বিশ্বব্যাপী ইলেকট্রিক ব্যাটারি অর্থাৎ বিদ্যুৎচালিত গাড়ির ব্যবহার যে হারে বাড়ছে, তাতে আগামী দিনে আমাদের দেশেও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়বে। যদিও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এই গাড়ির ব্যবহার খুবই নগণ্য। তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার জোরদারে ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ‘ইলেকট্রিক মোটরযান নিবন্ধন ও চলাচল-সংক্রান্ত নীতিমালা’ তৈরি করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী যে হারে ইলেকট্রিক বা বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ছে, তাতে আগামী দিন হবে বৈদ্যুতিক গাড়ির যুগ। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন দেশ তাদের আমদানিকারকদের শুল্ক ছাড় দিয়েছে। কোনো কোনো দেশ আবার শুল্ক প্রণোদনাও দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এ গাড়ির ব্যবহার খুবই কম। কারণ হিসেবে তারা বলেন, এ বিষয়ে সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। সেই সঙ্গে শুল্কহারও অনেক বেশি। প্রণোদনাও তো নেই। এমন বাস্তবতায়, তারা সরকারের কাছে এই খাতের সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটা সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, ইউরোপ, আমেরিকাসহ সারা বিশ্বেই বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং এ গাড়িকে নানাভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ভারতে বৈদ্যুতিক গাড়ির জগতে তিন বছর আগেই এসেছে খ্যাতনামা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টাটা। বর্তমানে চীনেও বৈদ্যুতিক গাড়ির সুবিশাল বাজার রয়েছে। আসলে বৈদ্যুতিক গাড়ি এমন এক ধরনের বাহন, যা এক বা একাধিক বৈদ্যুতিক মোটর দ্বারা চলে এবং রিচার্জেবল ব্যাটারিতে সঞ্চিত শক্তি ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার নতুন একটি অটোমোবাইল নীতিমালা প্রণয়ন করেছে, যার লক্ষ্য পরিবেশবান্ধব যানকে পরিবহন ব্যবস্থায় বেশি করে অন্তর্ভুক্ত করা। ২০৩০ সাল নাগাদ অন্তত ১৫ শতাংশ নিবন্ধিত বৈদ্যুতিক গাড়ির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। অটোমোবাইল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা-২০২০-এর খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, জ্বালানিসাশ্রয়ী যানবাহন (ইইভি) প্রস্তুতের পেছনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কর অবকাশের (ট্যাক্স হলিডে) সুপারিশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষও ইতোমধ্যে এসব গাড়ির নিবন্ধন দিতে শুরু করেছে।
বারবিডার তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের বায়ুতে বিপজ্জনক কালো কার্বনের উপস্থিতি বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর তুলনায় ১০০ থেকে ১২০ গুণ বেশি। এ অবস্থা থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে দূষণমুক্ত মোটরযান আমদানি উৎসাহিত করতে শুল্ককর কাঠামো ঢেলে সাজানো উচিত এনবিআরের। বারবিডা বলেছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে মোটরযানে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমে আসবে। তখন বাংলাদেশেও বৈদ্যুতিক গাড়ির গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বাড়বে। জানতে চাইলে রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সাবেক সভাপতি হাবিবউল্লাহ ডন খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমানে সারা বিশ্বেই দূষণে এগিয়ে থাকা শহরগুলোর মধ্যে দিল্লি ও ঢাকার নাম প্রথম সারিতে রয়েছে। এ থেকে রক্ষা পেতে পরিবেশবান্ধব ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার শুরু করা জরুরি। উন্নত দেশগুলোতে ২০৩৫ সালের পর জ্বালানি তেলচালিত গাড়ি আর চলবে না বলেই শোনা যাচ্ছে। তাই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে মনোযোগ দিয়েছে। যেমন চীনে এই মুহূর্তে ৫০টি কারখানা রয়েছে। ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার বাড়লে জ্বালানি তেল আমদানিতে এত ডলার খরচ করতে হবে না। বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানিতে শুল্ক ছাড় দিলে দেশে এটির ব্যবহার বাড়বে বলে মনে করেন হাবিবউল্লাহ ডন। এ জন্য প্রধান শহরগুলোতে চার্জিং পয়েন্ট বা চার্জিং স্টেশন তৈরির ব্যবস্থা করা দরকার বলে পরামর্শ দেন তিনি।
একই বিষয়ে আকিজ মোটরসের সিইও শেখ আমিনুদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ফসিল ফুয়েল তথা জীবাশ্ম জ্বালানিবিহীন মোটরযানের উৎপাদন ও ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশকেও ব্যাপকভাবে এ ধরনের গাড়ি ব্যবহারের পথে যেতে হবে। কারণ, বৈদ্যুতিক গাড়ি জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। শুধু তাই নয়, বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়েরও সুযোগ আছে। জ্বালানি তেলের চেয়ে ইলেকট্রিক গাড়িতে চারগুণ বেশি জ্বালানি সাশ্রয় হবে। পরিবহন খাতে জ্বালানি তেলের ব্যবহার কমলে তখন বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে তেল আমদানি কমবে। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে যে চাপ রয়েছে, তা ও কমবে।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) সূত্রে জানা গেছে, দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০টি ইলেকট্রিক গাড়ির জন্য সংস্থাটি থেকে নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। নিবন্ধন পাওয়ার অপেক্ষায় আছে আরও অনেকে। এ ছাড়া নিবন্ধন ছাড়াও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এই খাতে কাজ করছে।
/আবরার জাহিন