গত বছরের ২২ ডিসেম্বর ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বিষয়ে সারা দেশে প্রচারের লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করেছে ১০টি ভোটের গাড়ি ‘সুপার ক্যারাভান’। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত থেকে ফিতা কেটে ভোটের গাড়ির উদ্বোধন করেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
সেদিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে আপনি আরও একটি ভোট দেবেন। জুলাই সনদে ভোট দেবেন। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দিনের পর দিন বৈঠক করে এই সনদ তৈরি হয়েছে। এই সনদ দেশের মানুষ পছন্দ করলে দেশ আগামী বহু বছরের জন্য নিরাপদে চলবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। আপনি যদি এই সনদ সমর্থন করেন, তবে গণভোটে অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন।’
গত ১১ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইয়ার ইয়াবস। সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোটের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ক্যাম্পেইন করছে ও করবে এবং এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করবে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনি পরামর্শ নিয়েছিল এবং টপ লিগ্যাল এক্সপার্টরা লিখিতভাবে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোট চাইতে পারে। এ বিষয়ে কোনো আইনি প্রতিবন্ধকতা নেই। প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, আইনি বাধা না থাকায় ‘হ্যাঁ’ প্রচার চালাবে সরকার।
এর কয়েক দিন পর ১৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি ভিডিও বার্তা প্রচার করা হয়। বার্তায় তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। গণভোটে আপনি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে বৈষম্য, শোষণ আর নিপীড়ন থেকে মুক্ত হবে বাংলাদেশ।’
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে। সরকার ইচ্ছামতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না। গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে হবে। এর পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সব উপদেষ্টা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে থাকেন।
১৯ জানুয়ারি নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে গণভোট সম্পর্কিত মতবিনিময় সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বস্ত্র ও পাট এবং বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেন, “আমরা যদি গণভোট ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত না করতে পারি, তাহলে ক্যানসার হয়ে যাবে। শুধু পালিয়ে যাওয়ার শক্তি ছাড়া সব রাজনৈতিক দলই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ চায়। ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় না হলে নাগরিক হিসেবে আমরা ঠকে যাব।”
১৬ জানুয়ারি নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা মিনি স্টেডিয়াম পরিদর্শনকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, গণভোটে মানুষের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি গণভোট সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার দায়িত্ব গণমাধ্যমেরও রয়েছে। তিনি নিজেও বিভিন্ন জেলায় গিয়ে গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরছেন বলে জানান।
২০ জানুয়ারি ঢাকার সাভারের রেডিও কলোনি এলাকায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে প্রচারমূলক কার্যক্রম ‘ভোটের রিকশা’র উদ্বোধন শেষে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “আমরা এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই না, যেখানে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। আমরা এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত চাই না, যেখানে জনগণের মুখোমুখি হয়ে উত্তর দেওয়ার সাহস থাকবে না, সদুত্তর দেওয়ার সাহস থাকবে না। কাজেই আমরা ব্যক্তি বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে, দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে, দেশের স্বার্থে গণভোটকে ‘হ্যাঁ’ বলব।”
২৩ জানুয়ারি রংপুর সফরে গিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, শিল্প এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত শক্তি ও যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগী, তারাই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। যারা ফ্যাসিবাদের সহযোগী, গণমানুষের প্রতিপক্ষ গণভোট নিয়ে তাদের অন্য চিন্তা রয়েছে। দেশের জনগণ ও জনতার জোয়ার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে।
২৭ জানুয়ারি রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে ‘গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক এক সভায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “আপনারা যদি চান যে বহু জাতিগোষ্ঠী, বহু ধর্মের স্বীকৃতি বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে থাকুক, তাহলে আমাদের সবার দায়িত্ব হচ্ছে ‘হ্যাঁ’ ভোটকে বিজয়ী করা। এটি আমাদের করতে হবে। কারণ আমরা এই স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে চাই।”
২৪ জানুয়ারি মাদারীপুরে ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন শেষে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুসংহত হোক, অনেক দৃঢ়তর হোক, এ জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়া জরুরি।
গতকাল ২৯ জানুয়ারি বাসাবোর ধর্মরাজিক বৌদ্ধ মহাবিহারে গণভোটে ‘হ্যা’র পক্ষে প্রচারে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে দেশে আর কখনো স্বৈরাচার সরকারের আগমন ঘটবে না। ক্ষমতায় গেলে অনেকে ছলেবলে-কৌশলে চেয়ার আঁকড়ে ধরে সংবিধান পরিবর্তন করে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জিতলে এই সিস্টেমের পরিবর্তন ঘটবে।
সর্বশেষ নির্বাচন কমিশন গতকাল গণভোটে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের হ্যাঁ বা না-এর পক্ষে প্রচার চালানো দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে।