ভোরের আলো ফোটার আগেই শহরের কিছু মানুষ কাজে নেমে পড়েন। জাতীয় পতাকা তখনও খুঁটিতে ওঠেনি, বিজয় দিবসের মিছিলও শুরু হয়নি। তবু তাদের জীবনের লড়াই প্রতিদিনের মতোই চলমান। আজ মহান বিজয় দিবস, রাষ্ট্রীয় ক্যালেন্ডারে গৌরবের দিন। কিন্তু যারা শ্রম দিয়ে দেশটাকে প্রতিদিন সচল রাখেন, তাদের কাছে বিজয়ের অর্থ রাষ্ট্রীয় ভাষণের চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব ও ব্যক্তিগত।
শহরের ফুটপাত, নির্মাণ এলাকা, রাস্তাঘাট আর বাজারে কথা বললে বোঝা যায়, শ্রমজীবী মানুষের কাছে বিজয় মানে স্বাধীনতার চেয়ে আগে জীবনের নিশ্চয়তা। কেউ ভাবেন আজ কাজ পাবেন কি না, কেউ ভাবেন বাজারে বিক্রি হবে কি না, আবার কেউ হিসেব করেন মাস শেষে সংসার চলবে কি না। কেউ কেউ এরই মধ্যে বিজয়ের আনন্দও উপভোগ করেন। তবে তাদের অধিকাংশের বিজয়ের আনন্দ বলতে আয়ের ঊর্ধগতি।
কাজের নিশ্চয়তা: দিনমজুরের বিজয়
ভোরে শ্রমবাজারে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের কাছে বিজয় মানে একটি ডাক। কেউ এসে বলবে, “চলো, কাজ আছে।” এমন ডাকের দিনমজুর রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমাদের কাছে বিজয় হইলো কাজ পাওয়া। এই দিবসগুলা শুধু কাগজে-কলমে। আমরা এতো বুঝি না, তবুও সবার আনন্দ দেখলে ভালো লাগে।”
তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক দিনমজুর আব্দুস সালাম সরকার, পড়েছেন ক্লাস এইট পর্যন্ত। তিনি বলেন, “স্বাধীন দেশে থেকেও যদি কাজ না পাই, তাহলে স্বাধীনতা আমাদের কী দিল-এই প্রশ্ন মাথায় আসে।”
ভাত-মাছের হিসেব: রিকশাচালক ও পরিবহন শ্রমিক
রিকশার প্যাডেল ঘুরছে, কিন্তু মাথার ভেতর ঘুরছে সাংসারিক প্যাডেল। আজ আয় কত হবে, ঘরে কী নিয়ে যাওয়া যাবে? সাভারের নবীনগর এলাকার রিকশাচালক আব্দুল মালেক বলেন, “বিজয় মানে আনন্দ। আমার সাত বছরের বাচ্চাটাকে একটা জামা কিনে দিছি, এটাই আমার কাছে উৎসব।”
পরক্ষণেই একজন বৃদ্ধ বাদাম বিক্রেতার সঙ্গে কথা বললে তিনি বিজয়ের মানে বলেন, “ আমরা মুরুক্ষ বাবা, এত কিছু বুঝি না। রাতে ঘরে গিয়ে যদি ভাতের সঙ্গে ভালো মাছ-গোসত নিতে পারি, সেটা বিজয় দিবস। না হলে উৎসবের আনন্দ আমাদের জন্য না।”
ধামরাই থেকে রাজধানীগামী বাসের সহকারী মাজহারুল ইসলাম বলেন, “রাস্তায় কাজ করি। আমাদের বিজয় মানে নিরাপদে কাজ করে বাড়ি ফেরা।”
বেচা-কেনার নিশ্চয়তা: ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আশা
ফুটপাতের দোকান, ভ্রাম্যমাণ দোকান, চায়ের স্টল বা সবজির ভ্যান-এই মানুষগুলোর জীবিকা পুরোপুরি দিনের বেচা-কেনার ওপর নির্ভরশীল। পঞ্চাশোর্ধ নারী মিনা, বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে প্লাস্টিকের খেলনা বিক্রি করেন। তিনি বিজয় মানে তেমন কিছু বুঝেন না। তিনি বলেন, বিজয় মানে স্বাধীনতা। নিরাপত্তা, ভাত মাছের স্বাধীনতা, কেনা-বেচার স্বাধীনতাই আমাদের কাছে বিজয়।"
১২ বছর বয়সী বাদাম বিক্রেতা আলিফ বলে, “বিজয় দিবস মানে আমার বেচা-কেনা, আর কিছুই না।”
জাতীয় স্মৃতিসৌধে আলু ভাজা বিক্রি করা বিদ্যুৎ আলী এসেছেন মানিকগঞ্জ থেকে। তার কাছে বিজয় দিবস মানে রাজনীতিবিদদের ধর্ম। তিনি বলেন, এটা কি হাদিস কুরআনে আছে? নাই। এটা নেতা বা সরকার দেশটা স্বাধীন করসে এমনই একটা ধর্ম।
টাইলসের কাজ করা তরুণ মাসুম, বিজয় দিবসে কাজের বন্ধ পেয়ে চলে আসেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। তার কাছে বিজয় দিবস মানে ভালো লাগা। তিনি বলেন, বিজয় দিবস মানে আনন্দ। ছুটি পাইয়া আসছি, শহিদরারে দোয়া দিবো, নামাজ পড়ে দোয়া পড়বো।
জাতীয় স্মৃতিসৌধের সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ফুটপাতে ১৫ বছর বয়সী ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতা রাকিব হাসানের কাছে বিজয় মানে নির্বিঘ্নে চা বেচা। তিনি বলেন, “বিজয় মানে পুলিশের দৌড়ানি ছাড়া দোকান চালানো। আজ ভালো বিক্রি হওয়ার কথা, তাই এটাই তো একটা বিজয়।”
ন্যায্য মজুরি ও সম্মান: পোশাকশ্রমিক ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী
কারখানার ভেতর কিংবা ভোরের অন্ধকারে শহর পরিষ্কার করা, দুটোই নগরের সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা দুটি কাজ। কিন্তু এই শ্রমের স্বীকৃতি খুব কমই আসে। তবে তারাও বিজয় দিবসে এসেছেন জাতীয় স্মৃতিসৌধে। আশুলিয়া এলাকার পোশাকশ্রমিক লাকী আক্তার। তিনি বলেন, “বিজয় মানে মাস শেষে পুরো বেতন পাওয়া। ওভারটাইমের টাকা পেলে সেটাই উৎসব।”
এদিকে নবীনগরের পরিচ্ছন্নতাকর্মী রিনা বেগম বলেন,“ আমরার বিজয় বলতে যেদিন কাজ কম সেদিনই। কিন্তু বাসা বাড়িতে ময়লা পরিস্কার করতে গেলে অনেকে আমাদের ঘৃণা করে, এইডা অনেক কষ্ট দেয়। আমি মনে করি যে সময় মানুষ আমারারে অবহেলা, ঘৃণা করবে না, সেদিনই আসল বিজয়”।
মহান বিজয় দিবস আমাদের গৌরবের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়। তবে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠে সেই বিজয়ের সংজ্ঞা ভিন্ন-এটা টিকে থাকার সংগ্রাম, সম্মান পাওয়ার লড়াই। রাষ্ট্রের প্রকৃত বিজয় তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন এই মানুষগুলোর জীবনেও নিরাপত্তা, ন্যায্যতা আর স্বস্তি ফিরে আসবে।
আমানউল্লাহ/নাঈম