তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংকট একসঙ্গে ‘আঘাত’ হেনেছে জনজীবনে। গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন মানুষের স্বস্তি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক সেই সময়েই মৌলিক সেবার ঘাটতি সাধারণ মানুষের জীবনকে করে তুলেছে দুর্বিষহ। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে এমন চিত্র এখন প্রতিদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজধানীতে এখন গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা লোডশেডিং চলছে। শহরতলি ও গ্রামাঞ্চলে তা ৮ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত। নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় মানুষ আগে থেকে কোনো প্রস্তুতি নিতে পারছেন না, ফলে বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হচ্ছে চরম ভোগান্তি। বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান, ফ্রিজ কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ থাকছে, যা এই তীব্র গরমে জীবনকে আরও অসহনীয় করে তুলছে।
একই সঙ্গে পানি ও গ্যাসের সংকট পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। রাজধানীর অনেক এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ না থাকায় মানুষকে বিকল্প উপায়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। রান্নার জন্য গ্যাসের চাপ কম থাকায় কিংবা সরবরাহ বন্ধ থাকায় পরিবারগুলো পড়ছে অতিরিক্ত দুর্ভোগে। এতে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে জনঅসন্তোষ।
তীব্র গরমে বিদ্যুৎসংকটে নাজেহাল জনজীবন
এখন শুধু গ্রামেই নয়, বরং রাজধানীতেও লোডশেড়িং দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ৩-৫ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। রাজধানীর মহাখালীতে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। বুধবার মধ্যরাতে পর্যাক্রমে রাজধানের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে, যা গ্রীষ্মের চূড়ান্ত সময়ে সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করা হচ্ছে।
এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ গ্যাসের স্বল্পতা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। দেশে বর্তমানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তবে গ্যাসের অভাবে বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
এ ছাড়া দেশের ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৩৩টি কেন্দ্র কারিগরি ত্রুটি, জ্বালানিসংকট বা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বন্ধ রয়েছে। শুধু ঢাকাতেই ১৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল অবস্থায় রয়েছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
এদিকে গ্রাম-শহরে বিদ্যুৎ বৈষম্য কমাতে রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, আলোচনাক্রমে রাজধানী ঢাকায় ১১০ মেগাওয়াট প্রাথমিকভাবে, পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সংকটের পরও কোনো স্বস্তির খবর দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও, বরং জ্বালানিসংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। গতকাল বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি হয়েছে ৩ হাজার মেগাওয়াট। যার ফলে লোডশেডিং বেড়েছে। গতকাল সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জনান বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অনেক, কিন্তু গ্যাস ও জ্বালানি স্বল্পতার কারণে উৎপাদন করা যাচ্ছে না। গ্যাস ব্যবহার করে ৫ হাজার ২৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। যদিও উৎপাদনক্ষমতা ১২ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট; অর্থাৎ গ্যাসের স্বল্পতার কারণে অর্ধেকের কম উৎপাদন করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। আগামী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ১ হাজার ৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, গ্যাসচালিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে হলে দিনে ২০০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ প্রয়োজন। যদি ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসও সরবরাহ করা হয়, তাহলে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেত। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৮৫ থেকে ৯০ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন খরচ সাশ্রয় করতেই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল কম ব্যবহার করা হয়।
গ্যাসসংকট কাটছে না
বিদ্যুৎসংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গ্যাসসংকট। পেট্রোবাংলা ও তিতাস সূত্রে জানা গেছে, দেশে মোট গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
সম্প্রতি একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর ফলে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। গতকাল আশকোনা, উত্তরখান, দক্ষিণ খান, উত্তরা, কসাইবাড়ী, প্রেমবাগান, কাওলা, বিমানবন্দর ও এর আশপাশের এলাকায় ৮ ঘণ্টা গ্যাস ছিল না। আজও নানা জটিলতায় রাজধানীর আশপাশের অন্তত ২০টি এলাকায় ২৪ ঘণ্টা গ্যাস বিচ্ছিন্ন থাকবে না।
এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনের পর দিন গ্যাসের স্বল্প চাপ বা সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি দেখা গেছে। উত্তরা, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, আজিমপুর, যাত্রাবাড়ীসহ বহু এলাকার বাসিন্দারা ঠিকমতো রান্না করতে পারছেন না। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করছে, আবার কেউ কেউ এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করছেন, যা তাদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মধ্যে ফেলছে।
পানিতে ঢাকা ওয়াসার অব্যস্থাপনা গড়িয়েছে সংসদে
রাজধানীতে পানিসংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পানি সমস্যা দীর্ঘদিনের হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অনেক এলাকায় দিনে একাধিকবার পানি সরবরাহ বন্ধ থাকছে, আবার কোথাও পানিতে ময়লা-আবর্জনা ও দুর্গন্ধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঢাকা ওয়াসার অব্যবস্থাপনা নতুন নয়। প্রতিবছর এই সময়ে ঢাকা ওয়াসার অব্যস্থাপনা সমালোচিত হচ্ছে, যা গড়িয়েছে সংসদ পর্যন্ত।
রাজধানীর পানি সরবরাহ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম। তিনি বলেছেন, ঢাকা ওয়াসার পানিতে দুর্গন্ধ ও পোকা থাকায় তা পানযোগ্য নয়। গত বুধবার রাতে জাতীয় সংসদে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিশের আলোচনায় সাইফুল আলম এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
এ ছাড়া গ্যাসসংকটের বিষয়েও কথা বলেন তিনি। তার মতে, রাজধানীর অনেক গ্যাসলাইন ৪০ থেকে ৫০ বছর পুরোনো হয়ে গেছে, যা দ্রুত সংস্কার করা প্রয়োজন।
ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর পানি সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়া, পুরোনো পাইপলাইন এবং প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে পানিসংকট রয়েছে। ঢাকার দৈনিক পানির চাহিদা ২৯০ থেকে ৩০৫ কোটি লিটার, যেখানে প্রয়োজন প্রায় ৩১০ কোটি লিটার। প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ পানি ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে আসে এবং কিছু এলাকায় প্রতিবছর পানির স্তর ১০ থেকে ১২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি।
মিরপুর, কল্যাণপুর, বাড্ডা, আফতাবনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, দিনের অধিকাংশ সময় পানির দেখা পাওয়া যায় না। কোথাও আবার স্বল্প সময়ের জন্য পানি এলেও তা অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
এসব সংকটে রাজধানীর পরিবেশ দিনে দিনে ভয়ংকর হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, শহরের ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি মানুষ এখানে বসবাস করছেন, কিন্তু সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিবেশগত ভারসাম্য তৈরি করা হয়নি। বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়ায় এই চাপ আরও বেড়েছে।
এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, ঢাকায় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এগুলোর টেকসই সমাধান না করে নতুন নতুন প্রকল্প নেওয়ার মাধ্যমে শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, কিন্তু সেবার মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ঢাকা ওয়াসা এখনো নিরবচ্ছিন্ন নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিষয়গুলোতে স্বচ্ছতা আনতে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিদ্যুৎ খাতের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শহর ও গ্রামের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে! কিন্তু এটা কি কোনো সমাধান হলো? যেখানে কোটি মানুষের জীবনযাত্রার মানে প্রভাব ফেলছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া ঢাকার ভবিষ্যৎ আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে। তাই এখনই কার্যকর ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই।