‘সকাল ৭টায় যাই তেজগাঁও। সেখানে দুটি ফিলিং স্টেশনে ঘুরি। কূলকিনারা করতে পারিনি। ভরসা করে ৮টায় আসি পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে। এখানেও দেখি দীর্ঘ লাইন। প্রধান সড়কে লাইনে দাঁড়াই। এরপর মোতালেব প্লাজা হয়ে ৩টায় এখন দাঁড়িয়ে আছি আজিজ সুপার মার্কেটে। পাম্পে যেতে আরও কত ঘণ্টা লাগবে জানি না। তেল পাব কি না, সেই ভরসাও পাচ্ছি না।’
রাজারবাগের প্রাইভেটকারচালক মো. শামিম এভাবেই তেল পেতে ভোগান্তির কথা জানান। শুধু শামিম নন, রাজধানীসহ সারা দেশে একই চিত্র দেখা গেছে। চালকরা বিভিন্ন পাম্প ঘুরলেও মিলছে না তেল।
অথচ গত মঙ্গলবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। মজুত থাকা জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ডিজেল- ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ মেট্রিক টন, অকটেনের মজুত ১০ হাজার ৫০০ টন এবং পেট্রল ১৬ হাজার টন।’
অথচ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। মধ্যপ্রাচ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হলে রাজধানীসহ সারা দেশে তেলের জন্য হাহাকার শুরু হয়। তখন তেল দিতে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এতে পাম্পে লাইন দীর্ঘ হলে গত ঈদুল ফিতরের আগে সীমা প্রত্যাহার করা হয়। তার পরও সংকট কাটছে না।
বুধবার (৮ এপ্রিল) ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। তবে তাতেও পাম্পে তেল নিতে চালকদের ভিড় কমেনি। বরং বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের চারদিকে বৃত্তের মতো ঘুরতে দেখা যায় চালকদের। এভাবে ঘুরলেও অনেকের ভাগ্যে জোটেনি তেল। চৈত্র মাসের প্রচণ্ড রোদে ও তাপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ভোক্তাদের।
এ ব্যাপারে রমনা ফিলিং স্টেশনে কথা হয় বনশ্রীর মোটরবাইকচালক ফাহিম রহমানের সঙ্গে। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে দেখি এই এলাকার পাম্পগুলো বন্ধ। তাই প্রথমে তেজগাঁও যাই। কিন্তু তেল নেওয়ার কোনো সুযোগ পাইনি। পরে আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে লাইনে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু দেখি লাইন টাউন হলে গিয়ে ঠেকেছে। বৃত্তের মতো চারদিকে ঘুরে পাম্পে যেতে হচ্ছে। তারপরও তেল না থাকায় ওই পাম্প বন্ধ ছিল। বাধ্য হয়ে রমনা ফিলিং স্টেশনে আসি দুপুর ২টার দিকে। এখানেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে চারদিক ঘুরে ৪টার দিকে পাম্পে আসি। কিন্তু পেলাম মাত্র ৫০০ টাকার তেল। কয়দিন যায় বলা মুশকিল। আবার ভোগান্তির লাইনে দাঁড়াতে হবে।’
ফিলিং স্টেশনের সংশ্লিস্টরা বলছেন, চালকরা আতঙ্কিত হয়েই তেল নিচ্ছেন। এ জন্য সবার চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পেট্রল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও রমনা ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ নাজমুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণেই আমাদের দেশে সবাই আতঙ্কিত হয়ে বেশি করে তেল কিনছেন। গতকাল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও তার প্রভাব পড়েনি। এ জন্য ভিড় বাড়ছে ফিলিং স্টেশনে। আমাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে। যা পাচ্ছি তা দিয়ে ভোক্তাদের চাহিদা মেটানো যাচ্ছে না। ক্রেতাদের সহযোগিতা করতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে।’
মোহাম্মদ নাজমুল হক আরও বলেন, সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত তেলের মজুত রয়েছে, তার পরও অনেকেই আতঙ্কে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। এতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পেট্রলপাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
রাজধানীর মহাখালী, তেজগাঁও, নীলক্ষেত, কল্যাণপুর ফিলিং স্টেশনেও দেখা যায় অভিন্ন দৃশ্য। তেল না থাকায় অধিকাংশ সময় পাম্প বন্ধ থাকছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে কখনো এমন পরিস্থিতি হয়নি।