আয় বাড়াতে নির্বাচিত সরকার প্রথম বাজেটে জনজীবনের পরতে পরতে রাজস্বের জাল বিছানোর ছক কষছে। তবে এনবিআরের জোরালো আপত্তি সত্ত্বেও খোদ প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখতে বলেন।
অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলেছেন, সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে বাধ্য হয়েই এ পথে হাঁটছে। আর এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে খরচ বাড়বে। অর্থনীতি আরও চাপে পড়বে।
গত বুধ ও বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের খসড়া নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, অর্থ সচিব, বাণিজ্য সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানসহ বাজেট প্রস্তুতির সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করেন।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্র জানায়, গতকাল প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মূলত রাজস্ব বাজেট নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক সকাল ১০টা থেকে শুরু হয়ে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। গতকালের বৈঠকে আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের তিন খাত–আয়কর, ভ্যাট ও শুল্কে কী পদক্ষেপ আনা যায় তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষভাবে ভ্যাটের আওতা ও হার বাড়ানো, করমুক্ত আয়সীমা, করপোরেট করহার, উৎসে কর, সম্পূরক শুল্ক, ‘প্যাকেজ ভ্যাট’, সম্পদ কর, অগ্রিম আয়কর আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
প্রধানমন্ত্রী বৈঠকের শুরুতে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানকে রাজস্ব জালের আওতা বাড়িয়ে ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার নির্দেশ দেন।
এনবিআরের চেয়ারম্যান ভূরাজনীতির কারণে দেশের শিল্প, বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিস্থিতির গতি কমার কথা বলেন। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে রাজস্ব আদায়ে ধস নেমেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ সময় অর্থমন্ত্রী ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টাও দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের উদাহরণ দিয়ে অর্থনীতিতে গতি কমেছে বলে জানান। প্রধানমন্ত্রী অতীতের ধারা থেকে বেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও এনবিআরে আবেদন করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ৪-৫ লাখ টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে।
বৈঠকসূত্রে জানা যায়, অন্তর্বতী সরকার আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ প্রস্তাব করে গিয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে নিট আয় ৩১ হাজার ২৫০ টাকা হলেই একজন করদাতাকে হিসাব কষে সরকারি কোষাগারে বাধ্যতামূলকভাবে কর দিতে হবে। না হলে জেল-জরিমানা হবে। প্রধানমন্ত্রী করমূক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করা যায় কিনা তা নিয়ে এনবিআরকে ভাবতে পরামর্শ দিয়েছে। করপোরেট করহারে ছাড় দেওয়া হবে না।
গতকালের বৈঠকে এনবিআর থেকে দাবি করা হয়, ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানিতে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছেন। রাজস্ব ফাঁকি কমাতে উৎসে করের হার বাড়ানো এবং আদায়ে কঠোরতা আনা প্রয়োজন।
আগামী বাজেটে চাল, ধান, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন, মসলা, আটা, ময়দা, লবণ, আলুসহ সাধারণ মানুষের ব্যবহৃত শতাধিক খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য আমদানিতে উৎসে করের চাপ থাকছে। একই সঙ্গে নতুন করে পাঁচ শতাধিক পণ্যে সম্পূরক শুল্ক আরোপ হচ্ছে। শুল্ককরের মারপ্যাঁচে রাজস্ব আইন অনুসারে বাজেট ঘোষণার পরই খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত হাজারের বেশি পণ্যের দাম বাড়বে। জুতা, স্যান্ডেল, পাউরুটি, বিস্কুট, চকলেট, চিপস, জুস, বিভিন্ন ধরনের দেশি-বিদেশি পোশাকের দাম বাড়বে। বেশির ভাগ চিকিৎসাসামগ্রী, ওষুধ ও শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। যাতায়াত খরচ বাড়বে। নাটক ও সংগীতানুষ্ঠানের টিকিটের দাম বাড়বে। কম্পিউটার ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশের দাম বাড়বে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, বিগত দুই সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। সরকারের সামনে আয় বাড়ানোর বিকল্প কিছু নেই। রাজস্বের আওতা ও হার দুটোই বাড়াতে হবে। এতে সাধারণ মানুষের জীবযাত্রার খরচ বাড়বে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির টানাপোড়েনের মধ্যে দেশের মানুষের আয় বাড়বে–এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। যেখানে খোদ অর্থমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে বলেছেন যে দেশের অর্থনীতি তলানিতে ঠেকেছে। শিল্প-ব্যবসাবাণিজ্য বিনিয়োগ বাড়াতে হলে রাজস্ব ছাড় দিতে হবে। কিন্তু সরকারের পক্ষে রাজস্ব ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হলে রাজস্ব ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে না।
এনবিআরের আরেক সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, মূল্যস্ফীপির চাপে থাকা মানুষের করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো উচিত। করপোরেট করহার কমানো প্রয়োজন। সাধারণ মানুষকে পদে পদে রাজস্ব-জালে আটকে ফেললে দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বাড়বে। বিভিন্ন ধরনের কার্ড দিয়েও মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটানো কঠিন হবে।
গতকালের বৈঠকে আগামী বাজেটে ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। আর এ জন্য ভ্যাটের আওতা ও পরিমাণ বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। এতে অনেক ক্ষেত্রে ভ্যাটের হারো বাড়বে। ভ্যাট হলো পরোক্ষ কর যা, পণ্যের দামের সঙ্গে যোগ করে আদায় করা হয়। বেশির ভাগ ক্রেতা না জেনেই দাম হিসেবে ভ্যাট পরিশোধ করেন। আসন্ন বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য প্যাকেজ ভ্যাট আরোপ করার কথা ভাবছে। ফলে এসব দোকানেও পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হবেন বিক্রেতারা। এতে আগামী বাজেট ঘোষণার পর শুধু ভ্যাটের কারণে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বাড়বে। এতে ধনীরা সমস্যায় না পড়লেও ভোগান্তিতে পড়বে অল্প আয়ের মানুষ।
গতকালের বৈঠকে বিশেষ করে পিস্তল, রিভলভার বা শটগান মালিকদের কাছ থেকে বাড়তি কর নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। প্রাইভেট কার, জিপ এবং হেলিকপ্টার বা বিমানের ওপরও কর বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই কর কার্যকর হলে এসব গাড়ি ব্যবহারকারীর খরচ বাড়বে। একই সঙ্গে বিমান ভাড়াও বাড়বে। বৈঠকে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশাকে সিটি করপোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা এবং পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা যায় কি না তা নিয়ে আলোচনা হয়। আগামী বাজেটে মোটরসাইকেল নিবন্ধনে অগ্রিম কর আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজস্ব ছাড় দেওয়া দরকার। কিন্তু গণ্যমাধ্যমে দেখছি, বিভিন্ন খাতে কর ও ভ্যাট আরোপ হচ্ছে। এতে জিনিসপত্রের দাম বাড়বে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমবে। বেচাকেনা কমবে। ব্যবসায়ে ধস নামবে। সরকারের আয় বাড়াতে গিয়ে উল্টো রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, গত ২২ বছরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সর্বনিম্ন। বেকারত্ব বাড়ছে। রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছা্ড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত প্রায় সব খাতে খরচ বেড়েছে। গ্রামে ও শহরে সব জায়গায় খরচের চাপে দিশেহারা মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতির সংকট আরও বাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাজেটে কর আরোপ করা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী গত বুধবার আসন্ন বাজেটের আকার, আয়-ব্যয়ের হিসাব, রাজস্ব, ঘাটতি বাজেট, মূল্যস্ফীতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ সময় সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি ঋণসহ মোটা দাগে বাজেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। অগ্রাধিকার প্রকল্প, সৃজনশীল অর্থনীতি, অর্থনীতিতে যুক্ত করা নতুন খাত, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, খাল কাটা কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আগামী বাজেটে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো কী হতে পারে তা নিয়েও প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
বুধবারের ওই বৈঠকে আগামী অর্থবছরে বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চেয়ে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি এবং সংশোধিত বাজেটের চেয়ে দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি।