দৃষ্টিসীমায় শুধু স্বচ্ছ নীল জলরাশি। সেই সঙ্গে ছিল ঢেউয়ের দুলুনি। যেতে যেতে চোখে পড়ে বেশ কিছু মাছ ধরার ট্রলার এবং দেশি-বিদেশি পণ্যবাহী জাহাজ। উপকূল থেকে গভীর সমুদ্র, সবখানেই দেখা যায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর টহল।
গত ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক জাহাজ ‘বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ’-এ করে বঙ্গোপসাগরের বেশ কিছু এলাকায় চলাচলকালে এমনই দৃশ্য দেখা যায়। এ সময় সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বঙ্গোপসাগরের এই সুনীল অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’র জোনের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মূল দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে নৌবাহিনী। এই বিশাল জলরাশিকে সরাসরি টহল এবং রাডার সিস্টেমের পাশাপাশি নানা প্রযুক্তির মাধ্যমে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- দেশের সমুদ্রসীমার সুরক্ষা এবং সুনীল অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে যাতে করে বাংলাদেশের আগামীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়। এর জন্য সমুদ্রে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আরও বেশি সক্ষমতা ও গবেষণা কার্যক্রম বাড়ানোর বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা।
গত ১৪ জানুয়ারি ‘বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ’-এ করে গভীর সমুদ্র অঞ্চলে চলাচলকালে আলাপ হয় নৌবাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে। তারা খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, সাগরপথে অবৈধ বা চোরাই পরিবহন, মানব পাচার, মাদক চোরাচালান প্রতিরোধ এবং বিদেশিদের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সার্বক্ষণিক নজরদারি ও টহল অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। ‘সি লাইন অব কমিউনিকেশনস’-এর সুরক্ষা, বিদেশি জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল ও দেশের অর্থনৈতিক খাতে অবদান রাখছে নৌবাহিনী। এ ছাড়া ইলিশসহ দেশের মৎস্য সম্পদের সুরক্ষা, নিষিদ্ধকালে মৎস্য আহরণ বন্ধে নৌবাহিনীর কঠোর অবস্থান রয়েছে বলেও জানান উপকূলের বাসিন্দারা।
যেমন দেখা গেছে বঙ্গোপসাগর
টানা দুই দিন উপকূল ও গভীর সমুদ্রে অবস্থানকালে দেখা যায়, বঙ্গোপসাগরের সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, মহেশখালী, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন পয়েন্টে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জাহাজগুলো টহল কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছে। তবে শীতকাল হওয়ায় সাগরের অধিকাংশ অঞ্চল ছিল তুলনামূলক শান্ত। পানির রং ছিল স্বচ্ছ নীল-সবুজ। গত ১৪ জানুয়ারি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে নৌবাহিনীর দুটি এবং কোস্টগার্ডের দুটি জাহাজ নোঙর অবস্থায় দেখা যায়। শাহপরীর দ্বীপ থেকে সেন্ট মার্টিন যাত্রাপথে সমুদ্রের মায়ানমার সীমান্ত এলাকায় বাহিনীর যথেষ্ট টহল চোখে পড়ে। তার মাঝেই দেখা যায় বেশ কিছু মাছ ধরার ট্রলারের অবস্থান।
কেবল এখানেই নয়, যেখানে সাধারণভাবে দৃষ্টি পৌঁছায় না, সেই গভীর সমুদ্রে যাত্রাকালেও নৌবাহিনীর জাহাজের টহল চোখে পড়ে। মাঝেমধ্যে নৌবাহিনীর স্পিডবোট জাতীয় দ্রুতগামী জলযান এবং মেরিটাইম প্যাট্রোল এয়ারক্রাফটের (এমপিএ) নজরদারিও চোখে পড়ে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের স্থানীয় বাসিন্দা কালাম মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই মাছ আহরণ করে বা মৎস্যজীবী। পর্যটন মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা হলেও বছরের বেশির ভাগ সময় মাছ ধরেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। সেই সময়গুলোতে উপকূলে বা গভীর সাগরে আমাদের প্রধান ভরসার জায়গায় থাকে নৌবাহিনী। জেলের নিরাপত্তা, ট্রলার বা জাহাজের সুরক্ষাসহ নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা আমরা নৌবাহিনীর কাছ থেকে পেয়ে থাকি।’
সুনীল অর্থনীতির নিরাপত্তা-সুরক্ষায় নৌবাহিনী
গভীর সমুদ্রে টহলকালে সমুদ্র সম্পদ ও নিরাপত্তার নানা প্রসঙ্গে কথা হয় ‘বানৌজা খালিদ বিন ওয়ালিদ’-এর অধিনায়ক ক্যাপ্টেন আরিফ, নির্বাহী কর্মকর্তা কমান্ডার জাহিদ, গ্যানারি অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোস্তাফিজ ও নেভিগেটিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সামিনের সঙ্গে।
আলাপকালে ক্যাপ্টেন আরিফ খবরের কাগজকে বলেন, সমুদ্র ও উপকূলীয় নিরাপত্তা বাংলাদেশ নৌবাহিনী ‘ব্লু ইকোনমির’ অন্যতম প্রধান ‘স্টেকহোল্ডার’। উপকূলীয় অঞ্চলে এলএনজি সরবরাহ, কারখানা এবং বন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নৌবাহিনীর প্রধান দায়িত্ব। বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে নৌবাহিনীর কন্টিনজেন্ট বা জাহাজগুলো সাগরে ২৪ ঘণ্টা মোতায়েন থাকে।
ক্যাপ্টেন আরিফ আরও বলেন, “সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষায় আমরা ‘সি লাইন অব কমিউনিকেশনগুলোকে’ সব সময় সুরক্ষিত রাখতে কাজ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর চলাচল নির্বিঘ্ন করার জন্য সমুদ্রের বিভিন্ন জায়গায় টহল দেওয়া হচ্ছে। জাহাজগুলো যাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে সে জন্য আমাদের উপস্থিতিটা খুবই দরকার। সে অনুসারেই আমরা কাজ করছি। নৌবাহিনী সমুদ্রে সার্বক্ষণিক নজরদারি অব্যাহত রেখেছে বলেই ‘গুড অর্ডার অ্যাট সী’ বজায় রয়েছে এবং জলদস্যুরা বড় ধরনের কোনো অপতৎপরতা চালাতে পারে না।”
সার্ভে-পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
সরকারি একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র সম্পদের ব্যবহার বাংলাদেশকে যেমন দিতে পারে আগামী দিনের জ্বালানি নিরাপত্তা, তেমনি বদলে দিতে পারে সামগ্রিক অর্থনীতির চেহারা। এমনকি দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে সামুদ্রিক খাদ্যপণ্য রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে মাছ আহরণ আরও অনেক বাড়বে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের ২০০ মিটারের অধিক গভীরতায় অতি পরিভ্রমণশীল মৎস্য প্রজাতি তথা গভীর সমুদ্রে টুনা বা টুনা জাতীয় মাছের প্রাচুর্য রয়েছে। সামুদ্রিক বিভিন্ন জীব থেকে উন্নত প্রসাধনী, পুষ্টি, খাদ্য ও ওষুধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া সমুদ্র নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসের একটি বিশাল ভান্ডার। সমুদ্রের অফশোর অঞ্চলে বাতাসের গতিবেগ বেশি থাকায় সেখানে উইন্ড মিল স্থাপন করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি ‘ক্রুজ শিপ’ ও দ্বীপকে উন্নয়নের মাধ্যমে নিরাপদ ভ্রমণের ব্যবস্থা করতে পারলে এই পর্যটন খাতটি দেশের আয়ের প্রধান উৎস হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিদ্যা (ওশনোগ্রাফি) বিভাগের চেয়ারম্যান ড. আবু হেনা মুহাম্মদ ইউসুফ খবরের কাগজকে বলেন, “বঙ্গোপসাগরের আয়তন প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা অনেকটা বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি। এই বিশাল সমুদ্র অঞ্চলের খুবই অল্প পরিমাণ এলাকা ব্যবহৃত হচ্ছে। অধিকাংশ জায়গা ‘আনটাচ’ অবস্থায় রয়ে গেছে। আমরা বিভিন্ন গবেষণা ও বাস্তবতায় দেখতে পাচ্ছি, বঙ্গোপসাগরে অনেক বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এতে রয়েছে পর্যাপ্ত মৎস্য ও খনিজ সম্পদ। এমনকি বিভিন্ন দ্বীপকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনের ব্যাপক বিকাশ ঘটানো যায়। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে আরও বন্দর সৃষ্টি করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপ্লব ঘটবে। কেননা, শুধু চট্টগ্রাম বন্দর থেকেই দেশের যে পরিমাণ জিডিপি আসছে তা বিস্ময়কর। গত ৫০ বছরের চিত্র পাল্টে দিয়েছে গত এক বছরের আয়। ফলে এসব সুযোগ-সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো অত্যন্ত জরুরি। তার জন্য প্রয়োজন সাগরে বাস্তবসম্মত সার্ভে (গবেষণা), সঠিক পরিকল্পনা এবং সে অনুসারে বাস্তবায়ন।”
ড. আবু হেনা মুহাম্মদ ইউসুফ বলেন, “বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বাস্তবতার কারণেই একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। সমুদের সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা, মৎস্য সম্পদ, বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষা এবং সর্বোপরি দেশের জলসীমা রক্ষায় তাদের ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু এখানেই তাদের সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না, আরও বেশি কাজে লাগাতে হবে। অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ এবং বিভিন্ন দেশে সমুদ্র গবেষণাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পর্যায়ে সেসব দেশের নৌবাহিনীর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশেও আমাদের নৌবাহিনীকে সমুদ্র গবেষণা বা সার্ভেসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। পাশাপাশি অন্য আরও যারা যেখানে অভিজ্ঞ-বিশেষজ্ঞ তাদের দিয়ে যথাযথ স্থানে দায়িত্ব পালন করাতে পারলে সত্যিকার অর্থেই ‘ব্লু ইকোনমি’র মাধ্যমেই দেশের অর্থনৈতিক চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব।”
বিভিন্ন দেশের ব্লু ইকোনমির চিত্র
বিভিন্ন প্রকাশনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয় সামুদ্রিক পরিবহনের মাধ্যমে। এতে বাণিজ্যিক পরিবহন খরচ যেমন তুলনামূলক অনেক কম হয়, তেমনি নিরাপদও। সারা বিশ্বেই ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতির বিকাশ ঘটছে। বিভিন্ন ছোট-বড় দেশ ব্লু ইকোনমিনির্ভর উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করছে। যেমন: ইন্দোনেশিয়ার জাতীয় অর্থনীতির বেশির ভাগ সমুদ্র সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭৪ সালে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ক্ষেত্রে প্রথমে ব্লু ইকোনমির অবদান পরিমাপ করার চেষ্টা করে।
অস্ট্রেলিয়া ২০১৫-২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্লু ইকোনমি দশক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সেই অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে ব্লু ইকোনমির অবদান ১০০ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলার নির্ধারণ করা হয়। চীনের অর্থনীতিতেও সমুদ্রকেন্দ্রিক শিল্প-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা চীনের জিডিপির ১০ শতাংশের বেশি। তারা বলছে, আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ জিডিপিতে মেরিন সেক্টরের অবদান হবে ১৫ শতাংশ। এর বাইরেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), আয়ারল্যান্ড, মরিশাস, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ এখন ব্লু ইকোনমির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা তথা সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রতি তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য সমুদ্রে নিয়োজিত নৌবাহিনীসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা বা দপ্তরকে আরও বেশি সক্ষমতা দিয়ে গড়ে তোলারও আহ্বান জানাচ্ছেন তারা।