নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে। বিশ্লেষণ চলছে–বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা বা রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সরকারের অভ্যন্তরে প্রভাব সৃষ্টিকারী অদৃশ্য এই শক্তির ‘প্ল্যাটফর্ম বা নেটওয়ার্ক’ নিয়ে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত বক্তব্য দেওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি এখন আলোচনার তুঙ্গে রয়েছে।
প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তবে কি রাষ্ট্রের ভেতর আরেকটি রাষ্ট্রের কাঠামো কাজ করেছে বা করছে?
ডিপ স্টেট কী, এর কাঠামো বা লক্ষ্য উদ্দেশ্য কী–অনেক সাধারণ মানুষের কাছে তা নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট কৌতূহল। অনেকে ডিপ স্টেট বলতে ছায়া সরকার বা শাসন কাঠামোকে নিয়ন্ত্রণকারী নেটওয়ার্ক হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন, যারা ক্ষমতাধর ‘অদৃশ্য’ শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
অন্যদিকে ‘ডিপ স্টেট’ বলতে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘবদ্ধ ক্ষমতাধর শক্তিকে বোঝানো হয়ে থাকে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অধ্যাপক গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, সাধারণত আমেরিকার ভেতরে একধরনের গোপন ক্ষমতাধর কাঠামো রয়েছে, যাদের সরকারের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ক্ষমতাধর ধনকুবের ব্যবসায়ী বা বিলিয়নিয়ার, প্রভাবশালী মিডিয়ার মালিক, আমলা, প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্তাব্যক্তিসহ এজাতীয় প্রভাবশালী মহলের সম্মিলিত অদৃশ্য শক্তিশালী কাঠামোর ধারণাকে ডিপ স্টেট বলা হয়ে থাকে। এই ডিপ স্টেট সাধারণত রাষ্ট্রক্ষমতা বা সরকারকে নিয়ন্ত্রণে কাজ করে থাকে। এরা কখনো কখনো এতটা ক্ষমতাধর হয়ে থাকে যে, ডিপ স্টেটই ঠিক করে দেয় কারা সরকার গঠন করবে, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন বা কাকে কোথায় বসাতে হবে। এমনকি এই ‘ডিপ স্টেট’ অনেক সময় কোনো কোনো দেশে ‘রেজিম চেঞ্জেও’ (সরকার বা শাসনক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের মতো বিষয়) ভূমিকা রাখে।
মূলত, বিভিন্ন স্বার্থ হাসিল করার জন্য এই ডিপ স্টেট কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই ডিপ স্টেট যেমন জোরালোভাবে কাজ করে, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এর তৎপরতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
অতি সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তার আগে আরেক সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ডিপ স্টেটের তৎপরতার কথা প্রকাশ্যে বললেও এটি কে বা কারা, সে বিষয়ে দুজনের কেউই স্পষ্ট করেননি। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে ‘ডিপ স্টেট’-এর প্রস্তাবের কথা জানিয়ে সজীব ভূঁইয়ার বক্তব্য দেওয়ার পর বিভিন্ন মহলে ব্যাপক কৌতূহল বা আলোচনা দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও যোগাযোগ নিশ্চিত করা যায়নি।
তবে ডিপ স্টেট নিয়ে সাবেক ওই দুই উপদেষ্টার বক্তব্যের বিষয়ে আলাপকালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘তারাও (নাহিদ ও সজীব ভূঁইয়া) হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের ডিপ স্টেটকে ইঙ্গিত করে থাকতে পারেন। তবে বিষয়টি তারাই স্পষ্ট বা সঠিকভাবে বলতে পারবেন।’
এদিকে ‘ডিপ স্টেট’ শুধু যুক্তরাষ্ট্রে বা বাংলাদেশে নয়, প্রায় সব দেশেই তৎপর রয়েছে বলে মনে করেন সামরিক বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) স ম মাহবুব-উল-আলম। গতকাল তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিগত কয়েকটি নির্বাচনেও আমরা দেখেছি সংসদে ব্যবসায়ীদের আধিক্য বা আধিপত্য। তার আগে ‘এক-এগারো’র কুশীলব যারা ছিলেন এবং তারা যাদের ধরে আনতেন বা যেভাবে সরকার নিয়ন্ত্রণ করত, সেটাও ডিপ স্টেট তৎপরতা। এখানে গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনী, আমলা, শীর্ষ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মিলে সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়টি মূলত ডিপ স্টেট হিসেবেই কাজ করেছে। আমেরিকাতেও ডিপ স্টেট এখন প্রকাশ্যে কাজ করে। মূল সমস্যা, এখন কোনো দেশেই যথাযথ গণতন্ত্র নেই। সে কারণেই ডিপ স্টেটের আধিপত্য বাড়ছে। তবে ডিপ স্টেট আগেও ছিল, এখনো রয়েছে, শুধু একেক দেশে একেক রকমভাবে দেখা যায়। এ ছাড়া গণমাধ্যমের প্রসারের কারণে এখন হয়তো এটি বেশি আলোচিত হচ্ছে।’
ডিপ স্টেটের কাঠামো কেমন
ডিপ স্টেট কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার ওপর ভিত্তি করে গঠিত হয় না, বরং এটি বিভিন্ন শক্তিশালী মহলের সমন্বিত নেটওয়ার্ক বা প্ল্যাটফর্ম। এর মধ্যে যুক্ত থাকে–প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনী (যারা জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করে), আমলা চক্র, ক্ষমতাধর বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী, অস্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মালিক, করপোরেট লবিস্ট, প্রভাবশালী গণমাধ্যমের (মিডিয়া) মালিক বা নীতিনির্ধারকসহ এমন বেশ কিছু ক্ষমতাধর মহল। এই সম্মিলিত বা সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক মূলত ‘ডিপ স্টেট’ কাঠামো হিসেবে পরিচিত।
ডিপ স্টেট কোথায় কীভাবে কাজ করে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী
এটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে পরিচালিত হয়। সাধারণ জনগণের কাছে ডিপ স্টেটের কোনো জবাবদিহি থাকে না। যে দলই নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করুক, ডিপ স্টেট তাদের নিজস্ব দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বা স্বার্থ যেমন–নির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি বা বাণিজ্যিক স্বার্থ বজায় রাখতে কাজ করে।
তারা প্রভাব বিস্তার করতে বা সরকারকে বাধ্য করতে সরকারের ভেতরে তথ্য ফাঁস করা, অসহযোগিতা করা বা বিশেষ কাউকে ক্ষমতায় বসানোর মাধ্যমে ডিপ স্টেট সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে।
ডিপ স্টেট ধারণাটি প্রথমে ১৯৯০-এর দশকে তুরস্কে (ডেরিন ডিভ্লেট নামে) পরিচিতি পেলেও পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এর তৎপরতা দেখা দেয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশেই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বা সরকার পরিবর্তন কিংবা নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় ডিপ স্টেট গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যে কারণে বর্তমানে আলোচনায় ডিপ স্টেট
প্রসঙ্গত, ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বক্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতূহল তৈরি হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বিশেষ আলোচনা সভায় আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা যখন সরকারের দায়িত্বে ছিলাম শুরুর দিকে আমাদের বিভিন্ন শক্তিশালী ইনস্টিটিউশন, যাদের আসলে ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়, তাদের থেকে আমাদের অফার (প্রস্তাব) করা হয়েছিল যে আপনারা শেখ হাসিনা সরকারের যে মেয়াদ আছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, সেটা শেষ করেন। আমরা আপনাদের সহযোগিতা করি।’
আসিফ মাহমুদ এ বিষয়ে আরও বলেন, ‘তাদের (ডিপ স্টেট) সার্টেইন কিছু শর্ত ছিল, তাদের কিছু কিছু জায়গায় ফ্যাসিলিটেটেড (সুবিধা দেওয়া) করা। তারা পুরো রোডম্যাপও করে নিয়ে আসছিল যে বিএনপির নেতাদের তো সাজা আছে; তো সাজা থাকলে সাধারণভাবে নির্বাচন দিলেও তারা নির্বাচন করতে পারবে না। তো তাদের সাজাগুলো আদালতের মাধ্যমে লেংদি (দীর্ঘায়িত) করে, আপনারা তো জানেন, সেটা কীভাবে করা যায়।’
আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা কিন্তু সেটাতে সায় দিইনি। আমরা সব সময় গণতন্ত্রকেই সামনে রেখেছি এবং সেটার প্রতি কমিটমেন্ট অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল বলেই নির্বাচনটা হয়েছে।’
অন্যদিকে এনসিপির আহ্বায়ক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম গত ১০ মার্চ রাজশাহীতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনে জড়িত ছিল ‘ডিপ স্টেট।’ তিনিও ডিপ স্টেট কারা, সেটা স্পষ্ট করে বলেননি।
অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পালিয়ে যাওয়া একাধিক সাবেক মন্ত্রী বা নেতার মুখেও তাদের পতনের নেপথ্যে ‘ডিপ স্টেটের’ ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ করেন।