মঞ্চে যখন তাল ওঠে, তখন সময় থমকে যায়। শরীরের ভঙ্গিমা, পায়ের ছন্দ আর চোখের ভাষায় খুলে যায় শতাব্দীর পুরোনো গল্প। এমনই এক বহুমাত্রিক নৃত্যভাষার সন্ধ্যা উপহার দিল ছায়ানটের ‘শাস্ত্রীয় নৃত্য উৎসব’।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে একদিনের এই আয়োজনে এক মঞ্চে মঞ্চস্থ হয় উপমহাদেশের ছয় শাস্ত্রীয় নৃত্যরীতি। নৃত্যে পৌরাণিক আখ্যান, ঋতুর সৌন্দর্য আর তাণ্ডব-লাস্যের দ্বন্দ্বে গড়া মনিপুরী, ওড়িশি, কথক, ভরতনাট্যম, মোহিনিআট্টম ও কথাকলির পরিবেশনা দর্শকদের নিয়ে যায় ইতিহাস ও নান্দনিকতার এক গভীর ভ্রমণে।
‘শিবাষ্টকম’ স্তোত্রের নির্বাচিত শ্লোক অবলম্বনে দুর্গা রাগ ও খণ্ডচাপু তালে ভরতনাট্যম ‘শিববন্দনা’ পরিবেশন করেন অমিত চৌধুরী। রাগমালিকায় নিবদ্ধ এবং আদি তালে রচিত ‘শিব পদম’ পরিবেশন করেন জুয়েইরিয়াহ মৌলি। ভরতনাট্যমে ‘তিরুভালাঙ্গাডু কালী কৌথুভম’ পরিবেশন করেন অন্তরা সাহা। পরে তাল আদিতে তিন্নানা ভরতনাট্যম মার্গমের সর্বশেষ পরিবেশনা ‘কাডানাকুঙ্গুহালাম তিল্লানা’ পরিবেশন করেন সৃষ্টি কালচারাল সেন্টারের শিল্পীরা। ভরতনাট্যমে দলীয় পরিবেশনায় অংশ নেন ছায়ানটের শিল্পীরাও।
মনিপুরী নৃত্যরীতির সূক্ষ্ম লাস্য, কোমল দৃষ্টি ও আবেগঘন অঙ্গসঞ্চালনের মাধ্যমে ‘বসন্ত প্রবন্ধ’ পরিবেশন করেন তামান্না রহমান। সাত মাত্রার ‘তাল রাজমেল’ এবং চার মাত্রার ‘তাল তানচেপ’-এর মেলবন্ধনে মনিপুরী নৃত্য ‘তানুম’ পরিবেশন করেন সুইটি দাস। মন্দিরার তালে তালে নারীরা রাধাকৃষ্ণের ঝুলনলীলার মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন ওয়ার্দা রিহাব।
কবি জয়দেবের অষ্টপদী ‘ইয়াহি মাধব, ইয়াহি কেশব’ কাব্যের ওপর ভিত্তি করে মনিপুরী নৃত্যে ‘মানিনী রাধা’ পরিবেশন করেন সামিনা হোসেন প্রেমা।
মোহিনিআট্টম পরিবেশনায় লাস্য আঙ্গিকে ‘চোলচেট্টু’ পরিবেশন করেন সুদেষ্ণা স্বয়ংপ্রভা তাথৈ।
এরপর মঞ্চের ভাষা বদলে যায়। নৃত্যছন্দ দলের পরিবেশনায় ওড়িশি নৃত্যের ‘স্থায়ী বটু’ দর্শকদের নিয়ে যায় শুদ্ধ নৃত্তের কঠোর শৃঙ্খলায়। বেনজীর সালামের পরিচালনায় এই পরিবেশনায় দেবতা শিবের ‘বটুক ভৈরব’ রূপ যেন তালে তালে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানের আরেক পর্বে কথক নৃত্যের ভিন্ন ভিন্ন রূপ মঞ্চে ধরা দেয়। মাসুম হুসাইনের শুদ্ধ কথক পরিবেশনা দর্শকদের মনোযোগ কাড়ে। ১৬ মাত্রার ত্রিতালে চলন, ঠাট, উঠান, আমাদ ও লড়ির নিখুঁত সমন্বয়ে নৃত্যে ধরা পড়ে তাঁর তালজ্ঞান ও শরীরী ভাষার গভীর সাধনা। ‘কলাবতি তারানা’য় টুকরা, তেহাই, পরন ও লড়ি পরিবেশন করেন হাসান ইশতিয়াক ইমরান।
অদিতি রায়ের পরিবেশনায় ১৪ মাত্রার ধামার তালের কথক ছিল শক্তি ও সংযমের অনন্য মেলবন্ধন।
জয়ন্ত/রিফাত/