আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্ব, কোরবানির পশু বিক্রির অস্থায়ী হাট ইজারা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। এদিকে টিটনের পরিবার বলছে, বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ কয়েকজনের বিরোধ চলছিল।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) নিহত টিটনের ভাই সাঈদ আক্তার রিপন বাদী হয়ে নিউ মার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৮-৯ জনকে আসামি করা হলেও সন্দেহভাজন হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন- শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল (পিচ্চি হেলাল), বাদল ওরফে কালা বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ভাঙারি রনি।
পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, ঘটনাস্থলে কোনো ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসিটিভি) ক্যামেরা ছিল না। তবে আশপাশে থাকা সিটিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে হত্যাকারীদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। টিটনকে হত্যা করতে কয়জন এসেছিল, কয়টি মোটরসাইকেল এসেছিল, হত্যাকারীরা পালাতে কোন পথ ব্যবহার করেছে, তা উদঘাটনে তদন্ত চলছে।
গতকাল দুপুরে ময়নাতদন্ত শেষে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে টিটনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিহত টিটনের ডান কানের উপরিভাগে, বাম ভ্রুর উপরে কপালে, পিঠের বাম পাশের নিচে ও পিঠের ডান পাশের ওপরে, বাম হাতের কনুইয়ের ওপরের সামনের দিকে এবং বাম হাতের কনুইয়ের নিচে, বাম বগোলের নিচে আঘাতের চিহ্ন ছিল। এগুলো গুলির ক্ষত।
পরিবারে বক্তব্য:
টিটনের ভাই সাঈদ আক্তার রিপন অভিযোগ করেন, বছিলায় একটি কোরবানির পশুরহাট ইজারা নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন টিটন। এতে বাধা হয়ে দাঁড়ান শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, কালা বাদল, শাজাহান, ভাঙারি রনিসহ কয়েকজন। গত সোমবার টিটন আমাকে ফোন কলে জানায়, হাট ইজারাসংক্রান্ত ঝামেলা মিটমাট করতে উভয় পক্ষকে ডাকা হয়েছে। কিন্তু সমঝোতা হয়েছে কি না, তা আমি জানি না। হাট ইজারার বিরোধের কারণেও আমার ভাইকে তারা খুন করতে পারে।
গতকাল ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম জানান, টিটন হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি, মূলত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও হাট ইজারা নিয়ে দ্বন্দ্বে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা হয়েছে। মামলায় যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
যেভাবে খুন:
প্রত্যক্ষদর্শী ও তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নিউ মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলেন টিটন। আগে থেকে মোটরসাইকেলে অপেক্ষায় থাকা দুজনের মধ্যে একজন নেমে টিটনকে লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকেন। গুলির আঘাতে টিটন লুটিয়ে পড়লে কপাল বরাবর আরও একটি গুলি ছোড়েন হামলাকারীরা। তাদের দুজনের মুখে মাস্ক ও মাথায় ক্যাপ ছিল। পরে তারা আরও দুই রাউন্ড গুলি এলোপাতাড়ি ছুড়ে পালিয়ে যান। তাদের মোটরসাইকেলটি বিজিবি গেটের পাশ দিয়ে ইরাকি মাঠের দিকে চলে যায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের নিউমার্কেট জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ঘটনাস্থলের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তবে পালিয়ে যাওয়ার পথে অন্য জায়গার ফুটেজ পাওয়া গেছে। সেটা দেখে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ফুটেজ দেখে মোটরসাইকেলের মডেল ও নম্বর বের করতে পুলিশ কাজ করছে।
পুলিশ জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন। ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি বাড়তে থাকে। হাজারীবাগ ও ধানমন্ডি এলাকাজুড়ে তার নেতৃত্বে শক্তিশালী গ্রুপ তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে টিটন তার অপরাধমূলক কার্যক্রম বিস্তৃত করেন এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন। টিটন অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন ওরফে ক্যাপ্টেন ইমনের বোনকে বিয়ে করেছেন টিটন। তারা দুজনই একসময় হারিছ-জোসেফ গ্রুপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে তারা পৃথক হয়ে যান। একাধিক হত্যা মামলায় নাম আসে টিটনের। ব্যবসায়ী বাবর এলাহীকে হত্যার পর তার নাম নিয়ে বেশি আলোচনা হয়। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০১ সালে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকা করে সরকার। এই তালিকায় দ্বিতীয় নামটি ছিল টিটনের। ২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনকে গ্রেপ্তার করে। ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় টিটনকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।
তবে দুই দশক কারাবাসের পর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান টিটন। এরপর পুলিশের খাতা থেকে লাপাত্তা হয়ে যান। আত্মগোপনে থেকে পুনরায় অপরাধের অন্ধকার সাম্রাজ্য তৈরির চেষ্টায় ছিলেন তিনি। চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে তার নাম সরব হচ্ছিল।
২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর বেলা পৌনে ১১টায় পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের একসময়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে। তদন্তে উঠে এসেছে, এই হত্যার নেপথ্যে ছিলেন নাঈম আহমেদ টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন।