বলিউড কিংবদন্তি অভিনেতা ধর্মেন্দ্র। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে অভিনয় করেছেন তিনি। খ্যাতিমান এই অভিনেতার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল রোমান্টিক নায়ক হিসেবে, পরবর্তী সময়ে অ্যাকশন হিরো হিসেবে বিশেষভাবে দর্শকদের হৃদয় কাড়েন।
১৯৬০ সালে ফিল্মফেয়ার আয়োজিত প্রতিভা প্রতিযোগিতায় জিতে তিনি বলিউড সিনেমায় সুযোগ পান। প্রথম ছবি ‘দিল ভি তেরা, হাম ভি তেরে’।
১৯৬১-তেই ‘শোলা অওর শবনম’-এ নজর কাড়েন ছাব্বিশ বছর বয়সী সুদর্শন নায়ক। কিন্তু জনপ্রিয়তা আসে ‘শোলা অউর শবনম’ আর ‘বন্দিনী’ সিনেমা দিয়ে। ১৯৬৯ সালে হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘সত্যকাম’ ছবিটি ধর্মেন্দ্রর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতে তিনি অভিনয় করেন এক আদর্শবাদী মানুষের চরিত্রে, যে বিয়ে করেন এমন এক নারীকে, যিনি যৌন সহিংসতার শিকার ও সমাজের চোখে ‘কলুষিত’।
পাঞ্জাবের লুধিয়ানার গ্রাম থেকে উঠে আসা ধর্মেন্দ্রর নাম ছিল ধরম সিংহ দেওল। বলিউড তাকে ‘ধর্মেন্দ্র’ হিসেবে খ্যাতিমান করেছে। হৃষিকেশ মুখার্জি পরিচালিত ‘গুড্ডি’ (১৯৭১) ছবিতে ধর্মেন্দ্র অভিনয় করেছিলেন ধর্মেন্দ্রর ভূমিকায়।
তখন বলিউড সিনেমায় এমন ঘটনা একেবারেই ব্যতিক্রম। একজন অভিনেতা নিজের চরিত্রেই পর্দায় অবতীর্ণ হবেন, এ কথা ভাবা বেশ দুরূহ ছিল সেই সময়ে। অথচ ঘটনাটি ঘটেছিল। পর্দা আর বাস্তবের দূরত্ব গুছিয়ে ধর্মেন্দ্র হয়ে উঠেছিলেন দর্শকদের প্রিয় নায়ক।
মূলধারার হিন্দি ছবি তখন রোমান্টিক গল্পে ভরপুর। রোমান্টিক গল্পের জয়জয়কার। তাই ধর্মেন্দ্রর শুরুটাও হয়েছিল রোমান্টিক নায়ক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে নিজের রোমান্টিক ইমেজ ভেঙে রীতিমতো মারকুটে অ্যাকশন হিরো হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন রুপালি পর্দার দুনিয়ায়। ধর্মেন্দ্র এমনই একজন অভিনেতা, যিনি কালের দাবি মেনে নিজের ইমেজকে ভেঙেছেন-গড়েছেন।
সত্তরের দশকে হিন্দি মূলধারার ছবির আদল পাল্টে যেতে থাকে। ওলটপালট শুরু হয় গল্পবলা ও নির্মাণে। পর্দায় উঠে আসতে থাকেন ‘রাগী যুবকেরা’। স্বপ্ন দেখার বা দেখানোর দিন তখন অতীত। স্বপ্নভঙ্গের কাহিনি দিয়েই বলিউড তার পসরা সাজাতে শুরু করে।
১৯৭১-এর ছবি ‘মেরা গাঁও মেরা দেশ’-এই যে হিন্দি ছবির ঘরানা-বাহিরানা অনেকাংশে বদলে যাবে, তা সেই সময় হয়তো বোঝা যায়নি। সেই ছবির নায়ক ছিলেন ধর্মেন্দ্র। শহুরে খলনায়ক নয়, বরং ‘ডাকু’র বিরুদ্ধে গ্রাম বাঁচানোর লড়াই। আর এমন গল্পে দর্শক নতুন এক ধর্মেন্দ্রকে দেখে। এই সিনেমার সাফল্যে ধর্মেন্দ্র কাজ করেন ‘শোলে’তে। এটি ভারতীয় সিনেমার মোড় ঘোরানো একটি সিনেমা হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত। এই ছবিতে অমিতাভ বচ্চন ও ধর্মেন্দ্রর অভিনয় মুগ্ধ করেন দর্শকদের।
পরে অসংখ্য বাণিজ্যসফল ছবিতে দেখা গিয়েছে ধর্মেন্দ্রকে। তখন তিনি বলিউডের থার্ডথ্রব নায়ক। তারকা অভিনেত্রী হেমা মালিনী শুধু তার পর্দার নায়িকা হয়েই থাকেননি। হয়েছেন জীবনের নায়িকাও।
দীর্ঘ কর্মজীবন। একসঙ্গে অনেক সিনেমার কাজ। বিবাহিত হওয়ার পরও ধর্মেন্দ্র হেমা মালিনীর মতো ‘স্বপ্নসুন্দরী’র সঙ্গে ঘর বাঁধেন ভালোবেসে। অভিনয় ও সংসার জীবনের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সাফল্য পেয়েছেন তিনি। বৃদ্ধাবস্থাতেও অ্যাকশন ছবিতে অভিনয় করে যেতে হয়েছে তাকে। ক্লান্ত লেগেছে ১৯৯০-এর দশক ও তার পরবর্তী সময়ের ছবিগুলোতে।
জীবন সায়াহ্নে এসে এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটালেন ধর্মেন্দ্র। ২০২৩ সালে ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’ সিনেমায় অভিনয় করে। করণ জোহর পরিচালিত এই ছবির গল্প ছিল পারিবারিক কমেডি ঘরানার। ছবিতে দেখা যায়, ধর্মেন্দ্র হুইলচেয়ারে বন্দি এক বৃদ্ধ। অ্যামনেশিয়ার রোগী সেই চরিত্রের স্মৃতি প্রায় লুপ্ত। কেবল মাঝে মাঝে মস্তিষ্কে ঝলক দিয়ে যায় ‘যামিনী’ নামে এক নারী।
কে এই যামিনী, সন্ধানে নামে বৃদ্ধের নাতি। খোঁজও মেলে তার, বৃদ্ধা যামিনীর কাছ থেকে জানা যায়, একবার এক শৈলশহরে কমল নামে এক যুবকের সঙ্গে তার হৃদয় বিনিময় হয়েছিল। সেই কমলই আজকের স্মৃতিভ্রষ্ট বৃদ্ধ। যামিনী তার পরিবার নিয়ে দেখা করে কমলের সঙ্গে। প্রাথমিক অবস্থায় তাকে চিনতে পারেনি কমল। তার পর যখন সে ফিরে যাচ্ছে, হুইলচেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কমল গেয়ে ওঠে শাপির লুধিয়ানভির লেখা ‘হম দোনো’।
যামিনীরূপী শাবানা আজমির কণ্ঠেও ধ্বনিত হয় সেই গানের কলি। ধর্মেন্দ্রের দুই চোখে ভেসে উঠছে কয়েক যুগ ধরে জমিয়ে রাখা প্রেম, হাসি-অশ্রুর অতীত সেই অভিব্যক্তি। পাঞ্জাবের এক মাটির ছেলে ধর্মেন্দ্র ছয় দশকেরও বেশি সময় বলিউডে অভিনয় করে সিনেমাকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। কাজের মাধ্যমে কিংবদন্তি এই অভিনেতা বেঁচে থাকবেন দর্শকদের হৃদয়ে। সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা তার গল্পগুলো অনুপ্রেরণা জোগাবে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সিনেমাপ্রেমী প্রজন্মকে।
/এমএস