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি হয়েছে।
এ নিয়ে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দফায় দফায় একে অন্যের হাইকমিশনারকে তলব করে। একই সঙ্গে ভিসা সেন্টার বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের শেষ পেরেকটিও অক্ষত ছিল না। তবে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের মতো হাইপ্রোফাইলের মন্ত্রীকে ঢাকা পাঠানোর সিদ্ধান্তটা ছিল চরম উত্তেজনার মধ্যে সম্পর্কের উষ্ণ বার্তা। কিন্তু সর্বশেষ বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার পরিবর্তে আরও জটিল হলো।
মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার পর ভারতে টি-২০ বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ টিমের না খেলার ঘোষণায় দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততা আরও বেড়ে গেল। সম্পর্কের এই টানাপোড়েন এতদিন সোশ্যাল মিডিয়া বা কূটনৈতিক বিবৃতির মধ্যে ঘুরপাক খেলেও এবার তা সরাসরি ক্রিকেটের ওপর পড়ল। আর ক্রিকেটকে ঘিরে এই দফার বিরোধটা দুই দেশের ক্রিকেট সমর্থক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক নাড়া দিয়েছে। ক্রিকেটীয় কূটনীতি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের তিক্ততা নিরসনের অনুষঙ্গ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি এখন ক্রিকেটযুদ্ধে পরিণত হলো, যার নজির এতদিন ছিল ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে।
মোস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক মতাদর্শের অনেকে যেমন খুশি হয়েছেন, তেমনি বাংলাদেশ তাদের বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত থেকে সরিয়ে নিতে আইসিসিকে চিঠি দেওয়ায় বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতা বেড়েছে। বাংলাদেশও বিষয়টি গুরুতরভাবে নেয়। এ কারণে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে আইপিএলের ম্যাচ দেখানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা এখন ক্রিকেটের মাঠ ছাপিয়ে রাজনৈতিক মাঠ গরম করছে। নতুন করে সৃষ্ট এই উত্তাপ আরও কত দূর ছড়াবে, তার হিসাব কষা মুশকিল।
মোস্তাফিজ ইস্যুতে ভারতের ভেতরেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির জোটসঙ্গী জনতা দল ইউনাইটেডের (জেডিইউ) শীর্ষ নেতা কেসি ত্যাগী এ নিয়ে বলেছেন, খেলাধুলার সঙ্গে রাজনীতি জড়ানো উচিত নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ যখন একজন হিন্দু ক্রিকেটারকে জাতীয় দলের অধিনায়ক করতে পারে, তখন ভারতেরও এই সিদ্ধান্ত নতুন করে ভাবা উচিত। বাংলাদেশি ট্যাগ লাগিয়ে মোস্তাফিজকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে বর্তমানে পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত। বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্পর্শকাতর। তার মতে, পাকিস্তান সীমান্তে সন্ত্রাসবাদের ঘটনা এবং বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর হামলার খবর ভারতীয় সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছে।
এর আগে মোস্তাফিজ ইস্যুতে মন্তব্য করেন ভারতের প্রবীণ কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, ক্রিকেটকে রাজনীতির সঙ্গে মেশানো উচিত নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পাকিস্তান নয়। বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী পাঠাচ্ছে না। পরিস্থিতি মোটেও তুলনাযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের মতো নয়। দুই দেশকে এক সরল সমীকরণে ফেলা যায় না।
এ প্রসঙ্গে অল ইন্ডিয়া মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসিও কথা বলেছেন। তিনি বলেন, একটি পক্ষ প্রচার করছে মোস্তাফিজকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, অথচ দিল্লিতে মোদির বোন সেজে থাকা শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর কথা তারা বলছে না।
মোস্তাফিজ ইস্যুতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কোন্নয়নে নতুন মেঘ দেখা দিতেই প্রশ্ন উঠছে এবার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়ে কি না। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমানে যে উত্তেজনা চলছে, তার কোনো প্রভাব দেশের অর্থনীতিতে পড়বে না বলে গতকাল মঙ্গলবার জানান অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
এদিকে প্রশ্ন উঠছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করকে ঢাকা পাঠিয়ে যে বার্তা দিল মোদি সরকার, তার কী হবে? ভারতের এই সিদ্ধান্তটা ছিল সম্পর্কের টানাপোড়েন কাটাতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ভারতের পক্ষ থেকে কাউকে পাঠানো বাধ্যতামূলক না থাকলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠানো ছিল সম্প্রীতির বার্তা। শুধু তা-ই নয়, তার হাত দিয়ে তারেক রহমানকে চিঠিও পাঠালেন নরেন্দ্র মোদি। সেই চিঠিতে আবার তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে এই আশাও করেন যে তার নেতৃত্বেই দুই দেশের গভীর ও ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব গভীরতর হবে। চিঠিতে মোদি বেগম জিয়ার সঙ্গে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের উল্লেখ করে গণতন্ত্র ও দেশবাসীর জন্য তার নেতৃত্ব ও ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং বলেন প্রয়াত নেত্রীর আদর্শ মেনে বিএনপি এগিয়ে যাবে। আগামী দিনে নতুন সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে একসঙ্গে পথচলার ইঙ্গিত দেন জয়শঙ্কর। এই বার্তা যে ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক, সেটা পরিষ্কার।
এ ছাড়া ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং পরদিন দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে প্রয়াত খালেদা জিয়ার জন্য খোলা শোক বইয়ে সই করেন। সেটাও ছিল ভারতের দিক থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে এগিয়ে যাওয়ার আরও এক স্পষ্ট ও ইতিবাচক ইঙ্গিত। ভারত বোঝাতে চেয়েছে, টানাপোড়েন কাটিয়ে স্বাভাবিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে প্রতীক্ষা স্রেফ নির্বাচনের।
তবে মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারে সুর কিছুটা নরম করে আইপিএলের সঙ্গে যুক্ত একজন জ্যেষ্ঠ বিসিসিআই কর্মকর্তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি আমরা মিডিয়া থেকেই জেনেছি। তাকে বাদ দেওয়া নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমাদের কাছ থেকে কোনো মতামতও নেওয়া হয়নি। এমনকি বিষয়টি আইপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়নি।’