গত দুই দিনে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খালে মাছ-কাঁকড়া ধরার সময় ও মধু আহরণের সময় ২০ থেকে ২৫ জন জেলে-মৌয়ালকে অপহরণ করার খবর পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১৬ জেলে ও মৌয়ালের নাম পরিচয় পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় সুন্দরবননির্ভর বনজীবীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
মঙ্গলবার (৫ মে) বিকেলে গহীন সুন্দরবন থেকে লোকালয়ে ফিরে আসা অপহৃত জেলেদের সঙ্গে থাকা সহযোগীরা এ তথ্য জানান।
অপহৃত বনজীবীদের সঙ্গী ইমরান হোসেন, আকবর হোসেন ও আব্দুল্লাহসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত সোমবার (৪ মে) সকাল থেকে মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুর পর্যন্ত সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ চুনকুড়ি নদীর গোয়ালবুনিয়া দুনের মুখ, ধানো খালীর খাল, মামুন্দো নদীর মাইটভাঙা খাল ও মালঞ্চ নদীর চালতেবাড়ি খালে মাছ-কাঁকড়া ধরা ও মধু আহরণের সময় সশস্ত্র বনদস্যুরা আসে। তারা নিজেদের ‘আলিম ওরফে আলিফ বাহিনী’ ও ‘ডন বাহিনী’ পরিচয় দিয়ে প্রতিটি নৌকা থেকে একজন করে জিম্মি করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।
নাম পরিচয় পাওয়া অপহৃত জেলেরা হলেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের চুনকুড়ি এলাকার মোস্তফা কামালের ছেলে আল-মামুন (১৬), খালেক মোল্লার ছেলে মনিরুল মোল্লা (২৬), গণেশ মন্ডলের ছেলে সঞ্জয় মন্ডল (২৫), সুবল মন্ডলের ছেলে হৃদয় মন্ডল (৪৭), মৃত আব্দুল হাই-এর ছেলে রবিউল ইসলাম বাবু (৩৫), হামিদ উল্লাহর ছেলে রবিউল ইসলাম (২৪), দাউদ গাজীর ছেলে শুকুর আলী গাজী (৩২), হুমায়ুন (২৭), ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধমঘাট হেতালখালি এলাকার কাওসার গাজীর ছেলে আব্দুল সালাম (৪৫), আবু কাওসারের ছেলে আবুল কালাম (৪৭), রমজাননগর ইউনিয়নের বড় ভেটখালী এলাকার ফরহাদ গাজীর ছেলে শাহাজান গাজী (৫০) ও সিরাজ গাজী (৪০), জুলফিকার মোড়লের ছেলে আবুল বাসার বাবু (৩৭), ছোট ভেটখালী এলাকার আলমগীর হোসেনের ছেলে আল-আমিন (৩৫), ইব্রাহিম গাজী (৫৫) এবং হরিনগর এলাকার মুরশিদ আলম (৩৫)। এ ছাড়াও অপহৃত অন্য বনজীবীদের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেননি সঙ্গীরা।
অভিযোগ রয়েছে, অপহরণের পরপরই দস্যুরা কয়েকজন ভুক্তভোগীর পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করেছে। ইব্রাহিমের জন্য ৩০ হাজার টাকা, মুরশিদের জন্য ১ লাখ টাকা এবং আব্দুল সালামের জন্য ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে। তবে অন্য অপহৃতদের বিষয়ে এখনো কোনো দাবি জানায়নি দস্যুরা।
ভুক্তভোগীদের কয়েকজন স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একই বাহিনীর বিরুদ্ধে এর আগেও সুন্দরবনে অপহরণ, মুক্তিপণ ও চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, প্রশাসনের দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দস্যুরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং সুযোগ পেলেই জেলে-মৌয়ালদের টার্গেট করছে।
স্থানীয় জেলে, মৌয়াল ও বনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন দস্যুরা শুধু মানুষ অপহরণেই সীমাবদ্ধ নেই তারা বনজ সম্পদ লুটপাট এবং বন্যপ্রাণী শিকারের মতো অপরাধেও জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা ফজলুল হক বলেন, কয়েকজন বনজীবী অপহরণের খবর আমরা শুনেছি। তবে অপহৃতদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের পরিবার বা সহযোগীরা বিস্তারিত তথ্য দিতে অনীহা দেখাচ্ছেন।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, এ ধরনের ঘটনায় অনেক সময় জেলেরা নিজেরাই আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেন। সাধারণত জিম্মি বনজীবীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের স্বজনরা প্রশাসনকে কিছুই জানায় না। তবে পুলিশ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে বলে জানান তিনি।
শাহাজান সিরাজ/নাঈম