দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরে এসেছে ইউরোপের দেশ স্কটল্যান্ড। অন্যদিকে যুদ্ধবিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করে ৫২ বছর পর শ্রেষ্ঠত্বের আসরে ক্যারিবীয় অঞ্চলের (কনকাকাফ) হাইতি। দল দুটিকে প্রত্যাবর্তনের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে হচ্ছে মৃত্যুকূপে দাঁড়িয়ে। কারণ ‘সি’ গ্রুপে তাদের সঙ্গী পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন সুপার পাওয়ার ব্রাজিল ও র্যাঙ্কিংয়ের সেরা সাতে থাকা মরক্কো।
যদিও নকআউটের টিকিট কাটা কঠিন, তবে স্কটল্যান্ড ও হাইতি শুধু অংশগ্রহণের জন্য বিশ্বকাপে আসেনি। লড়াকু ফুটবল আর ঐতিহ্যের ধারক স্কটিশ কোচ স্টিভ ক্লার্ক বলেছেন, প্রতিপক্ষ নয়, তারা শুধু নিজেদের নিয়েই ভাবছে। প্রতিটি ম্যাচে তারা জয়ের জন্যই মাঠে নামবে। স্কটিসদের সৌভাগ্য যে হাইতির মতো দলের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে মিশন শুরু করতে পারছে! অন্যদিকে হাইতি অন্তত গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষদের কঠিন পরীক্ষা নিতে চাইবে। জয় না পেলেও প্রতিপক্ষকে রুখে (ড্র) দিয়ে বড় মঞ্চে আশার সঞ্চার করতে চায়। খাতা-কলমে আন্ডারডগ হলেও মাঠে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে প্রস্তুত ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতি। বাংলাদেশ সময় রবিবার সকাল ৭টায় ম্যাসাচুসেটসে বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে দুই দল।
বাছাই পর্বে স্কটল্যান্ডের শেষ রাতটি ছিল রোমাঞ্চের চেয়েও নাটকীয়। গ্রিসের কাছে হেরে যখন স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছিল, তখনই ভাগ্যের ছোঁয়ায় অন্য সমীকরণে বেঁচে ফেরে স্কটিশরা। আর ডেনমার্কের বিরুদ্ধে সেই ফয়সালার ম্যাচে স্কট ম্যাকটোমিনের অবিশ্বাস্য সেই ‘ওভারহেড কিক’ থেকে শুরু করে কিয়েরান টিয়ার্নির বুলেট গতির গোল, সবই ছিল রূপকথার মতো। ম্যাকটমিনের শূন্যে ভাসা কিকটি এতটাই নান্দনিক ছিল যে, তার উচ্চতা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিখ্যাত বাইসাইকেল কিকের উচ্চতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডের নেতৃত্ব ও ভরসার প্রতীক অধিনায়ক অ্যান্ডি রবার্টসন। বড় তারকা ইপিএলে অ্যাস্টন ভিলার হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটানো জন ম্যাকগিন। দলটির বড় শক্তি তাদের মাঝমাঠ। স্কট ম্যাকটমিনে, জন ম্যাকগিন ও বিলি গিলমরদের অভিজ্ঞতা এবং আগ্রাসী ফুটবল স্কটিশ মিডফিল্ডকে দিয়েছে এক নতুন রূপ, যা বড় মঞ্চে যেকোনো দলের জন্যই ভয়ের কারণ হতে পারে। অতীতে ৯ বার বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কখনোই গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতে পারেনি তারা।
সত্তরের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত যারা বিশ্বকাপের নিয়মিত মুখ ছিল, সেই দেশটি ১৯৯৮ সালের পর থেকে বিশ্বমঞ্চে ছিল ব্রাত্য। টানা ছয়টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে ব্যর্থ হওয়ার পর এবার ছিল অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। কোচ স্টিভ ক্লার্ক যখন ২০১৯ সালে দায়িত্ব নেন, স্কটিশ ফুটবল ছিল তখন দিকভ্রান্ত। সেই ক্লার্কের হাত ধরেই বদলে গেছে দেশটির ফুটবলে। প্রায় তিন দশক পর ফিরে এসেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।
অন্যদিকে ৫২ বছর পর ফেরা হাইতি এর আগে ১৯৭৪ সালে একবারই বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছিল, তিন ম্যাচে ১৪ গোল হজম করে বিদায় নিয়েছিল গ্রুপ পর্বে। হাইতি জাতীয় ফুটবল দলের রূপকথার প্রত্যাবর্তনের নায়ক ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়েন মিগনে। অথচ আজ পর্যন্ত হাইতির মাটিতে পা রাখতে পারেননি তিনি। চরম নিরাপত্তাসংকটের কারণে মিগনেকে তার পুরো রণকৌশল সাজাতে হয়েছে বিদেশের মাটিতে বসে। বাছাইয়ে গ্রুপ পর্বে কুরাসাওয়ের কাছে ৫-১ ব্যবধানে হারের বড় ধাক্কা সামলে নিয়ে তৃতীয় রাউন্ডে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ায় দলটি। হন্ডুরাস ও কোস্টারিকার মতো অভিজ্ঞ শক্তিকে পেছনে ফেলে কনকাকাফ অঞ্চলের গ্রুপসেরা হয়েই বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নিয়েছে হাইতি।
অনেকের মতে, এটি গত দুই দশকের মধ্যে হাইতির সেরা ফুটবল দল। প্রথমবারের মতো ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে মাঠ মাতাচ্ছেন হাইতির তিন ফুটবলার। প্রিমিয়ার লিগের সান্ডারল্যান্ডের হয়ে মাঠ মাতানো উইলসন ইসিদোর তো রীতিমতো তারকা! উলভারহ্যাম্পটনের জাঁ-রিকার বেলগার্ড, বার্নলির হানেস দেলক্রো এবং এজে অক্সারের জসু কাসিমিরদের মতো প্রবাসে থাকা তারকাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ছেন ডানলি জিন জেকস, রিকাদো আদে ও দন দিদসনদের মতো স্থানীয়রা। ড্যানলি জঁ জাকের নেতৃত্বে আছেন ডেরিক এতিয়েন জুনিয়র, লুইসিয়াস ডিডসন এবং দেশের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ডাকেন্স নাজন। বিশ্বকাপে হাইতির সফল হওয়ার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায় হলো নিজেদের রক্ষণভাগকে জমাট রাখা, শারীরিক ফুটবলে প্রতিপক্ষকে টেক্কা দেওয়া এবং সেট-পিস বা কাউন্টার অ্যাটাক থেকে গোল আদায় করে নেওয়া। কঠিন গ্রুপে কাজটা মোটেও সহজ হবে না।
বিশ্বকাপ রেকর্ডস
স্কটল্যান্ড
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৪৩
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: এ নিয়ে ৯ বার
সেরা ফল: ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৭৪, ১৯৭৮, ১৯৮২, ১৯৮৬, ১৯৯০ ও ১৯৯৮ আসরে গ্রুপ পর্ব
শক্তি: শারীরিক সক্ষমতা ও লড়াকু মানসিকতা
দুর্বলতা: বিশ্বমানের তারকা খেলোয়াড়ের অভাব
হাইতি
ফিফা র্যাঙ্কিং: ৮৩
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ: এ নিয়ে দ্বিতীয়বার
সেরা ফল: ১৯৭৪ আসরে গ্রুপ পর্ব
শক্তি: গতিময় আক্রমণ
দুর্বলতা: অভিজ্ঞতার ঘাটতি