মাদক বিক্রি-সেবন, চাঁদাবাজি, দখল, খুনসহ নানা অপরাধে খুলনায় বখাটে কিশোর-যুবকদের জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। এসব কিশোর-যুবক বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় গ্যাং তৈরি করছে। বিশেষ করে মাদক বিক্রিতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব গ্যাংয়ে যুক্ত হচ্ছে উঠতি বয়সী শিশু-কিশোর ও স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীরা।
জানা যায়, গত দেড় বছরে খুলনা নগরীতে শতাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে মাদককেন্দ্রিক আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনক। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে খুলনায় দুটি খুন, আলাদা ঘটনায় কমপক্ষে পাঁচজনকে গুলি ও একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এসব অপরাধে উঠতি বয়সী কিশোর-যুবকদের সম্পৃক্ততা দেখা গেছে।
গত ১৬ এপ্রিল রাতে খুলনার ফুলতলায় ছুরিকাঘাতে সাব্বির হোসেন নামে দশম শ্রেণির এক ছাত্র নিহত হয়। একই ঘটনায় আরেক যুবক গুরুতর জখম হয়। পূর্বশত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় এসব ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবীর সিদ্দিকী শুভ্র জানান, হামলাকারী এবং যারা হতাহত হয়েছে তারা একে অপরের বন্ধু। ৪-৫ দিন আগে তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধের জের ধরে ঘটনাটি ঘটেছে।
১৭ এপ্রিল লবণচরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রায়হান শেখ ওরফে মিঠু (১৯) নামে এক যুবককে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। ১৯ এপ্রিল মাদকের চালান পরিবহন না করায় নগরীর ৫ নম্বর ঘাট এলাকায় একই পরিবারের নারীসহ চারজনকে কুপিয়ে জখম করা হয়। ১২ এপ্রিল খুলনায় নয়াবাটি এলাকায় ছুরিকাঘাতে তাঁতী দলের ১০ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি মো. সোনামিয়া নিহত হন। তিনি নয়াবাটি এলাকার বাসিন্দা জব্বার সরদারের ছেলে।
সর্বশেষ ১ মে লবণচরা সাচিবুনিয়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে মোহাম্মদ তাইজুল নামে এক যুবক আহত হন। দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত এসে তাইজুলকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এ সময় একটি গুলি তার বাম পায়ের হাঁটুতে বিদ্ধ হয়।জানা যায়, খুলনায় ছয়টি সন্ত্রাসী গ্রুপ মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে।
২০২৪ সালে ৫ আগস্টের পর মাদক সিন্ডিকেটের গডফাদাররা আত্মগোপনে গেলে নিচের সারির কারবারিরা বাজার দখলে নিতে গ্যাং তৈরি করেছে। পাড়া-মহল্লায় পুলিশের চোখে ফাঁকি দিতে উঠতি বয়সী কিশোর-যুবকদের মাদক বিক্রির কাজে লাগানো হয়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তারা নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়িয়ে মাদক বিক্রি করে। এ ছাড়া মোটরসাইকেলে করে নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে মাদক পৌঁছে দেওয়া হয়। দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কিশোর গ্যাং চক্রের যোগাযোগ রয়েছে। তাদের হাতে অস্ত্র থাকায় উদ্বেগ ছড়াচ্ছে বেশি।
সচেতন নাগরিকদের সংগঠন খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব বাবুল হাওলাদার বলেন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে নতুন করে বখাটে গ্যাংয়ের উত্থান ঘটে। মাদক নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তারাই উঠতি বয়সী কিশোরদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছে। এতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটে সাধারণ মানুষের।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জাহিদুল হাসান বলেন, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে পুলিশের কোনো সদস্যের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদক পাচারের রুট হিসেবে ঢাকা-খুলনা সড়ক ব্যবহার করায় যাত্রীবাহী বাসে নিয়মিত তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ৩০ দিনের মধ্যে ২০ দিনই হরিণটানা থানা পুলিশ বিভিন্ন বাস থেকে মাদক উদ্ধার করছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ও পাড়া-মহল্লায় পুলিশ টহল বাড়ানো হয়েছে।