জয়পুরহাটের পাঁচবিবি পৌরসভার ‘মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংরক্ষণশালা’র গেট থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটি মুছে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া বন্ধ থাকা জাদুঘরের ভেতরে পৌরসভার ডাস্টবিন রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা এ ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে অসম্মানের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন। যদিও কে বা কারা এমনটি করেছে সে বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিল জয়পুরহাটের পাঁচবিবি পৌরসভার তৃতীয় তলায় ‘পাঁচবিবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও সংরক্ষণশালা’র উদ্বোধন করা হয়। ওই জাদুঘরে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন স্মারক, বই, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য, মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকাসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সরঞ্জাম সংরক্ষণ করা হয়। এসব দেখতে শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ এই জাদুঘরে আসতেন। নতুন প্রজন্ম মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস জানতে পারত।
কিন্তু কিছুদিন আগে হঠাৎ দেখা যায়, জাদুঘরের গেটে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ লেখাটি মুছে দিয়ে ‘পাঁচবিবি জাদুঘর ও সংরক্ষণশালা’ করা হয়েছে। ভেতরে থাকা বিভিন্ন সরঞ্জামে ময়লার আস্তর পড়েছে। এমনকি পৌর এলাকার বাসিন্দাদের জন্য কেনা নতুন ডাস্টবিন জাদুঘরের ভেতরে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জয়পুরহাট সদর উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে বিভিন্ন সময় ব্যঙ্গ করতে দেখছি। তারই একটি উদাহরণ দেখলাম পাঁচবিবি পৌরসভার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ নামটি বাদ দেওয়া হয়েছে, সেই সঙ্গে জাদুঘরের ভেতরে ডাস্টবিন রাখা হয়েছে। এটা খুবই ন্যক্কারজনক ও ঘৃণিত কাজ। এর সঙ্গে যারা জড়িত–তদন্তের মাধ্যমে তাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।’
পাঁচবিবির দানেজপুর এলাকার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এম আই মিঠু বলেন, ‘‘পাঁচবিবি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থেকে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ লেখাটি তুলে ফেলা হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করার শামিল। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর অনেক সম্মানের একটি জায়গা, অথচ সেখানে ডাস্টবিন রাখা হয়েছে। এটি যারা করেছে সরকার যেন সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়।’’
পাঁচবিবি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুর রউফ বুলু বলেন, ‘পৌরসভার জাদুঘরে ডাস্টবিন সংরক্ষণ ও মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি মুছে ফেলা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার শামিল। ডাস্টবিন রাখার তো অনেক জায়গা আছে, জাদুঘরে কেন রাখতে হবে? যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা রাজাকার তারা এসব কাজ করেছে। এটার তদন্ত হওয়া দরকার। এ ঘটনার সঙ্গে কে জড়িত বা কার ইন্ধনে হলো, তার বা তাদের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে এমন কাজ কেউ করতে না পারে।’
জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার জহুরুল আলম তরফদার রুকু বলেন, ‘এই জাদুঘরে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন উপকরণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংরক্ষিত ছিল। এখান থেকে মুক্তিযুদ্ধ লেখাটি পর্যন্ত তুলে ফেলা হয়েছে। এটা খুবই নিন্দনীয় অপরাধ। পৌর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসকের এটি দৃষ্টিগোচর হওয়া উচিত ছিল। জাদুঘরটিকে ডাস্টবিন সংরক্ষণাগার হিসেবে পরিণত করা হয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
পাঁচবিবি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) জোবাইদুল হক বলেন, ‘জাদুঘরে ডাস্টবিন আনা-নেওয়ার বিষয়ে আমাকে কেউ কিছু বলেনি, তাই এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারছি না। কেউ হয়তো রেখেছিল, এখন হয়তো সরিয়ে নিয়েছে। এটা রাখা ঠিক হয়নি। আমার দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে আমি খারাপ বলে মনে করছি। মুক্তিযুদ্ধ শব্দটি আমরা দু-এক দিনের মধ্যেই আবার যুক্ত করব। এখন থেকে আমি এখানে ভালোভাবে দেখভাল করব।’
এ বিষয়ে পাঁচবিবি পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম হোসেন বলেন, ‘জাদুঘরটি আনঅফিশিয়ালি বন্ধ ছিল। আমি নতুন করে এটার ব্যবস্থাপনা করার জন্য ও সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি। দীর্ঘদিন যেহেতু ব্যবস্থাপনায় ছিল না, এ জন্য নতুন করে কিছু কাজ করতে হবে।’