আমরা এখন যে বাংলা অক্ষর লিখি বা পড়ি তা মৌর্য সম্রাট অশোকের সময় উদ্ভাবিত ব্রাহ্মীলিপি বা অশোকলিপির বিবর্তিত রূপ। ব্রাহ্মীলিপির এখন পর্যন্ত পাওয়া একমাত্র নিদর্শন শিলালিপিটি উদ্ধার হয়েছে বগুড়ার পুণ্ড্রনগর বা মহাস্থান গড়ে। লিপি বিশারদ ও বগুড়ার শাহ সুলতান কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. মোস্তফা আহাদ তালুকদার জানান, পাথরের ওই শিলালিপিতে যা লেখা আছে তা প্রথম পাঠোদ্ধার করেন ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব ও ভাষাবিদ ডি আর ভান্ডারকর। তার মতে, এ শিলালিপিটি মৌর্য আমলে দেখা দেওয়া দুর্ভিক্ষপীড়িত জনসাধারণকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সাহায্য করার প্রশাসনিক নির্দেশ।
যিশুখ্রিষ্টের জন্মের অন্তত ৩০০ বছর আগে অর্থাৎ কমপক্ষে ২ হাজার ৩০০ বছরের পুরোনো পাথরে খোদাই করে লেখা এ শিলালিপিটি পান জমিচাষ করার সময় মহাস্থানের চাষি বারু ফকির। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ‘মহাস্থান’ নামে এক প্রকাশনাতেও শিলালিপিটি খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৩১ সালের ৩০ নভেম্বর মহাস্থান বা পুণ্ড্রনগরীতে উদ্ধার হওয়া ওই শিলালিপিটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া আছে ডি আর ভান্ডারকরের ‘মৌর্য ব্রাহ্মী ইনস্ক্রিপশন অব মহাস্থান’ শীর্ষক নিবন্ধে।
আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক জি সি চন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ এ নিদর্শনটি অধিদপ্তরের জন্য সংগ্রহ করে বগুড়া থেকে নিয়ে যান কলকাতায়। সম্ভবত তখন থেকেই এ শিলালিপিটি কলকাতায় আছে। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে জানতে পারে কলকাতা জাদুঘরের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বিশেষ প্রদর্শনীতে শিলালিপিটি দর্শকদের জন্য প্রদর্শন করা হয়। তারপরই সুধী সমাজের পক্ষ থেকে শিলালিপিটি ফিরিয়ে আনার দাবি ওঠে।
মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ের খণ্ডিত এ শিলালিপি দৈর্ঘ্যে ৩ দশমিক ২৫ ইঞ্চি, প্রস্থে ২ দশমিক ২৫ ইঞ্চি আর পুরু শূন্য দশমিক ৮৭৫ ইঞ্চি। উপরের অংশের খানিকটা ভাঙা থাকলেও লিপিবিশারদরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি দুর্ভিক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত দেশবাসীকে সাহায্যের একটি নির্দেশপত্র।
মহাস্থানগড় থেকে ৯৪ বছর আগে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কলকাতায় নিয়ে যাওয়া অতি গুরুত্বপূর্ণ এ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে শীর্ষ জাতীয় দৈনিকটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিলালিপিটি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল ভারতীয় কর্মকর্তাদের। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে তেমন আগ্রহ দেখানো হয়নি। ফলে ওই শিলালিপিটি ফেরত চাওয়ার ও পাওয়ার প্রক্রিয়া আর গুরুত্ব পায়নি। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) এ কে এম সাইফুর রহমান জানান, গুরুত্বপূর্ণ এ প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশনটি ভারতে আছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা সেলফোনে জানান, ওই শিললিপিটি ফেরত আনার বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কী সেই উদ্যোগ বা কী ধরনের সে বিষয়টি তিনি জানাতে পারেননি।
৬ লাইনে উৎকীর্ণ শিলালিপিটিতে কী লেখা আছে এ প্রশ্নের জবাবে ড. মোস্তফা আহাদ তালুকদার বলেন, ‘এ শিলালিপি আমাদের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ। মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপি নামে পরিচিত লিপিতে তৎকালীন মৌর্য রাষ্ট্রের অন্যতম ভুক্তি পুণ্ড্রনগরীর কর্তব্যরত মহামাত্রের নিকট জারি করা জনৈক শাসকের একটি আদেশ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এতে ‘সংবঙ্গীয়’ নামে দুর্ভিক্ষপীড়িত নগরবাসীদের দুর্দশা দূর করতে ৪টি প্রয়োজনীয় দ্রব্য ধান, তেল, গাছ ও দুই ধরনের ক্ষুদ্রাকৃতির মুদ্রা গন্ডক (একগন্ডা) ও কাকনিক (কড়ি) ধার হিসাবে সাহায্য প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এটি মূলত মৌর্য সাম্রাজের একটি প্রশাসনিক আদেশপত্র, যা দুর্ভিক্ষের সময় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দুর্গত জনগণের জন্য খাদ্য ও প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহের নির্দেশ। এ শিলালিপিটি আমাদের সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ উল্লেখ করে ড. মোস্তফা আহাদ তালুকদার প্রাচীন গ্রিক রাজ্য ম্যাসিডনের রাজা আলেকজান্ডারের প্রত্যাবর্তনের পর মৌর্য রাজত্বের একটি শক্তিশালী পত্তনের অনেক নিদর্শনই মেলে বগুড়ার পুণ্ড্রনগর বা মহাস্থান গড়ে। সে সময় বগুড়াসহ বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের পুরোটাই ছিল মৌর্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন সময় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া নিদর্শনে যেমন তার প্রমাণ মেলে তেমনই ব্রাহ্মী এ শিলালিপিতেও রয়েছে পুণ্ড্রনগরের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রজাদের অবস্থা এবং দুর্যোগে আক্রান্তদের পাশে দাঁড়ানো রাষ্ট্রের অবস্থানসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
বগুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কালাম আজাদ। একইসঙ্গে তিনি রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগের বিএনপির মিডিয়া সেলের সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সুধীসমাজের প্রতিনিধি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ এ শিলালিপি নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। কালাম আজাদ বলেন, ‘কোনো এক বিশেষ পরিস্থিতিতে সে সময় এ শিলালিপিটি ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এখন স্বাধীন রাষ্ট্র। এ ব্রাহ্মী শিলালিপিটি আমাদের এবং তা আমাদের ফিরিয়ে দিতে হবে। ১৯৭০ সালে ইউনেসকো সনদ অনুযায়ী এটা বাংলাদেশের। ‘মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপি’ হিসেবে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ এ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশকে আর সহযোগিতা করতে হবে ভারতকে।’
সম্রাট অশোকের সময়ে উদ্ভাবিত ব্রাক্ষীলিপির বিবর্তিত রূপ বর্তমান প্রচলিত বাংলা অক্ষর। এটাই এখন পর্যন্ত পাওয়া ব্রাহ্মীলিপির একমাত্র নিদর্শন। অবৈধভাবে পাচার হওয়া সাংস্কৃতিক সম্পদ ও প্রাচীন নিদর্শন উদ্ধারের ক্ষেত্রে ইউনেসকো ১৯৭০ কনভেনশন (UNESCO 1970 Convention) হলো সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো। বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৪০টিরও বেশি দেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। এ কনভেনশনের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই ইরাক, তুরস্ক, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড তাদের চুরি হওয়া ও ঔপনিবেশিক আমলে নিয়ে যাওয়া প্রত্নসম্পদ ফেরত পেয়েছে।