বহুল আলোচিত ‘ওয়ান-ইলেভেন’ বা এক-এগারোর সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নানা ভূমিকা নিয়ে রিমান্ডে প্রশ্নের মুখে পড়ছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। পল্টন থানার মানবপাচারের একটি মামলায় পাঁচ দিনের রিমান্ডে থাকলেও প্রথম দিন বারবার ওয়ান-ইলেভেনের ভূমিকা নিয়েই জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়েন জেনারেল মাসুদ। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো জবাব দেননি। অন্য সব প্রশ্ন সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব হিসেবে পরিচিত সেনা কর্মকর্তা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ফেনী-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। গত সোমবার গভীর রাতে রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএসের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি। পরে গত মঙ্গলবার পল্টন থানার মানব পাচারের একটি মামলায় তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এদিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়ে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মাসুদকে গ্রেপ্তার দেখাতে গতকাল বুধবার আদালতে আবেদন জানায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ আবেদনের ওপর শুনানির জন্য আগামী ৯ এপ্রিল তারিখ ধার্য করেছেন ঢাকার সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক মঈনউদ্দীন চৌধুরী।
প্রায় ১৯ বছর আগের বহুল আলোচিত ‘এক-এগারো’র এই প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তাকে রিমান্ড নেওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থক থেকে শুরু করে অনেক সাংবাদিকও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। অনেকেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সে সময়ে আটক ও নির্যাতনের বিষয়গুলো নিয়ে পোস্ট দেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। রিমান্ডের প্রথম দিন গতকাল যতটা না মানব পাচারের মামলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন করা হয় ওয়ান-ইলেভেনে তার ভূমিকা নিয়ে। কেননা সেনা নিয়ন্ত্রণ ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন জেনারেল মাসুদ, যাকে ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম কুশীলব বলা হয়ে থাকে। তবে মাসুদ উদ্দিন সুকৌশলে প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গেছেন। নির্দিষ্ট কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য বা বক্তব্য দিয়েছেন মাসুদ। ওয়ান-ইলেভেনের সেনা শাসনের বিষয়ে তিনি কোনো কথাই বলেননি। তার পরও জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছেন ডিবি পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা।
এর আগে গত মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রিমান্ড শুনানিতে পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আসামির উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘তিনি (মাসুদ উদ্দিন) মাইনাস টু ফর্মুলার নামে জিয়া পরিবারকেই শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস। যাকে (তারেক জিয়া) টর্চার করে হত্যা করতে চেয়েছিল, তিনিই এখন দেশের প্রধানমন্ত্রী।’
গত মঙ্গলবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিবি পুলিশ জানায়, মানব পাচার, অর্থ পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ফেনী জেলায় বিচারাধীন তিনটি মামলায় তিনি পলাতক ছিলেন। এ ছাড়া ডিএমপিতে পাঁচটি মামলাসহ মোট আটটি মামলা তদন্তাধীন। অন্যদিকে মাসুদের বিরুদ্ধে দুদক এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগেও (সিআইডি) অর্থ পাচারের একাধিক অভিযোগে তদন্ত চলছে।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (ওয়ান-ইলেভেন) এক জরুরি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের যাত্রা শুরু হলে ওই সময়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন ছিলেন ক্ষমতার নেপথ্যের একজন প্রভাবশালী সামরিক কর্মকর্তা। পটপরিবর্তনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা বা কুশীলব বলে মাসুদের নাম বেশ আলোচিত। সে সময়ে তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের (সাভার) জিওসি। মূলত জেনারেল মাসুদ ডিজিএফআইকে সঙ্গে নিয়ে সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকারের পুরো পরিকল্পনা সাজিয়েছিলেন। ওই সময়ের সেনাপ্রধান মইন ইউ আহমেদ শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় থাকলেও পরে তিনিও সেই পরিকল্পনায় যুক্ত হন বলে আলোচনা শোনা যায়।
অন্যদিকে পটপরিবর্তনের পর ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় কমিটির’ সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করে প্রায় সবকিছুতেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কলকাঠি নাড়তেন জেনারেল মাসুদ। বলা হয়ে থাকে, ওই সময়ের শীর্ষ রাজনীতিকদের গ্রেপ্তার-নির্যাতন, দুই নেত্রীর (খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা) জন্য বিশেষ কারাগার, শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে যাওয়া, দুর্নীতির মামলা দেওয়াসহ সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার নাম। পরে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেও জেনারেল মাসুদ ছিলেন বহাল তবিয়তে, বরং কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন, সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়া এবং মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবেও যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন মাসুদ।
‘ওয়ান-ইলেভেনসংক্রান্ত বই ‘এক-এগারো’র লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদও তার বইয়ে উল্লেখ করেছিলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ওই সময়ে যে কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা খুবই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন তিনি।’