বাংলাদেশ বেতারকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এ এস এম জাহীদ। তার বিরুদ্ধে নিলাম ছাড়াই সরকারি সম্পদ বিক্রি, দরপত্র ও বদলি-বাণিজ্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এ এস এম জাহীদ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের একজন সুবিধাভোগী কর্মকর্তা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিভিন্ন দেশ সফর করা এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ভোল পাল্টানোর চেষ্টা করছেন, চেষ্টা করছেন তার দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে এ এস এম জাহীদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়কে দুটি চিঠি দিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৯ জানুয়ারি অতিরিক্ত সচিব (গ্রেড-১) মো. ইয়াসীনকে সভাপতি/আহ্বায়ক করে দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। কমিটির অপর সদস্য তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা মো. নিজামুল কবীর।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলে আগারগাঁও সদর দপ্তর থেকে দুটি গাড়ি, জেনারেটর, সম্প্রচার টাওয়ারের অংশ, মূল্যবান যন্ত্রাংশ, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের ব্রোঞ্জ নির্মিত ম্যুরালের অংশবিশেষও প্রকাশ্য নিলাম ছাড়াই নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় অর্ধকোটি টাকা। বিশেষজ্ঞ মতামত না নিয়েই মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার একতরফা ‘কনডেম’ ঘোষণা না করে গভীর রাতে ডিজি এ এস এম জাহীদের সিন্ডিকেট গোপনে বিক্রি করে দেয় বলে অভিযোগও রয়েছে। পাশাপাশি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বাংলাদেশ বেতারের অধীনে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার কেনা হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) এ এস এম জাহীদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘ফলস বিষয় নিয়ে জানতে চাইছেন।’ তিনি বলেন, ‘তদন্ত দুদকে আছে বা মন্ত্রণালয়ে আছে, সেখানে খোঁজ নিন।’
জানা গেছে, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল একটি ট্রাক বেতার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে মালামাল লোড করার সময় ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। দরদাম নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। পরে বিক্রি স্থগিত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তার আগেই বেশ কিছু মালামাল সরিয়ে ফেলেন ডিজির প্রশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেতারের ঊর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, এসব অভিযোগের বিষয়ে নামমাত্র অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, বাস্তবে যা ছিল কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্টদের চোখে ধুলো দেওয়ার (আইওয়াশ) চেষ্টা। বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য যদিও পরে ‘ব্যাক ডেটে’ নথি তৈরি করে পুরো প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে ডিজি ও অভিযুক্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ওই কর্মকর্তারা জানান, মহাপরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর সদর দপ্তরে কক্ষ সংস্কার, আসবাবপত্র ক্রয়, এসি স্থাপন ও সভাকক্ষ আধুনিকায়নের নামে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ঘনিষ্ঠ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই কাজগুলোর সবকিছুই করা হয়েছে। এসব কেনাকাটা, কক্ষ সংস্কার প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট দরপত্রের অস্বাভাবিক দর নিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ বেতারের প্রকৌশল ও প্রশাসনিক শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, আগারগাঁও বেতার ভবন চত্বরে ব্যাডমিন্টন কোর্ট নির্মাণ করতে গিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে একাধিক বড় গাছ, যা আইন ও রীতি-বিরুদ্ধ বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগের তালিকায় আরও আছে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের ব্রোঞ্জ নির্মিত ম্যুরাল অপসারণ ও অংশবিশেষ বিক্রির চেষ্টা করা হয়। বেতারের প্রধান ভবনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে এ বিষয়ে তীব্র আপত্তি ও ক্ষোভ থাকলেও ডিজির ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে যোগদানের পর অল্প সময়েই প্রায় ১৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই বদলির পেছনে মোটা অঙ্কের লেনদেন হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে ‘নিজস্ব লোক’ বসিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এ এস এম জাহীদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া বেতারের খুলনা, বান্দরবান, কক্সবাজার ও সিলেট কেন্দ্র থেকে গাড়ি এনে ঢাকায় পছন্দের কর্মকর্তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি যানবাহন ব্যবস্থাপনা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তদন্তের অগ্রগতি ও সুপারিশের বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব মো. ইয়াসীন খবরের কাগজকে বলেন, কমিটি তদন্ত করছে। এখনো প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়নি। তবে শিগগিরই এই বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।