ভোটাধিকার বা ভোট দেওয়ার অধিকার একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন নাগরিক তার দেশের সরকার গঠনে সরাসরি অংশ নিতে পারে। তবে পৃথিবীর সব দেশে কিন্তু একই বয়সে এই ক্ষমতা অর্জন করা যায় না। ভিন্ন ভিন্ন দেশ তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক কাঠামো এবং তরুণদের পরিপক্বতার ধারণার ভিত্তিতে এই বয়সসীমা নির্ধারণ করে।
১৮ বছর: বৈশ্বিক মানদণ্ড
বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই ভোটাধিকারের ন্যূনতম বয়স হলো ১৮ বছর। এই বয়সটিকে সাধারণত প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বগ্রহণের জন্য যথেষ্ট পরিপক্ব বয়স হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং জার্মানির মতো বিশ্বের শক্তিশালী গণতন্ত্রগুলোর বেশিরভাগেই এই নিয়ম প্রচলিত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৮ বছর বয়সীদের ভোটাধিকার দেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। বিশেষ করে ১৯৬০ এবং ১৯৭০-এর দশকে, যখন তরুণ সমাজ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা বা দেশের জন্য সামরিক দায়িত্ব পালনের মতো গুরুতর কাজ করতে পারলে, কেন তারা সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, এই প্রশ্ন জোরালো হয়। তরুণদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্যই মূলত এই বয়সসীমা কমানো হয়। জাপানেও ২০১৫ সালে ২০ থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করা হয়, যা তরুণদের জন্য একটি বড় পরিবর্তন।
১৬ বছর: যখন তারুণ্য আরও আগে সুযোগ পায়
কিছু দেশ আছে যারা বিশ্বাস করে ১৬ বছর বয়সের তরুণ-তরুণীরাও যথেষ্ট রাজনৈতিক জ্ঞান ও সচেতনতা নিয়ে ভোট দিতে পারে। বিশ্বের হাতেগোনা কয়েকটি দেশে ১৬ বছর বয়সে ভোট দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
অস্ট্রিয়া: এটি প্রথম ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ, যারা ১৬ বছর বয়সে ভোটাধিকার দিয়েছে।
আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল: এই দেশগুলোতেও ১৬ বছর বয়সীরা ভোট দিতে পারে।
স্কটল্যান্ড: স্কটল্যান্ডের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে ১৬ বছর বয়সীরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়।
এই দেশগুলোর যুক্তি হলো, তরুণ বয়স থেকেই যদি নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা যায়, তবে তারা দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আরও বেশি সচেতন ও দায়বদ্ধ হবে। এ ছাড়াও, এটি দীর্ঘমেয়াদে ভোটের হার বাড়াতেও সাহায্য করে বলে মনে করা হয়।
২০ এবং ২১ বছর: ঐতিহ্যের গুরুত্ব
এক সময় বিশ্বের বেশির ভাগ দেশে ভোটাধিকারের বয়স ২১ বছর ছিল। এটিকে আইনিভাবে ‘পূর্ণ বয়সের’ প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হতো। যদিও বেশির ভাগ দেশই এখন ১৮ বছরে নেমে এসেছে, তবুও কিছু দেশে এখনো ২০ বা ২১ বছর বয়সসীমা বজায় রয়েছে:
২১ বছর: লেবানন, ক্যামেরুন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো কিছু দেশে এখনো ২১ বছর বয়সে ভোটাধিকার দেওয়া হয়। এই দেশগুলো হয়তো মনে করে যে ২১ বছর হলো আরও বেশি পরিপক্বতা, স্থিতিশীলতা এবং জীবন সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভের বয়স।
২০ বছর: দক্ষিণ কোরিয়ার মতো কিছু দেশে ২০ বছর বয়সে ভোটাধিকার দেওয়া হতো, যদিও বর্তমানে এর পরিবর্তন হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে কিছু দেশে ২০ বছরকে ১৮ এবং ২১-এর মাঝামাঝি একটি সময় হিসেবে দেখা হতো।
২৫ বছর: সবচেয়ে বেশি বয়সে ভোটাধিকার পান সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিকরা। বয়স ২৫ বছর হলে তারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
বয়সসীমা পরিবর্তনের কারণ কী?
ভোটাধিকারের বয়স কমানোর বা বাড়ানোর পেছনে বিভিন্ন কারণ কাজ করে। যেমন-
শিক্ষার প্রসার: আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় তরুণরা খুব দ্রুত বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করছে, যা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়।
সামরিক বাধ্যবাধকতা: যে বয়সে একজন সৈনিক দেশের জন্য যুদ্ধ করতে পারে বা সামরিক দায়িত্ব নিতে পারে, সেই বয়সে তার সরকারকে বেছে নেওয়ার অধিকার থাকা উচিত— এই ধারণাটি একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।
তরুণদের দাবি: অনেক দেশেই তরুণ সমাজ সক্রিয়ভাবে তাদের ভোটাধিকারের বয়স কমানোর জন্য আন্দোলন করেছে।
রাজনৈতিক সক্রিয়তা: রাজনৈতিক দলগুলোও অনেক সময় তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য বয়স কমানোর পক্ষে কাজ করে।

