ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই। এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে। এর রাজনৈতিক মেরূকরণ বিশ্বকে নতুন করে বিভক্ত করেছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলছে। এ প্রেক্ষাপটে বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল পশ্চিমা অক্ষ এবং চীন-রাশিয়া-ইরান জোট নিয়ে পূর্বাঞ্চলীয় অক্ষ হিসেবে নতুন মেরূকরণ স্পষ্ট হচ্ছে। এই সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব হ্রাস এবং ইরানের মিত্রদের আঞ্চলিক শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে, যা বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে অনিশ্চয়তা ও গভীর আদর্শিক বিভাজন তৈরি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোও এখন নতুন সমীকরণ খুঁজছে। অনেকে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করছে। এই মেরূকরণ বিশ্বব্যবস্থাকে এক নতুন এবং অনিশ্চিতয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তাহলে সেখানে রাশিয়ার প্রভাব বাড়বে। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলো এবং বৈশ্বিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বিকল্প হিসেবে চীনের দিকে ঝুঁকবে। ব্যবসার জন্য চীনকে তারা আরও নির্ভরযোগ্য অংশীদার মনে করতে শুরু করবে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বিঘ্নিত হবে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততা। সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে সমর্থন করে আসছে। অন্যদিকে ইরানকে সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে রাশিয়া ও চীন। সিরিয়াতেও সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে রাশিয়া আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আবার চীন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে। ফলে এই সংঘাত কেবল ইরান ও ইসরায়েলের সামরিক বা রাজনৈতিক বিরোধে সীমাবদ্ধ নয়, এখন এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মেরূকরণের প্রতিফলন। এই যুদ্ধের রাজনৈতিক মেরূকরণ যেমন গভীর, তেমনি এর অর্থনৈতিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো বহুমাত্রিক শক্তির প্রতিযোগিতা এই যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির এ বিষয়ে খবরের কাগজকে বলেন, ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে সৃষ্ট যুদ্ধ পরিস্থিতি বিশ্বব্যবস্থাকে একটি বড় ঝাঁকুনি দিয়েছে। এই যুদ্ধ যত বেশি দিনের দিকে গড়াবে, বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তত বেশি এর প্রভাব পড়বে। এতে বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতা ও ভূরাজনীতিতে নতুন নতুন কাঠামো গড়ে উঠবে। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে, যেখানে তার দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র এমন পরিস্থিতিতে কখনো পড়েনি। এ ছাড়া পশ্চিমা শক্তিগুলোকে এত দিন যে এক কাঠামোতে আবদ্ধ রাখা হয়েছিল, এই যুদ্ধে সেটি লক্ষ্য করা যায়নি। ন্যাটোর কোনো সদস্য এতে যোগ দেয়নি। এদিকে এই যুদ্ধে রাশিয়া ও চীনের অবস্থানের কারণে বিশ্বব্যাপী পরমাণু ইস্যুটি নতুন চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে।
সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে এত দিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অধীনে একধরনের নিরাপত্তা কাঠামো ছিল। কিন্তু এই যুদ্ধে তাদের নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় প্রশ্ন উঠছে মধ্যপ্রচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা দিতে তারা যথেষ্ট কি না। কারণ, এ দুটি দেশ যে নিরাপত্তা দিতে পারছে না, তা ইরান বারবার হামলা চালিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই অঞ্চলে যদি ইরান নতুন শক্তি হিসেবে সামনে আসে, তাহলে সেখানে রাশিয়া ও চীনের নতুন নিরাপত্তা বলয় তৈরি হবে।
তিনি বলেন, ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইউরোপও তাদের নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা অনৈতিক কোনো যুদ্ধে অংশ নেবে না বা সমর্থন দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। ন্যাটোভুক্ত হয়েও ইউরোপের দেশগুলো এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ডাকে সাড়া দেয়নি। এতে ইউরোপের নৈতিক অবস্থান বিশ্বব্যাপী নতুন করে পরিচিতি পেল। তিনি আরও বলেন, এই যুদ্ধের মাধ্যমে এশিয়ার দেশগুলোতেও নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মেরূকরণ আসন্ন। কেননা, মধ্যপ্রাচ্যে এই যুদ্ধের বিস্তারে জ্বালানিসংকটের কারণে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে। এই সংকট এশিয়ার দেশগুলোকে অস্থির করে তুলবে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে, যদি যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম অস্থির অঞ্চল। ধর্মীয় বিভাজন, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জ্বালানি সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক শক্তির হস্তক্ষেপ–সবকিছু মিলিয়ে এই অঞ্চলে সংঘাত যেন স্থায়ী বাস্তবতা। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের যে নতুন পর্ব দেখা যাচ্ছে, তা শুধু দুই দেশের মধ্যে নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
এদিকে ইরান আক্রমণের এক মাস পর পরিস্থিতি এমন জায়গায় দাঁড়িয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য যেন এক কৌশলগত ফাঁদে পরিণত হয়েছে। একদিকে তারা যুদ্ধে সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা কমাতে চাইছে, অন্যদিকে এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাবও বজায় রাখতে চাইছে। তাদের এই দুটি লক্ষ্য এখন ক্রমেই পরস্পরবিরোধী হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, তীব্র সামরিক আঘাত ইরানের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং হয়তো শাসনব্যবস্থার পতন ঘটাবে। এর পর পরই যুদ্ধের ইতি টানা হবে। কিন্তু তাদের সেই পরিকল্পনা মতো যুদ্ধ চলছে না। এখন সংঘাত বাড়তে বাড়তে পুরো অঞ্চল ছাড়িয়ে বিশ্বব্যবস্থাকেই অস্থিতিশীল করেছে, যার ফলে বৈশ্বিক মেরূকরণ আসন্ন।