বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আজ। গত তিনটি নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে ছিল চরম অসন্তোষ। বিপুলসংখ্যক ভোটার সেই নির্বাচনগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। বিগত দেড় বছর অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে চলা নির্বাচন নিয়ে টানা অস্থিরতা, অনাস্থা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর জনগণের রায়ের দিন আজ। জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একই সময়ে রাষ্ট্র সংস্কারের ইস্যুতে গণভোটেও রায় দেবেন দেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটার। ভোট গ্রহণ শুরু হবে সকাল সাড়ে ৭টায়, চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার সময় কেন্দ্রের চৌহদ্দিতে অপেক্ষমাণ সব ভোটারের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকবে। গতকাল রাতেই সারা দেশের ভোটকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানো হয়েছে সংসদ ও গণভোটের ব্যালট পেপার।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হচ্ছে। ফলে একজন ভোটার এবার আলাদা ব্যালটে দুটি ভোট দেবেন। সংসদ নির্বাচনের ব্যালট সাদাকালো–এই ব্যালটের ভোটে তিনি সংসদ সদস্য বেছে নেবেন। গণভোট হবে গোলাপি ব্যালটে। এই ব্যালটে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে ‘হ্যাঁ/না’ ভোটে মতামত জানাবেন দেশের জনগণ। এবারের ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত। একসময়ের জোটসঙ্গী বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আজ মুখোমুখি প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্যে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন ঘিরে তাই প্রশ্ন একটাই, শেষ পর্যন্ত কার দিকে ঝুঁকবে ভোটের পাল্লা? ধানের শীষে, নাকি দাঁড়িপাল্লায়?
একসঙ্গে দুটি ভোট আয়োজন নিয়ে এবার বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ইসি ও অন্তর্বর্তী সরকার। তবে নির্বাচন কমিশনের দাবি, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো, প্রস্তুতি সম্পন্ন, নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা পুরো দেশ। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, ভোটের জন্য তৈরি করা প্রায় ৫০ শতাংশ কেন্দ্র ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সারা দেশে মোতায়েন রয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৫৮ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রোন ও ইউএভি এবং বডি ওর্ন ক্যামেরা। ৯০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রে থাকছে সিসিটিভি ক্যামেরা।
ভোট গ্রহণে প্রস্তুত ইসি
শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুতে ওই আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ফলে ওই আসনটি বাদে আজ ২৯৯টি আসনে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। সংসদীয় আসনগুলোতে ভোটের মাঠে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৪ শতাংশ। ইসির তথ্যমতে, এবার সারা দেশে মোট ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ, যার মধ্যে নারী ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন। এসব আসনে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ২ লাখ ৪৫ হাজারেরও বেশি ভোটকক্ষ তৈরি করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের তালিকার শীর্ষে রয়েছে ঢাকা।
জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বিশেষ এক পরিস্থিতির মধ্যে এবারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাই বাড়তি নজর বা কৌতূহল রয়েছে সবখানে। সারা বিশ্ব নজর রাখছে বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে। ফলে সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক ভোট বা নির্বাচন সম্পন্ন করার বিষয়ে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে ইসি তথা অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচনের মাঠে প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। এর বাইরেও জাতীয় পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল এককভাবে ভোটে অংশ নিয়েছে।
ভোটের লড়াইয়ে প্রধান দুই দলের অবস্থান
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে এ দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত দল বিএনপি। নির্বাচনের আগে সাম্প্রতিক বেশ কিছু জরিপেও বিএনপি ভোটের মাঠে এগিয়ে রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রস্তুতি বেশ জোরালো। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি দুই মাসে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জরিপে জামায়াতের সম্ভাব্য ভোট ১২ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। বিশেষ করে নগরের তরুণ ভোটার ও কিছু উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলে তাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। সাম্প্রতিক একটি জরিপে জামায়াতকে বিএনপির খুব কাছাকাছি দেখানো হলেও বড় স্যাম্পলভিত্তিক ইএএসডির জরিপে জামায়াতের সম্ভাব্য আসন প্রায় ৪৫-৫০-এর মধ্যে সীমিত বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় রাজনীতি, দুর্নীতিবিরোধী ইমেজ ও তরুণ ভোটারদের একটি অংশ জামায়াতের দিকে ঝুঁকলেও নারী অধিকার ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দলটির জন্য নেতিবাচক ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করতে পারে। এই নির্বাচনে বিগত সব নির্বাচনের তুলনায় জামায়াতের ভোট বাড়তে পারে। তবে তা সরকার গঠনের মতো পর্যাপ্ত হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় যথেষ্ট বড়।
ভোটের মাঠে দল বা জোট
বিএনপির নেতৃত্বাধীন দল ও জোট চ্যালেঞ্জ ছুড়েছে জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন দল বা জোটগুলো হলো বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরাম, জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), গণতন্ত্র মঞ্চের নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী জনশক্তি পার্টি, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) নেতৃত্বাধীন ১২-দলীয় জোট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের ১১টি দল ও গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য। তবে শেষ মুহূর্তে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামও যুক্ত হয়েছে এই জোটে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মোট ১১টি দল নিয়ে জোটবদ্ধভাবে ভোটে অংশগ্রহণ করছে। দলগুলো হচ্ছে জুলাই অভ্যুত্থানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রের্টিক পার্টি (এলডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ লেবার পার্টি।
আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট
দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত ভোটারদের জন্য এবারই প্রথম চালু করা হয়েছে আইটি সাপোর্টেড পোস্টাল ব্যালট-ব্যবস্থা। গতকাল বুধবার পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছেছে ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬২ পোস্টাল ব্যালট পেপার। বাকি ব্যালটগুলো ট্রানজিটে রয়েছে।
পর্যবেক্ষক ও সংবাদকর্মীর রেকর্ড উপস্থিতি
এবারের নির্বাচনে ভোট পর্যবেক্ষণে নিবন্ধিত হয়েছেন ৪৫ হাজার ৩৩০ জন দেশি পর্যবেক্ষক। বিদেশি পর্যবেক্ষক সাড়ে ৫০০-এর বেশি। ইসির বিশেষ অতিথি হয়ে আসবেন ৫৭ জন বিদেশি। ভোটের মাঠে সংবাদকর্মী থাকবেন প্রায় ৯ হাজার ৭০০ জন। বিদেশি সাংবাদিক এসেছেন ১৫৬ জন। নির্বাচন কমিশনের মতে, এই বিপুল পর্যবেক্ষণ কাঠামো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।