দশম পর্ব
মোহসীন আহমেদ ও আনোয়ারা বেগম আবেগ আর বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে মোহিনীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
ট্রাস্টি বোর্ডের প্রথম বৈঠকেই একটি আধুনিক হাসপাতাল ও একটি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হলো। মোহসীন আহমেদ নিজেই এই প্রস্তাব উত্থাপন করলেন। বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে তার প্রস্তাব পাস হলো। খুব শিগগিরই কাজ শুরুর সিদ্ধান্তও নিল ট্রাস্টি বোর্ড। মোহসীন আহমেদ নিজের অফিসে শেষবারের মতো বিদায় নিতে গেলেন। শত শত কর্মী চোখের জলে বিদায় দিলেন তাকে। কিন্তু কে জানত, এই বিদায়ই তার শেষ বিদায়!
মোহসীন আহমেদ অফিস থেকে বাসায় ফিরলেন। একদিন পরই তার জ্বর শুরু হলো। জ্বরের সঙ্গে সর্দি, কাঁশি, গলাব্যথা। করোনার সবগুলো সিমটমই তার রয়েছে। আনোয়ারা বেগম ও মোহিনী চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তারা বিলম্ব না করে তাকে রাজধানীর একটি অভিজাত হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। সেখানে তার করোনা পরীক্ষা হলো। তার পর সিটিস্ক্যান করা হলো। প্রথমে সিটিস্ক্যানে করোনা ধরা পড়ল। তার পর এল করোনার রিপোর্ট। তাতেও দেখা গেল মোহসীন আহমেদ করোনা পজিটিভ। পরে আনোয়ারা বেগম ও মোহিনীর সিটিস্ক্যান ও করোনা পরীক্ষা করা হলো। তারা উভয়েই নিরাপদ!
কিছুটা বিস্মিত হয়েই আনোয়ারা বেগম বললেন, আমরা তো একসঙ্গেই ছিলাম! অথচ আমার কিছু হয়নি! মোহিনীরও কোনো সমস্যা হয়নি! করোনাভাইরাস নাকি ভয়ানক ছোঁয়াচে!
হাসপাতালে মোহসীন আহমেদের চিকিৎসা শুরু হলো। তার চিকিৎসায় যাতে কোনো ত্রুটি না হয় সে জন্য সিনিয়র চিকিৎসকদের নিয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হলো। শিল্পপতির চিকিৎসা দিতে সবাই যেন ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও প্রতিদিন মোহসীন আহমেদের খোঁজখবর করছেন। তারা বারবার চিকিৎসকদের সাবধান করছেন এই বলে, খবরদার! তার চিকিৎসার যেন কোনো ত্রুটি না হয়! তিনি আমাদের দেশের এক রত্ন!
কী আশ্চর্য! তিন দিন পর দেখা গেল, মোহসীন আহমেদের স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটেছে! সবাই বিস্মিত! এটা কী করে সম্ভব! তিন দিনে তার অবস্থার উন্নতি হওয়ার কথা! সেখানে অবনতি!
আনোয়ারা বেগম, মোহিনীই শুধু নয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও ভাবলেন, মোহসীন আহমেদের চিকিৎসায় ঘাটতি রয়েছে। কোথাও না কোথাও গাফিলতি আছে। তা না-হলে অবনতি ঘটবে কেন! সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা পেলে তিন দিনে তার ভালো হয়ে যাওয়ার কথা!
চিকিৎসকরা ছোটাছুটি শুরু করলেন। কোথাও কোনো ত্রুটি আছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন। না, কোথাও কোনো সমস্যা তারা খুঁজে পাচ্ছেন না। তারা আরও সতর্কতার সঙ্গে রোগীকে সেবা দিতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। রোগীর অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এখন যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে বিদেশে নেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। যেকোনো মুহূর্তে অঘটন ঘটে যেতে পারে। তাই আনোয়ারা বেগম কিংবা মোহিনী ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না। তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই আরও বেশি যত্নশীল হওয়ার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিলেন।
আসলে মৃত্যুদূত যখন সামনে এসে দাঁড়ায় তখন কারোরই কিছু করার থাকে না। সবাই তখন অসহায়। কেবল তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। পৃথিবীর সেরা চিকিৎসাও তখন নিরুপায়। তাদের কাছেও থাকে না মৃত্যুযন্ত্রণা উপশমের কোনো দাওয়াই।
টানা সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে পরাস্ত হলেন শিল্পপতি মোহসীন আহমেদ। অর্থ, প্রভাব-প্রতিপত্তি কোনো কিছুই তার মৃত্যুকে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না। তিনি চিরদিনের জন্য পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন।
মোহসীন আহমেদের আকস্মিক মৃত্যুতে আনোয়ারা বেগম ও মোহিনীর মাথায় যেন আকাশ ভেড়ে পড়ল।
৯
আসিফ আহমেদের মোবাইলে সাংবাদিক স্বদেশ রায়ের ফোন। কয়েকবার রিং বাজার পর আসিফ ফোন ধরে হ্যালো বলতেই স্বদেশ রায় বললেন, ভাই কেমন আছেন?
আসিফ বললেন, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
আমি তো একটা বড় উদ্যোগ নিয়েছি। সারাক্ষণ নামে একটি মিডিয়া গ্রুপ করেছি। এই গ্রুপ থেকে পত্রিকা, অনলাইন, রেডিও এবং টিভি নিয়ে আসছি।
তাই নাকি! বাহ! অনেক বড় প্রজেক্ট মনে হচ্ছে!
হ্যাঁ ভাই। বড় প্রজেক্ট। এত বড় প্রজেক্ট আমার একার পক্ষে তো সামাল দেওয়া সম্ভব না! তাই, আপনার ব্যাপারটা আমি মাথায় রেখেছি। আপনি যে চাকরি ছেড়েছেন সেটা আমি জানি। কাজটা আপনি ভালোই করেছেন। সহকর্মীদের ছাঁটাই না করে নিজেই ছেড়ে এসেছেন! এতে আপনার ভাবমূর্তি অনেক উজ্জ্বল হয়েছে। ভাই, আপনি কিন্তু আমার সঙ্গে থাকবেন!
তাই! আচ্ছা! আমার কথা যে ভেবেছেন এজন্য ধন্যবাদ।
একটা কথা আমি বলতে পারি ভাই! আমার সঙ্গে বাজবে না! আমি সবার সঙ্গে মিলিয়ে চলার মানুষ। আপনি যেভাবে থাকতে চান সেভাবেই আপনি থাকবেন।
অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু আপনি কী ভেবেছেন? মানে আমাকে কীভাবে রাখতে চান?
ভাই, অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান! সারাক্ষণ পত্রিকার ডামি হচ্ছে। অনলাইন ইতোমধ্যেই চালু করার ব্যবস্থা হয়েছে। একদিন আমরা বসব। করোনাটা একটু নিয়ন্ত্রণে আসুক! একসঙ্গে বসে সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করব। সেখানেই আমরা কথা বলে নেব। আর শোনেন, উদ্বোধনী সংখ্যায় আপনি কিন্তু লিখবেন!
তা লিখব। কিন্তু আপনার গ্রুপের নাম কী?
সারাক্ষণ মিডিয়া লিমিটেড।
সেটা না। আমি জানতে চাচ্ছি, কোন গ্রুপ অর্থ জোগান দিচ্ছে?
ইকবাল ভাই। ইকবাল সাহেবকে চেনেন তো! ইকবাল টাওয়ার যার নামে! ব্যাংকও আছে এদের। অনেক বড় ব্যবসায়ী। আপনি নিশ্চয়ই তাকে চেনেন!
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন-
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯