অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বহুল আলোচিত গণভোট অধ্যাদেশ বাতিল হতে পারে। সংসদীয় বিশেষ কমিটির সাম্প্রতিক বৈঠক থেকে এমন ইঙ্গিত মিলেছে। ইতোমধ্যে কমিটির কাছে অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে। আর এ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়েছে।
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দল বিএনপি অধ্যাদেশটি বাতিলের প্রস্তাব করেছে। তবে এতে তারা আপত্তি জানিয়েছে। আর সরকারি দল বলছে, অধ্যাদেশটি বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, আলোচনা চলছে। ফলে বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ এবং সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে গণভোটের ভবিষ্যৎ। বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন জানিয়েছেন, গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে এখনো তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি, তবে আলোচনা চলমান। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, চলতি সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে পাস না হওয়া অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যাবে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ কমিটি এখন পর্যন্ত ১১৩টির বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। তবে গণভোটসহ বাকি ২০টি অধ্যাদেশ নিয়ে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। কমিটির পরবর্তী বৈঠকে অধ্যাদেশগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সূত্রমতে, পরিস্থিতি এমন যে গণভোট, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, পুলিশ কমিশন, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ নিয়ে শেষ মুহূর্তে বিতর্ক তৈরি হতে পারে, যা সংসদ পর্যন্ত গড়াতে পারে। সংসদ সচিবালয়ের তথ্যমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোর ব্যাপারে আজ রাত সাড়ে ৮টায় আবার বৈঠকে বসবে বিশেষ কমিটি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি এ পর্যন্ত দুটি বৈঠক করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র খবরের কাগজকে জানিয়েছে, গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ বৈঠকে কমিটির একাধিক সদস্য গণভোট অধ্যাদেশটি সরাসরি বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তাদের যুক্তি, এই অধ্যাদেশটি সংবিধানের বিদ্যমান কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার অতিক্রম করে প্রণীত।
গত বুধবার বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গণভোট অধ্যাদেশটি নিয়ে আমাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কিছু সদস্য এটি বাতিলের পক্ষে মত দিয়েছেন, আবার কেউ কেউ বিষয়টি আরও বিশদভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পক্ষে। আমরা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাইনি, তবে আলোচনা চলমান রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, কমিটি চাইছে সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও আইনি ভিত্তিসম্পন্ন সুপারিশ সংসদে উপস্থাপন করতে।
গণভোট অধ্যাদেশ নিয়ে সংসদেও উত্তপ্ত বিতর্ক দেখা দিয়েছে। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের অধ্যাদেশ জারির কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। সরকারি দলের একাধিক সদস্যের ভাষ্য, ‘গণভোট আয়োজনের বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এটি কোনো অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে নির্ধারণ করতে পারে না। এটি স্পষ্টতই এখতিয়ারবহির্ভূত।’
অন্যদিকে বিরোধী দল এই অবস্থানের তীব্র বিরোধিতা করে বলছে, গণভোট জনগণের মতামত গ্রহণের একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এবং এটি বাতিলের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে।
বিশেষ কমিটির বৈঠকের পর জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য এবং বিরোধী দলের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের জানান, গণভোট অধ্যাদেশ বাতিলে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে তারা আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোনো অধ্যাদেশ এখতিয়ারবহির্ভূত কি না, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। সংসদীয় কমিটি বা সরকার একতরফাভাবে সেটি বাতিল করতে পারে না। প্রয়োজনে বিষয়টি বিচার বিভাগে গড়াতে পারে।’
গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও রয়েছে মতভেদ। এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক খবরের কাগজকে বলেছেন, বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান সীমিত এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে প্রয়োগযোগ্য। অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের অধ্যাদেশ জারি করা স্বাভাবিকভাবেই সাংবিধানিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।’
তার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের আইন প্রণয়নের ক্ষমতার সীমা কোথায়। যদি সেটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো স্পর্শ করে, তাহলে তা বিচারিক পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের মতে, গণভোটকে পুরোপুরি অস্বীকার করা ঠিক হবে না, বরং প্রয়োজন হলে সংসদের মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের বিতর্ক এড়ানো যায়।
গণভোট অধ্যাদেশ কার্যকর হলে তার ফলাফল কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল বাধ্যতামূলক হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। কমিটির কিছু সদস্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি গণভোটের ফলাফল বাধ্যতামূলক না হয়, তাহলে এটি শুধুই রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। আর যদি বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে তা সংসদীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গণভোট অধ্যাদেশ ইস্যুটি এখন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ গত ১৩ মার্চ সংসদে উত্থাপন করা হয়। সংবিধানের অনুযায়ী, আগামী ১২ এপ্রিলের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ পাস হতে হবে। এ পর্যায়ে অধ্যাদেশ পর্যালোচনায় গঠিত বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ এবং সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে এর ভবিষ্যৎ। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অধ্যাদেশটি বাতিলের সম্ভাবনাই বেশি বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে বিরোধী দলের আপত্তি ও সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জের কারণে বিষয়টি আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ১৩৩ অধ্যাদেশকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক ভাগ হলো অধ্যাদেশগুলো যেভাবে জারি হয়েছিল, সেভাবে পাস করা হবে। আর কিছু অধ্যাদেশে সংশোধনী আনা হবে, সেভাবে পাস হবে। আর কিছু অধ্যাদেশ এই অধিবেশনে বাতিল হয়ে যাবে; পরে যদি প্রয়োজন হয়, তা বিল আকারে পরবর্তী অধিবেশনে উত্থাপন করা যাবে। অধ্যাদেশ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে ‘জুলাই সনদ’ এবং ‘সাংবিধানিকতা’–এ দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।