ভোরবেলার কুয়াশাভেজা সকালে রিমনের চোখের কোণে জল। মোবাইলের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা রেজাল্ট শিটটা যেন তার দীর্ঘ ১২ বছরের পরিশ্রমকে এক নিমেষে অস্বীকার করল। কাঙ্ক্ষিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় তার নাম নেই। চারপাশের আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর বাঁকা চাউনি আর মা-বাবার মলিন মুখ দেখে রিমনের মনে হচ্ছে— জীবনটা এখানেই স্থবির হয়ে গেল।
আমাদের দেশে প্রতিবছর লাখ লাখ ‘রিমন’ এই একই মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যায়। তাদের কাছে মনে হয়, একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের তকমা ছাড়া বুঝি পৃথিবীতে সফল হওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু সমাজ আর পারিপার্শ্বিকতার তৈরি করা এই ধারণা কি আসলেই সত্যি? বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবল একটি নাম, নাকি এটিই মানুষের ভাগ্য নির্ধারণকারী একমাত্র চাবিকাঠি?
একটি অদৃশ্য বিভাজন ও মানসিক চাপ
আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একটি অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানেই মেধাবী, আর প্রাইভেট বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মানেই যেন ‘সেকেন্ড ক্লাস’ নাগরিক— এই ভ্রান্ত ধারণা তরুণদের আত্মবিশ্বাসকে বিষিয়ে দিচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো, ভর্তি পরীক্ষার মাত্র এক ঘণ্টার একটি যুদ্ধ কখনো কারও মেধার পূর্ণাঙ্গ মাপকাঠি হতে পারে না। শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ কিংবা স্রেফ ভাগ্যের ফেরে অনেক তুখোড় মেধাবীও কাঙ্ক্ষিত দালানে জায়গা পায় না। কিন্তু সেই হারানো সুযোগ কি তাদের জীবনের ইতি টেনে দেয়? একদমই নয়।
আসিফ ও সুজনের গল্প
আসুন আমরা একটি বাস্তবধর্মী উদাহরণের দিকে তাকাই। আসিফ এবং সুজন দুই বন্ধু। আসিফ দেশের সেরা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে ভর্তি হলেন। চার বছর পর তার হাতে দামি একটি সার্টিফিকেট থাকলেও তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের ওপরই বেশি নির্ভরশীল ছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, বড় ক্যাম্পাসের নামই তাকে বড় চাকরি এনে দেবে। ফলে নতুন কোনো কারিগরি দক্ষতা বা ভাষাগত দক্ষতা অর্জনে তিনি খুব একটা মনোযোগ দেননি।
অন্যদিকে, সুজন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেয়ে একটি সাধারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। শুরুতে মন খারাপ থাকলেও দ্রুত নিজেকে সামলে নিলেন। তিনি বুঝলেন, ক্যাম্পাস ছোট হলেও পৃথিবীটা অনেক বড়। তিনি ক্লাসের পড়ার পাশাপাশি ইউটিউব দেখে গ্রাফিক্স ডিজাইন ও কোডিং শিখলেন। ইংরেজিতে কথা বলার জড়তা কাটাতে বন্ধুদের সঙ্গে চর্চা শুরু করলেন। এমনকি ইন্টারনেটে বিশ্ববিখ্যাত এমআইটি বা হার্ভার্ডের ফ্রি লেকচারগুলো শুনে নিজের জ্ঞানের পরিধি বাড়ালেন। চার বছর পর দেখা গেল, আসিফ যখন কেবল বড় ভার্সিটির দোহাই দিয়ে ইন্টারভিউ বোর্ডে ব্যর্থ হচ্ছেন, তখন সুজন তার কাজের দক্ষতার জোরে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে উচ্চ বেতনে যোগ দিয়েছেন।
গল্পটি কাল্পনিক হলেও আজকের করপোরেট জগতের এটাই ধ্রুব সত্য। গুগল, মাইক্রোসফট বা অ্যামাজনের মতো বিশ্বসেরা কোম্পানিগুলো এখন আর প্রার্থীর সিভিতে ‘ভার্সিটির নাম’ খোঁজে না; তারা দেখে প্রার্থী সমস্যা সমাধানে কতটা দক্ষ।
বড় ক্যাম্পাস বনাম ব্যক্তিগত উৎকর্ষ
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সস্তায় পড়ার সুযোগ অবশ্যই অনস্বীকার্য। কিন্তু মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় হলো কেবল একটি ‘প্ল্যাটফর্ম’ বা যাত্রা শুরুর স্টেশন। সেই স্টেশনে দাঁড়িয়ে আপনি কত দ্রুত দৌড়াবেন, সেটা নির্ভর করে আপনার নিজের পায়ের গতির ওপর। একটি দামি মার্সিডিজ গাড়িতে বসে আলসেমি করলে যেমন গন্তব্যে পৌঁছানো যায় না, তেমনি সাধারণ কোনো বাহনে চড়েও কঠোর পরিশ্রমী চালক ঠিকই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে যান।
আজকের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জ্ঞানের উৎস আর নির্দিষ্ট কোনো ক্যাম্পাসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নেই। বড় বড় লাইব্রেরির বই এখন ই-বুক হিসেবে আপনার স্মার্টফোনে। তাই আপনি কোন লাইব্রেরিতে বসে পড়ছেন তার চেয়ে বেশি জরুরি হলো আপনি কী পড়ছেন এবং সেটাকে বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করছেন। আপনার ল্যাপটপটিই এখন আপনার বড় গবেষণাগার হতে পারে, যদি আপনার মধ্যে শেখার তীব্র ক্ষুধা থাকে।
করপোরেট জগৎ কী চায়?
চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতার ধরন আমূল বদলে গেছে। নিয়োগকর্তারা এখন প্রার্থীর মধ্যে মূলত তিনটি জিনিস খোঁজেন–
▶ সফট স্কিল: আপনি কতটা গুছিয়ে কথা বলতে পারেন, অন্যদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে পারেন কি না এবং কঠিন পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দিতে পারেন কি না।
▶ টেকনিক্যাল স্কিল: আপনার বিষয়ের ওপর আপনার দখল কতটুকু। ধরুন আপনি হিসাববিজ্ঞানে পড়ছেন, কিন্তু আপনি যদি ট্যালি বা অ্যাডভান্সড এক্সেল না জানেন, তবে ভার্সিটির নাম আপনাকে বাঁচাতে পারবে না।
▶ অ্যাডাপ্টেবিলিটি: নতুন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে আপনি নিজেকে কতটা খাপ খাইয়ে নিতে পারছেন।
এই দক্ষতাগুলো অর্জনের জন্য বড় ক্যাম্পাসের প্রয়োজন নেই। বরং প্রাইভেট বা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই সীমাবদ্ধতার মধ্যে লড়াই করতে করতে বেশি কর্মঠ ও বাস্তববাদী হয়ে ওঠে, যা তাদের ক্যারিয়ারে বাড়তি সুবিধা দেয়।
হীনম্মন্যতা ঝেড়ে ফেলার উপায়
চান্স না পাওয়া মানে আপনি অযোগ্য নন। এটি কেবল একটি শিক্ষা যে, আপনাকে হয়তো অন্য কোনো পথে হাঁটতে হবে। বিখ্যাত অনেক মানুষ আছেন যারা তথাকথিত বড় কোনো ডিগ্রি ছাড়াই বিশ্ব শাসন করছেন। তাই ভেঙে না পড়ে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন—
▶ নিজের লক্ষ্য স্থির করুন: আপনি ভবিষ্যতে কী হতে চান তা নির্দিষ্ট করুন। সেই লক্ষ্যের জন্য কী কী দক্ষতা দরকার তা ইন্টারনেটে খুঁজে বের করুন।
▶ অনলাইন রিসোর্স ব্যবহার করুন: কোর্সেরা, ইউডেমি বা খান একাডেমির মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করে নিজেকে দক্ষ করে তুলুন।
▶ নেটওয়ার্কিং বাড়ান: লিংকডইন প্রোফাইল খুলুন। আপনার পছন্দের ফিল্ডে যারা সফল, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করুন। তাদের পরামর্শ নিন।
▶ নিজেকে তুলনা করা বন্ধ করুন: অন্যের ফেসবুক স্টোরি দেখে নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করবেন না। মনে রাখবেন, সবার জীবনের সাফল্যের সময় এক হয় না।

