উচ্চমানের গবেষক হিসেবে তিনি হাইপো থিসিসে বিশ্বাসী ছিলেন না। যা দেখেছেন, যা পেয়েছেন সেই সত্যের সাধনা তিনি করেছেন। সে কারণে বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে প্রমাণক বস্তুনিষ্ঠতায় ইতিহাসের সত্যকে এবং ইতিহাসের স্রষ্টা ও রাজনীতির অমর নায়কদের যথাযোগ্য স্থানে তিনি অধিষ্ঠিত করেছেন। এই নির্জলা নিরপেক্ষতা এবং সর্বজনগ্রাহ্যতাই লেখক, গবেষক, শিল্পী ও স্রষ্টা হিসেবে তিনি সবার কাছে ভিন্নতর উচ্চ মর্যাদায় বরিত হয়েছেন। ফলত জীবনব্যাপী সৃজন প্রতিভাকে তিনি সমানভাবে সক্রিয় রেখেছেন। অগ্রপথিক হিসেবে সাধনা করেছেন নান্দনিক শিল্প ভাষ্যের।…
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক (১২ সেপ্টেম্বর ১৯২৯-০২ অক্টোবর ২০২৫) ছিলেন অমরত্বের অগ্রপথিক। সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে বহুবিধ এবং বিচিত্র পথ তিনি তার নবতিপর বয়স অবধি পাড়ি দিয়েছেন। রাজনীতি, লেখালেখি, গবেষণা ইত্যাদি নানা পথে হেঁটেছেন তিনি। তিনি সাধারণ মানের কোনো পথিক ছিলেন না। ছিলেন পথিকৃৎ। নতুন পথের নির্মাতা। তিনি একমাত্র ভাষাসংগ্রামী, যিনি প্রত্যক্ষভাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন এবং তার দেখা প্রত্যক্ষ বাস্তবতার আলোকে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাসকে নির্মহ বাস্তবতার আলোকে উৎকলিত করেছেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনের নানা দিক নিয়ে এককভাবে অধিক সংখ্যক প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। বামপন্থি রাজনীতির সমর্থক ও কর্মী হয়েও নির্দলীয় ভাবনা থেকে তিনি দেশভাগ, বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতা এবং সংস্কৃতি নিয়ে প্রায় শতাধিক আকর গ্রন্থ রচনা করেছেন। দুই বাংলা মিলে রবীন্দ্র সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক ও লেখক ছিলেন তিনি। এককভাবে বিশের অধিক রবীন্দ্রবিষয়ক গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে গড়ে তুলেছেন রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র ট্রাস্ট। পাশাপাশি নজরুল, জীবনানন্দ, বিষ্ণু দে প্রমুখ সার্বভৌম কবিদের গৌরবগাথাও তিনি রচনা করেছেন। মূলত অধ্যাপক না হয়েও বিদ্যায়তনিক গবেষণায় তিনি যে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন বাংলাদেশের গবেষণার ইতিহাসে অভূতপূর্ব। উচ্চমানের গবেষক হিসেবে তিনি হাইপো থিসিসে বিশ্বাসী ছিলেন না। যা দেখেছেন, যা পেয়েছেন সেই সত্যের সাধনা তিনি করেছেন। সে কারণে বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে প্রমাণক বস্তুনিষ্ঠতায় ইতিহাসের সত্যকে এবং ইতিহাসের স্রষ্টা ও রাজনীতির অমর নায়কদের যথাযোগ্য স্থানে তিনি অধিষ্ঠিত করেছেন। এই নির্জলা নিরপেক্ষতা এবং সর্বজনগ্রাহ্যতাই লেখক, গবেষক, শিল্পী ও স্রষ্টা হিসেবে তিনি সবার কাছে ভিন্নতর উচ্চ মর্যাদায় বরিত হয়েছেন।
নড়াইল মহকুমা স্কুলে অধ্যয়নকালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। মুন্সীগঞ্জে উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনার সময় ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। এরপর স্নাতক সম্মান শ্রেণিতে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। হলে সিট না পেয়ে পরে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তিনি জোরালোভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলে সামনের সারিতে ছিলেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি সমমনা কয়েকজনকে নিয়ে শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের অপরাধে ১৯৫৪ সালে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। প্রায় দেড় বছর কারাগারে বন্দি ছিলেন। মুক্তি পেয়ে ১৯৫৭ সালে উচ্চ নম্বর পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাকে ইন্টার্নশিপ করতে দেয়নি। ফলে তার আর চিকিৎসক হওয়া সম্ভব হয়নি।
এ সময় তার সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। প্রথমত ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মওলানা ভাসানী, তোয়হা, তাজউদ্দিন, অলি আহাদ প্রমুখের মতো সার্বক্ষণিক রাজনীতি করা। দ্বিতীয়ত, লেখালেখি করা। তিনি দ্বিতীয়টি বেছে নেন এবং লেখক হিসেবে নিজেকে প্রায় সার্বক্ষণিক ব্যাপিত রাখেন। পাশাপাশি তিনি একটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির নির্বাহী হিসেবে যোগদান করেন। সেখান থেকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সমমনা কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি ওষুধ কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেন। এ ক্ষেত্রে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন। এরপর তিনি পূর্ণকালীন গবেষণা ও গ্রন্থ রচনায় মন দেন।
তার লেখক জীবন প্রধানত চারটি ভাগে বিভাজিত- ১. ভাষা আন্দোলন ভিত্তিক, ২. রাজনীতি, সংস্কৃতি সাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, ৩. রবীন্দ্রনাথভিত্তিক এবং ৪. মৌলিক রচনা।
আহমদ রফিক একমাত্র ব্যক্তি যিনি সব পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তার নিজের দেখা ভাষা আন্দোলনের নানা ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে পঞ্চাশের দশকে প্রথম তথ্যসমৃদ্ধ সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বস্তুনিষ্ঠ গবেষণা গ্রন্থ রচনা করেছেন। এককভাবে তার চেয়ে ভাষা আন্দোলনকেন্দ্রিক গবেষণা গ্রন্থ আর কেউ রচনা করেননি। বিশেষ করে শহর কেন্দ্রীকতার বাইরে ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস রচনায় তিনি পথিকৃৎ ছিলেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেরও একজন অগ্রসৈনিক তিনি। শত শত আহত মুক্তিযোদ্ধাকে তিনি চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। নিজের অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন। বস্তুত, ১৯৫৮ সাল থেকে আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং স্বাধীনতা উত্তরকালের রাজনীতি, আন্দোলন ও সংগ্রাম নিয়ে তিনি প্রচুর কলাম লিখেছেন এবং গ্রন্থ রচনা করেছেন।
আহমদ রফিকের গবেষণার আরেকটি প্রধান ক্ষেত্র ছিল রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তিনি ২০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। দুই বাংলা মিলে তার মতো রবীন্দ্রবিষয়ক এত অধিক সংখ্যক গ্রন্থ আর কেউ রচনা করেননি। তিনি নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চাকেন্দ্র ট্রাস্ট গঠন করেছিলেন। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি রবীন্দ্রবিষয়ক গবেষক, আবার নজরুল বিষয়ক গবেষক। জীবনানন্দ দাশ এবং বিষ্ণু দেও তার আগ্রহের বিষয় ছিল। তিনি কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক না হয়েও বিস্তৃতভাবে বিদ্যায়তনিক গবেষণার এক অমূল্য রত্নভান্ডার গড়ে তুলেছিলেন। তাকে ছাড়া, দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাম্প্রদায়িকতা এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ কল্পনাও করা যায় না। সরাসরি চিকিৎসাসেবা না দিলেও চিকিৎসা বিষয়ক পরিভাষা গ্রন্থ রচনার তিনি পথিকৃৎ। এ ছাড়া তার উদ্যোগে বাংলা একাডেমি কর্তৃক বিজ্ঞানবিষয়ক নানা পরিভাষা কোষ প্রকাশিত হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় এবং জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন।
মূলত আহমদ রফিক ছিলেন একজন বহুমুখী বিরল সৃষ্টিশীল মানুষ এবং মৌলিক স্রষ্টা ও শিল্পী। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাকে বাংলাদেশের একজন অন্যতম কবি হিসেবে সর্বাগ্রে রেখেছেন। উপন্যাস, ছোটগল্প এবং অনুবাদেও তিনি সমান দক্ষ ছিলেন।
আহমদ রফিক মৃত্যু অবধি মা, মাটি ও মানুষের প্রতি নমিত ছিলেন। সরাসরি চিকিৎসাসেবা না দিলেও পূর্ণকালীন লেখক হয়ে তিনি সমাজের চিকিৎসা করার উদ্দেশ্যে কলম ধরেছিলেন। তিনি যে কাজই করেছেন তার সবটুকু জননী ভূমির তরে নিবেদিত ছিল। অর্জিত সব সম্পত্তি তিনি একটি ট্রাস্টে দান করে ৯৬ বছর বয়সে দেহত্যাগ করেছেন। এ প্রসঙ্গে সমালোচক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যথার্থই বলেছেন, ‘আহমদ রফিক ছিলেন অঙ্গীকারে দৃঢ়, সৃষ্টিশীলতায় অনন্য’। ফলত জীবনব্যাপী সৃজন প্রতিভাকে তিনি সমানভাবে সক্রিয় রেখেছেন। অগ্রপথিক হিসেবে সাধনা করেছেন নান্দনিক শিল্প ভাষ্যের।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং শিক্ষাবিদ।