ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললেই আমরা দেখি বন্ধুদের ঝকঝকে হাসিমাখা ছবি, দামি রেস্তোরাঁয় খাবার কিংবা দামি কোনো রিসোর্টে কাটানো চমৎকার মুহূর্ত। এসব দেখে আমাদের মনে হতে পারে, সবার জীবনই বুঝি এমন নিখুঁত আর আনন্দময়। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, সোশ্যাল মিডিয়ার এই দুনিয়া অনেকাংশেই কৃত্রিম। পর্দার পেছনে থাকা দুঃখ, বিষণ্নতা বা সাধারণ জীবনের টানাপোড়েনগুলো কখনোই নিউজফিডে উঠে আসে না। যা আমরা দেখি, তা আসলে জীবনের একটি ‘ফিল্টার করা’ ছোট্ট অংশ মাত্র। লিখেছেন আশরাফ মাহমুদ
ইনফ্লুয়েন্সার কালচার ও বাস্তবতার ফারাক
বর্তমানে ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবনযাত্রা তরুণদের গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। তারা যেসব বিউটি প্রোডাক্ট বা লাইফস্টাইল প্রচার করছেন, তার পেছনে প্রায়ই থাকে পেশাদার ক্যামেরা, বিশেষ লাইটিং এবং দীর্ঘ সময়ের এডিটিং। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ঝকঝকে জীবনের পেছনে যে মানসিক চাপ বা হীনম্মন্যতা কাজ করে, তা পাঠকদের বুঝতে হবে। অন্যের কৃত্রিম জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে গিয়ে অনেক তরুণই হতাশায় ভোগেন, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।
ছবির পেছনে লুকানো কারিকুরি
প্রযুক্তির কল্যাণে এখন যেকোনো ছবি বা ভিডিও মুহূর্তেই বদলে ফেলা সম্ভব। বিভিন্ন বিউটি ফিল্টার ব্যবহার করে গায়ের রং বা শারীরিক গঠন পরিবর্তন করা এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অনলাইনে দেখা নিখুঁত চেহারার প্রতি অন্ধ আসক্তি আমাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। এছাড়া ইদানীং এআই এবং ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে এমন সব ছবি বা ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে, যা দেখে বোঝার উপায় নেই যে তা মিথ্যা। তাই অনলাইনে দেখা কোনো কিছুকেই যাচাই না করে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
বডি পজিটিভিটি ও সচেতনতা
সোশ্যাল মিডিয়ার তথাকথিত ‘নিখুঁত’ সৌন্দর্যের মানদণ্ড ভুলে আমাদের উচিত ‘বডি পজিটিভিটি’ বা নিজের স্বাভাবিক অবয়বকে ভালোবাসতে শেখা। কৃত্রিম সৌন্দর্যের পেছনে না ছুটে সুস্থ জীবনযাপন এবং মেধা বিকাশে মন দেওয়া জরুরি। অনলাইনে কোনো তথ্য বা ছবি দেখে উত্তেজিত বা হতাশ হওয়ার আগে তার সত্যতা যাচাই করা উচিত। মনে রাখতে হবে, আপনার জীবন অন্য কারও সোশ্যাল মিডিয়া ফিডের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান এবং বাস্তব।
গুজব ও ভুয়া তথ্যের মায়াজাল
অনলাইনে কেবল ছবি বা লাইফস্টাইল নয়, তথ্যের ক্ষেত্রেও অনেক বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। অনেক সময় চটকদার শিরোনাম বা এডিট করা খবর দেখে আমরা দ্রুত শেয়ার করে ফেলি, যা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। যেকোনো সংবাদের উৎস বিশ্বাসযোগ্য কি না, তা যাচাই করা এখন নাগরিক দায়িত্বের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যের এই গোলকধাঁধায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হলে আমাদের যৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও যাচাই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
ভার্চুয়াল জগৎ বনাম বাস্তব জগৎ
লাইক, কমেন্ট আর শেয়ারের ভিড়ে আমরা যেন আসল সম্পর্কগুলোকে ভুলে না যাই। অনলাইনে হাজার হাজার বন্ধু থাকলেও বিপদের সময় পাশে থাকা সেই রক্ত-মাংসের মানুষগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলোর চেয়ে সামনাসামনি আড্ডা বা প্রিয়জনের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার আনন্দ অনেক বেশি প্রশান্তিদায়ক। বাস্তব জগৎ অনেক সময় অগোছাল হতে পারে, কিন্তু এটিই সত্য–আর এই সত্যকেই সাদরে গ্রহণ করা উচিত।