তারুণ্য মানেই উদ্দামতা, তারুণ্য মানেই নতুন কিছু গড়ার কারিগর। নদীর স্রোতের মতো সময় বয়ে চলে। আর সেই স্রোতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে যায় প্রজন্মের রুচি, চিন্তা এবং জীবনধারা। বিশ-ত্রিশ বছর আগের একজন তরুণ আর বর্তমানের ‘জেন-জি’ (Gen-Z) বা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এই পরিবর্তন কেবল পোশাকে নয়, বরং তাদের মনস্তত্ত্ব, খাদ্যাভ্যাস এবং দৃষ্টিভঙ্গিতেও স্পষ্ট। আজকের নিবন্ধে আমরা আলোকপাত করব কীভাবে সময়ের আবর্তে বদলে গেছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম।
কেমন ছিল আগের প্রজন্ম?
নব্বইয়ের দশক বা তারও আগের তরুণ প্রজন্মের কথা ভাবলে আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এক অন্যরকম শান্ত অথচ প্রাণবন্ত ছবি। তখন বিনোদনের মাধ্যম ছিল সীমিত। বিকেলে মাঠে গিয়ে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা ছিল নেশা। আড্ডা মানেই ছিল পাড়ার মোড়ে বা চা-দোকানের বেঞ্চে বসে অফুরন্ত গল্প। তথ্যের প্রধান উৎস ছিল সংবাদপত্র এবং রেডিও-টেলিভিশন। সে সময় তারুণ্যের মধ্যে একটা ‘সামষ্টিক চেতনা’ কাজ করত। সবাই মিলে কোনো কাজ করা, পাড়ার বড় ভাইদের শ্রদ্ধা করা এবং একান্নবর্তী পরিবারের মূল্যবোধ ছিল তাদের চরিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চিঠিপত্র আদান-প্রদান আর বিটিভির সাপ্তাহিক নাটকের অপেক্ষায় কাটত তাদের রঙিন প্রহর।
ডিজিটাল বিপ্লব ও নতুন জীবনধারা
বর্তমান প্রজন্মের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হলো প্রযুক্তি। এখনকার তরুণদের জীবন শুরু হয় স্মার্টফোনের অ্যালার্মে এবং শেষ হয় স্ক্রল করতে করতে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা তাদের পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এখন আড্ডা মানে কেবল সশরীরে উপস্থিতি নয়, বরং ডিসকর্ড সার্ভার বা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে গভীর রাত পর্যন্ত কল। আগের প্রজন্মের মতো তারা কেবল নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; তারা এখন বৈশ্বিক নাগরিক। তাদের জীবনধারা অনেক বেশি গতিশীল এবং কিছুটা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। নিজের ক্যারিয়ার, শখ এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়ে তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন।
খাদ্যাভ্যাস: জিভে যখন বিশ্বসেরা স্বাদ
আগের প্রজন্মের প্রিয় খাবার ছিল মায়ের হাতের খিচুড়ি বা বিকেলের মুড়ি মাখা। কিন্তু বর্তমান তরুণ প্রজন্মের খাদ্যাভ্যাসে এসেছে বিশাল পরিবর্তন। ঘরোয়া খাবারের চেয়ে এখনকার তরুণরা ‘কন্টিনেন্টাল’ বা ‘ফিউশন’ ফুড বেশি পছন্দ করেন।
ফাস্ট ফুড ও ক্যাফে সংস্কৃতি: পিৎজা, বার্গার, মোমো কিংবা পেরি-পেরি চিকেন এখন তাদের নিয়মিত খাদ্যতালিকায়।
কফি প্রেম: চায়ের কাপের জায়গা দখল করে নিয়েছে কোল্ড কফি বা ক্যাপুচিনো। বিভিন্ন থিম-ভিত্তিক ক্যাফে এখন তরুণদের প্রধান মিলনস্থল।
স্বাস্থ্য সচেতনতা: মজার বিষয় হলো, একদল তরুণ যেমন জাঙ্ক ফুডে অভ্যস্ত, অন্যদল আবার ভীষণ স্বাস্থ্যসচেতন। ডায়েট চার্ট মেনে চলা, ওটস বা সালাদ খাওয়া এবং জিম কালচার বর্তমান প্রজন্মের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
কাজের দুনিয়া
কাজের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি সাহসী। কেবল বিসিএস বা ব্যাংক জব নয়, তারা এখন নিজের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে উপার্জনের পথ খুঁজছে।
ফ্রিল্যান্সিং ও স্টার্টআপ: ঘরে বসে বিদেশের কোম্পানির কাজ করা বা নিজেই ছোটখাটো উদ্যোগ শুরু করা এখনকার তরুণদের বড় অংশ বেছে নিচ্ছে।
কনটেন্ট ক্রিয়েশন: ইউটিউব বা টিকটকের মাধ্যমে ভিডিও তৈরি করা এখন কেবল শখ নয়, একটি লাভজনক পেশা হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
মাল্টি-টাস্কিং: তারা একই সঙ্গে পড়াশোনা করছে, আবার পার্ট-টাইম কাজ বা ভলান্টিয়ারিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বাড়াচ্ছে।
কী দেখে আর কী পড়ে বর্তমান প্রজন্ম?
বিনোদনের সংজ্ঞাই বদলে গেছে গত এক দশকে। টেলিভিশন এখন ড্রয়িংরুমের শো-পিস ছাড়া আর কিছুই নয়। ওটিটি ও স্ট্রিমিং যেমন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম বা ইউটিউব হলো তাদের প্রধান বিনোদনের উৎস। তারা এখন হলিউড বা বলিউডের পাশাপাশি কোরিয়ান ড্রামা বা তুর্কি সিরিজ গোগ্রাসে গিলছে। অন্যদিকে গেমিং জগতেও তাদের অবাধ আনাগোনা। পাবজি, ফিফা বা ভ্যালোরেন্টের মতো অনলাইন গেমগুলো তাদের অবসর সময়ের বড় অংশ দখল করে আছে।
বই পড়ার অভ্যাস কমেছে— এ কথা পুরোপুরি ঠিক নয়। তবে মাধ্যম বদলেছে। কাগুজে বইয়ের চেয়ে তারা কিউবে (Kindle) বই পড়া বা অডিও বুক শুনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। থ্রিলার, ফ্যান্টাসি এবং সেলফ-হেল্প বা মোটিভেশনাল বই এখনকার তরুণদের প্রথম পছন্দ।
সমাজ ও রাজনীতি নিয়ে ভাবনা
বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতি নিয়ে অনীহা থাকলেও সামাজিক ইস্যুতে তারা দারুণ সোচ্চার। জলবায়ু পরিবর্তন, নারী অধিকার কিংবা কোটা সংস্কারের মতো ইস্যুতে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তোলে। তারা কোনো কিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করে না; বরং যুক্তি দিয়ে বিচার করতে চায়। তথ্যের অবাধ প্রবাহের কারণে তারা আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি তথ্যসমৃদ্ধ এবং সচেতন।
এই পরিবর্তন ভালো না মন্দ?
যেকোনো বড় পরিবর্তনেরই দুটি দিক থাকে। বর্তমান প্রজন্মের এই বদলে যাওয়াও তার ব্যতিক্রম নয়।
ইতিবাচক দিক: এখনকার তরুণরা অনেক বেশি দক্ষ, প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন এবং সাহসী। তারা বিশ্ববাজারে নিজেদের প্রমাণ করছে। তারা কুসংস্কারমুক্ত এবং প্রগতিশীল। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং অভিযোজন ক্ষমতা তাদের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।
নেতিবাচক দিক: অত্যধিক স্ক্রিন টাইম তরুণদের মধ্যে একাকিত্ব এবং বিষণ্নতা বাড়াচ্ছে। তাদের ধৈর্য কিছুটা কমেছে। সবকিছু তারা দ্রুত বা ‘ইনস্ট্যান্ট’ পেতে চায়। পারিবারিক বন্ধন আগের চেয়ে কিছুটা আলগা হয়ে পড়েছে এবং কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়ার কারণে তাদের নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
শেষ কথা
পরিশেষে বলা যায়, প্রতিটি প্রজন্মই তার নিজস্ব সময়কে প্রতিনিধিত্ব করে। আগের প্রজন্মের মতো আবেগ আর এখনকার প্রজন্মের মতো বুদ্ধিমত্তা— এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটানো প্রয়োজন। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম মেধাবী; তাদের সঠিক দিকনির্দেশনা এবং সুস্থ বিনোদনের সুযোগ করে দিলে তারাই বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। পরিবর্তন অনিবার্য, কিন্তু সেই পরিবর্তনের মাঝেও আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি আর মানবিক মূল্যবোধগুলো টিকিয়ে রাখাই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। তারুণ্যের জয়গান তখনই সার্থক হবে, যখন প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর হৃদয়ের আবেগ হাত ধরাধরি করে চলবে।