কলকাতার সিনেমায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। গত ২৭ মে আচমকা মৃত্যু হয় খ্যাতিমান চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্তের। তার মৃত্যু ঘিরে এখনও চলছে তদন্ত, তবে প্রাথমিকভাবে পুলিশ এটিকে আত্মহত্যার ঘটনা বলেই মনে করছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি চিঠি উদ্ধার হয়েছে, যা তার সুইডেনপ্রবাসী একমাত্র মেয়ের উদ্দেশে লেখা বলে জানা গেছে।
কলকাতার হিন্দুস্তান পার্ক এলাকার একটি বহুতল আবাসনের ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হন অনীক দত্ত। দ্রুত তাকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতে লেখা চিঠি, একটি সিনেমাটোগ্রাফি-বিষয়ক ম্যাগাজিন এবং পরিচালকের জুতা উদ্ধার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য আলামত খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগজনিত সমস্যার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন অনীক দত্ত। তার মৃত্যুর জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি বলেও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নন্দনে শেষ শ্রদ্ধা, নিউ থিয়েটার্সে আবেগঘন বিদায়
পরিচালকের মৃত্যুর পরদিন সকালে তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নন্দনে। সেখানে অনুরাগী, সহকর্মী এবং টলিউডের অসংখ্য শিল্পী তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় টলিপাড়ার ঐতিহ্যবাহী নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন সৃজিত মুখোপাধ্যায়, রুদ্রনীল ঘোষ, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়, জিতু কমল, সৌরভ দাস-সহ চলচ্চিত্র জগতের বহু পরিচিত মুখ।
বাবাকে শেষ বিদায় মেয়ের কণ্ঠে
সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয় যখন পরিচালকের নিথর দেহের পাশে বসে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে তাকে শেষ বিদায় জানান একমাত্র মেয়ে ঐশী। পাশে ছিলেন অনীকের প্রাক্তন স্ত্রী সন্ধি দত্তও।
ঐশী গেয়ে ওঠেন- ‘পুরানো সেই দিনের কথা’। গান গাইতে গাইতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। উপস্থিত অনেকের চোখেও জল চলে আসে। স্টুডিওজুড়ে নেমে আসে এক গভীর নীরবতা। পরিবারের ঘনিষ্ঠদের ভাষ্য, বাবা-মেয়ের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত নিবিড়। তাই বিদায়ের সেই মুহূর্ত আরও বেশি আবেগঘন হয়ে ওঠে।
পরে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে সম্পন্ন হয় পরিচালকের শেষকৃত্য। বাবার শেষকৃত্যের দায়িত্ব পালন করেন মেয়ে ঐশী।
মেয়েকে লেখা শেষ চিঠিতে কী ছিল?
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, মেয়ের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে অনীক দত্ত নিজের মানসিক ক্লান্তি, হতাশা এবং কিছু ব্যক্তিগত যন্ত্রণার কথা উল্লেখ করে গেছেন। পাশাপাশি কয়েকজন বন্ধু ও পরিচিতজনের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে চিঠিতে কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করা হয়নি।
চিঠির ভাষা ও হাতের লেখা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
বাংলা সিনেমায় অনীক দত্তের অবদান
ভূতের ভবিষ্যৎ ছবির মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে স্বতন্ত্র পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন অনীক দত্ত। রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং মধ্যবিত্ত জীবনের নানা সংকটকে তিনি অনন্য শৈলীতে পর্দায় তুলে ধরতেন।
তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে অপরাজিত, মেঘনাদবধ রহস্য, বরুণবাবুর বন্ধু, ভবিষ্যতের ভূত এবং যত কাণ্ড কলকাতাতেই। তার চলচ্চিত্রে বারবার ফিরে এসেছে কলকাতার স্মৃতি, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং সমাজ-রাজনীতির সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ।
অনীক দত্ত আর নেই, কিন্তু তার নির্মিত চরিত্র, সংলাপ, ব্যঙ্গরস এবং চলচ্চিত্রভাষা বাংলা সিনেমার দর্শকদের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।
.jpg)
