প্রতিদিন একটি রেলস্টেশন ও একটি রেলগাড়ি কতশত গল্প বলে; কখনো বিদায়ের, কখনো ফেরার, কখনোবা অপেক্ষার। এ দেশের মানুষের মন-প্রাণজুড়ে রয়েছে লৌহদানব রেলগাড়ি। বাংলাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন যে অন্তত একবার হলেও রেলগাড়িতে ওঠেনি। বাংলাদেশে রেল প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে অনেক রেলপথ ও ট্রেন চালু হয়েছিল। অধিকাংশ রেলপথ ও ট্রেন চালু থাকলেও কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে অনেক রেলপথ ও কালজয়ী কিছু ট্রেন। তেমনই এক ট্রেন ছিল ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’। ফল-ফলাদি ও ফসলের বিপুল ভাণ্ডার ও চাষক্ষেত্র বরিশাল জেলা ছিল এক সময় অনেক বিখ্যাত। সেই বরিশাল জেলার নিজস্ব নামে একটি ট্রেন ছিল। সেটাই বরিশাল এক্সপ্রেস। বর্তমান প্রজন্মের কাছে রহস্যময় লাগতে পারে যে, বরিশালে তো কোনো রেলপথ নেই, তা হলে কীভাবে সেই বরিশালের ট্রেন থাকে! তা হলে গল্পটা শুরুই করি।
শস্যভাণ্ডার নামে এই জেলাটির সঙ্গে অন্যান্য জেলার যোগাযোগব্যবস্থা কোনোকালেই ভালো ছিল না। ব্রিটিশ শাসন শুরু হওয়ার পর তারা এ দেশে রেলযোগাযোগ স্থাপনের কাজে হাত দিল কিন্তু বরিশালের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হলো না। সেই অঞ্চলের মানুষের ভরসা সেই নৌপথই থেকে গেল।
বরিশালে রেলপথ বসানো সম্ভব হলো না। তা হলে রেলপথ বা কোনো রেলস্টেশন ছাড়াই কি বরিশাল যেত বরিশাল এক্সপ্রেস? কীভাবে যেত? যদি যেতে না পারত, তা হলে কেন এই ট্রেনের নাম বরিশাল এক্সপ্রেস হলো। এই প্রশ্নের উত্তর পরে দিচ্ছি। আগে জেনে নিই বরিশাল এক্সপ্রেস ট্রেনের ইতিহাস ও বিস্তারিত।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে কলকাতার শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে দর্শনা হয়ে দুটো রেলপথ নির্মিত হলো। একটি গেল গোয়ালন্দ ঘাট এবং আরেকটি গেল পার্বতীপুর হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত। রেলকে ঘিরে জমজমাট হয়ে উঠল ওই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য। তখনো খুলনা অঞ্চলে রেল প্রতিষ্ঠা হয়নি। তবে খুলনা অঞ্চল ছিল বাণিজ্যের দিক থেকে চাকচিক্যপূর্ণ। তাই এ অঞ্চলে রেল প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব বুঝতে পেরে ব্রিটিশরা লন্ডনভিত্তিক কোম্পানি ‘বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে কোম্পানি’র আওতায় ১৮৮৪ সালে তিন বছরে নির্মাণকার্য সম্পন্ন করে প্রায় ২০২ কিলোমিটার রেলপথ প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৮৮৪ সালেই লৌহদানব অর্থাৎ ট্রেন ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’ চলতে শুরু করে। ফলে চালু হয় বরিশাল থেকে শিয়ালদহ পর্যন্ত রেলযোগাযোগ। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই গেল, বরিশালে রেলপথ ছাড়া রেলগাড়ি কীভাবে!
বরিশাল এক্সপ্রেস ছিল খুলনা রুটে চলাচলকারী প্রথম ট্রেন। বরিশাল এক্সপ্রেস যখন ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে খুলনা এসে থামত, মানুষ তখন অবাক চোখে বিস্ময় নিয়ে চেয়ে থাকত লৌহদানবের দিকে। খুলনা রেলওয়ে স্টেশন ভরে উঠতে থাকে কর্মমুখর মানুষে।
বরিশাল এক্সপ্রেস ট্রেনে ছিল চারটি শ্রেণির কোচ। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির। ভাড়াও ছিল সীমিত। এই ট্রেনের মাইলপ্রতি ভাড়া ছিল প্রথম শ্রেণিতে ১২ পয়সা, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ৬ পয়সা, তৃতীয় শ্রেণিতে ৩ পয়সা ও চতুর্থ শ্রেণিতে ছিল ২ পয়সা (আনুমানিক)। তবে ট্রেনটি ছিল বৈদ্যুতিক পাখাবিহীন অর্থাৎ কোচের ভেতরে ইলেকট্রিক কোনো ফ্যানের ব্যবস্থা ছিল না। ফ্যানের বাতাস ছাড়াই যাত্রীরা চলাচল করত ওই ট্রেনে। কোচের ভেতরে বৈদ্যুতিক পাখা যুক্ত হয় প্রায় ১৮ বছর পরে। বর্তমান যুগের বিলাসবহুল এসি ট্রেনে ভ্রমণ করে পাখাবিহীন সেই ট্রেনের কথা কল্পনা করা স্বপ্নাতীত। ট্রেনটির নাম্বার ছিল ৩১/৩২ বরিশাল এক্সপ্রেস। অর্থাৎ ৩১ আপ, কলকাতা (শিয়ালদহ) থেকে খুলনাগামী বরিশাল এক্সপ্রেস ছিল ৩১ আপ এবং কলকাতা অভিমুখী ছিল ৩২ ডাউন। বিভিন্ন নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ট্রেনটি সকাল ৮টায় কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করত এবং আনুমানিক দুপুর ১টার দিকে শিয়ালদহ রেলস্টেশনে পৌঁছাত। সেখান থেকে আবার দুপুর ১টা ৩০ মিনিটের দিকে খুলনার উদ্দেশে ছেড়ে আসে। এই তথ্য জানা যায় ১৯৪৪ সালের শিয়ালদহ স্টেশনের ট্রেনের সময়সূচি লেখা বোর্ডের একটি ছবি হতে।
.jpg)
কিন্তু ট্রেনটির নাম ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’ কেন? আর কীভাবেই-বা বরিশালের মানুষ এই ট্রেনে যাতায়াত করত? আদতে এই ট্রেনটি বরিশালে সরাসরি যেত না। তবে এই ট্রেনের সঙ্গে সংযুক্ত একটি স্টিমার ছিল। সেই স্টিমারের নামও ছিল ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’। ট্রেনটি কলকাতার শিয়ালদহ থেকে খুলনা আসত এবং তার পর সেই ট্রেনের বরিশালগামী যাত্রীরা ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’ স্টিমারে উঠত। সেই স্টিমার তাদের বরিশাল নামিয়ে দিয়ে আসত। স্টিমারটি ছিল মূলত কানেক্টিং স্টিমার, অর্থাৎ ট্রেনের সঙ্গে কানেক্টিং ফেরি। সকালে ফেরিতে যাত্রীরা আসত এবং বরিশাল এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে যে যার গন্তব্যে যেত। আবার কলকাতা থেকে খুলনা ফিরে আবার সেই স্টিমারে উঠে বরিশাল যেত। স্টিমারটিও পরিচালিত হতো রেলওয়ের অধীনেই। স্টিমারের সময়সূচি এমনভাবে নির্ধারণ করা হতো যেন বরিশাল থেকে নদীপথে স্টিমারে খুলনা এসে ট্রেন ধরে কলকাতা বা বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে পারে। আবার কলকাতা থেকে খুলনা ফিরে যেন স্টিমার ধরে যাত্রীরা বরিশাল ফিরতে পারে। বরিশালের সঙ্গে এভাবেই তখন রেলযোগাযোগ রক্ষা করা হতো। বরিশালবাসী কলকাতা যাত্রার সুবিধা এবং তারা যেন এমন মনে না করে যে তারা রেলসহ বিভিন্ন সেবা হতে বঞ্চিত, সে জন্যই এভাবে বরিশালের সঙ্গে রেলযোগাযোগ রক্ষা করা হতো তৎকালীন সময়ে।
লোকমুখে শোনা যায়, সেই সময়ে খুলনা রেলস্টেশনটি ছিল বর্তমান খুলনা নতুন রেলওয়ে স্টেশনের ঠিক বিপরীতে। অর্থাৎ বর্তমানে যেখানে রেলওয়ে টিটিই কলোনি, সেখানেই তৎকালীন সময়ে রেলস্টেশন ছিল। আর এর ঠিক পাশেই ছিল ফেরিঘাট (জায়গাটির নাম এখনো ফেরিঘাট আছে), সেখান থেকেই স্টিমারে উঠত বরিশালগামী যাত্রীরা।
এই বরিশাল এক্সপ্রেস ট্রেন দিয়ে খুলনা-বরিশাল অঞ্চলের শস্যাদিসহ বিভিন্ন ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য ও বিপুল পরিমাণ মাছ রপ্তানি করা হতো। ফলে এই ট্রেনের হাত ধরে এই অঞ্চলের মানুষ আধুনিক জীবনের ছোঁয়া পেয়েছিল।
আরো পড়ুন: যে গ্রামে জন্মালে মৃত্যু নেই!
সাতচল্লিশের দেশ ভাগের পর ট্রেনটি আন্তর্জাতিক ট্রেনের মর্যাদা পায়। ফলে দেশ ভাগের পর যাত্রীদের কলকাতা যেতে হলে ভিসা-পাসপোর্টের প্রয়োজন পড়ত। কিন্তু বাদ সাধে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে যায় ইতিহাসের কালজয়ী ট্রেন ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’। থেমে যায় তার লাইন দাপিয়ে বেড়ানো। বলে রাখা ভালো, সেই সময় আরও কয়েকটি ট্রেন চলাচল করত দুই দেশের মাঝে। যেমন- ঢাকা মেইল, দার্জিলিং মেইল, আসাম মেইল, সুরমা মেইল, নর্থ বেঙ্গল এক্সপ্রেস, ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস। কিন্তু ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের কারণে একে একে সব ট্রেনই বন্ধ হয়ে যায়।
আজ বরিশাল এক্সপ্রেস নেই, কিন্তু আছে তার রেখে যাওয়া স্মৃতি। কালের পরিক্রমায় অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। আজ সেই ধোঁয়া ওগরানো বাষ্পচালিত স্টিম ইঞ্জিনের জায়গা দখল করেছে উচ্চগতিসম্পন্ন আধুনিক ডিজেল ইঞ্জিন। ট্রেন এখন দ্রুতগতির ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন। তবুও রেলের খুলনা রুটের প্রতিটি কোণে কোণে ও ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে ‘বরিশাল এক্সপ্রেস’।
তারেক/
.jpg)
.jpg)