১৯৭৮ সালে লিবিয়ায় হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান শিয়া সম্প্রদায়ের ক্যারিশম্যাটিক ধর্মগুরু ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইমাম মুসা আল-সদর। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের এই নিখোঁজ-রহস্য ইতিহাসের পাতায় আজও অমীমাংসিত।
ইমাম মুসার গায়েব হওয়ার ঘটনায় লেবাননসহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে জন্ম নেয় অসংখ্য ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও জল্পনা-কল্পনা।
এর মধ্যে, ইরানের নিরাপত্তা সূত্র দাবি করে, গাদ্দাফির শাসনামলে ৩৩ বছর আগে শিয়া ধর্মগুরু মুসা আল-সদরকে হত্যা করে তার মরদেহ সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়।
এরপর, একটি ইরানি ওয়েবসাইটে শাহ শাসনামলের কিছু সূত্র দাবি করে, আল-সদর এবং তার দুই সঙ্গী শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব এবং সাংবাদিক আব্বাস বদরেদ্দিনকে গাদ্দাফি শাসনামলে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছিল। তাদের মরদেহ সিমেন্টের ব্লকের সঙ্গে সংযুক্ত করে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।
তবে সম্প্রতি, লিবিয়ায় একটি গোপন মর্গে ২০১১ সালে পাওয়া একটি মরদেহকে ঘিরে নতুন করে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে।ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানী অধ্যাপক হাসান উগাইল এই ছবিটি বিশ্লেষণ করে জানান—লিবিয়ার এক গোপন মর্গে পাওয়া এই মরদেহ মুসা আল-সদরেরই হতে পারে।
বিবিসি জানায়, ১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে জনপ্রিয় এই লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির আমন্ত্রণে ত্রিপোলি সফরে যান। সেসময় লেবানন গৃহযুদ্ধে জর্জরিত ছিল, দক্ষিণাঞ্চলে ফিলিস্তিনি যোদ্ধারা ইসরায়েলের সঙ্গে লড়াই করছিল। ইমাম মুসা গাদ্দাফিকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যেন, তিনি ফিলিস্তিনিদের প্রভাবিত করে লেবাননের সাধারণ মানুষকে সংঘাত থেকে রক্ষা করেন।
এরপর ৩১ আগস্ট সদরকে শেষবার ত্রিপোলির একটি হোটেল থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। গাদ্দাফির নিরাপত্তা বাহিনী দাবি করে, তিনি রোমে চলে গেছেন। কিন্তু পরে তদন্তে গাদ্দাফির সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত। এরপর থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ রহস্য, যা আজও শেষ হয়নি।
১৯২৮ সালে ইরানে জন্ম নেওয়া মুসা আল-সদর ১৯৫৯ সালে লেবাননে যান। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি লেবাননের শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন অগ্রগণ্য নেতা হয়ে ওঠেন। ১৯৭৪ সালে তিনি গঠন করেন মুভমেন্ট অব দ্য ডিপ্রাইভড, যা শিয়াদের সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সব ধর্মের নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য কাজ করত।
অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী এই নেতা খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের গির্জায়ও বক্তব্য রাখতেন। সকল ধর্ম বিশ্বাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন তিনি।
এ কারণেই শিয়ারা তাকে জীবিত অবস্থাতেই ‘ইমাম’ উপাধি দিয়েছিল, যা অত্যন্ত বিরল সম্মান। এমনকি তার গায়েব হয়ে যাওয়া নিয়ে শিয়া দ্বাদশী মতবাদে ‘গায়েব ইমাম’ নামে একটি ধারণারও জন্ম হয়েছে।
২০১১ সালে রহস্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। আরব বসন্তের সময় লিবিয়ায় বিপ্লব শুরু হলে কিছু অজানা তথ্য সামনে আসে।
এসময় লেবানিজ-সুইডিশ সাংবাদিক কাসেম হামাদে ত্রিপোলির এক গোপন মর্গে প্রবেশের সুযোগ পান। সেখানে প্রায় ১৭টি মরদেহ সংরক্ষিত ছিল—যার মধ্যে একটির উচ্চতা এবং গড়ন সদরের সঙ্গে মিলে যায়।
ছবিতে দেখা যায়, মৃতদেহটির মাথার খুলি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত—যা দেখে অনুমান করা হয়, হয়তো তাকে গুলি করা হয়েছিল। এরপর কাসেম মরদেহটির কিছু ছবি তোলেন এবং কিছু চুল সংগ্রহ করে লেবাননের রাজনৈতিক নেতাদের হাতে দেন ডিএনএ পরীক্ষার জন্য। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই নমুনাও গায়েব হয়ে যায়!
ব্রিটেনের ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসান উগাইল ও তার দল দেহটির ছবির সঙ্গে মুসা সাদরের জীবদ্দশার একাধিক ছবির তুলনা করেন। তাদের তৈরি ‘ডিপ ফেস রিকগনিশন’ অ্যালগরিদম অনুযায়ী, ছবিটি ৬০ শতাংশের বেশি মিলে যায়—যা প্রমাণ করে এটি হয়তো সদরের দেহ। যদিও নিশ্চিত প্রমাণের জন্য ডিএনএ পরীক্ষা অপরিহার্য।
এমনকি, এই অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে লিবিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার হাতে আটক হয় ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা বিবিসি টিম। ছয় দিন কারাগারে কাটানোর পর তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, গাদ্দাফি যুগের প্রভাবশালীরা এখনো এই রহস্য উন্মোচন হোক তা চান না।
আজও লেবাননের শিয়া রাজনীতি সদরের স্মৃতি ঘিরেই আবর্তিত হয়। তার প্রতিষ্ঠিত আন্দোলন ‘আমল’ বর্তমানে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল। আমলের নেতা ও লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি জোর দিয়ে বলেন—সদর জীবিত আছেন এবং লিবিয়ার কারাগারে আটক। যদিও কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রতি বছর ৩১ আগস্ট তাঁকে স্মরণ করে শোক পালিত হয়।
সুলতানা দিনা/